অষ্টম শতাব্দীতে আরব উপদ্বীপ থেকে ইসলাম ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন প্রান্তে। নতুন নতুন ভূখণ্ডে, জাতির মানুষের জীবনে ইসলাম স্থান করে নিচ্ছে। আইবেরিয়া থেকে মধ্য এশিয়া পর্যন্ত প্রতিদিন নতুন সন্তান জন্ম নিচ্ছে মুসলিম হিসেবে। একই সঙ্গে ইসলামের আইন, তত্ত্ব, অনুশীলনের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে নতুন ধারণা, কিংবা বিশদ ব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। আইন, দর্শন, ধর্মতত্ত্ব, অধ্যাত্মবাদ নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ, নতুন ভাবনার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এদের মধ্যে সুফিবাদীরা ততদিন স্বতন্ত্র ধারা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। তাদের মধ্যেও আছে অনেক মত। এমন এক সময়েই আবির্ভাব বসরার রাবেয়া আল-আদাবিয়ার, যিনি রাবেয়া বসরী নামেই বিখ্যাত। এখনো সুফিবাদের ইতিহাসে তিনি গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্র। বহু বছর তার জীবন, ভাবনা সুফিবাদীদের প্রেরণা দিয়েছে এবং এখনো সুফি সাহিত্যে তিনি উল্লেখযোগ্য স্থান নিয়ে আছেন।
রাবেয়ার জীবনের পুরো ইতিহাস স্পষ্ট নয়। তার জন্মসাল নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। তবে এটা ৭১৪ থেকে ৭১৮ সালের মধ্যবর্তী কোনো একটি সময়। রাবেয়া বসরীকে ঘিরে আছে অনেক কিংবদন্তি।
তিনি আত্মোপলব্ধি ও আধ্যাত্মিক উত্তরণের ধারণাকে প্রচার করেছিলেন।
রাবেয়ার যখন জন্ম তখন মুসলিমরা বিভিন্ন ভূখণ্ডে ছড়িয়ে পড়েছে। ততদিনে প্রথম প্রজন্মে থাকা ক্ল্যাসিক্যাল ইসলামী সমাজ, ধারণা, জীবন ক্ষয়ে গেছে। অনেক জায়গায় নতুন মুসলমান হওয়াদের মধ্যে ইসলামের মূলনীতি, ধর্মতত্ত্ব নিয়ে তেমন জানাবোঝা নেই। বিশ্বাস-ঈমান, আদর্শ মুসলিম, রাসুলের পথ কেমন ছিল—এসব নিয়ে বিভিন্ন স্থানে শুরু হলো ভাবনা। অনেকে এগিয়ে এলেন এসব প্রশ্নের জবাব দিতে। রাবেয়া ছিলেন তাদেরই একজন। তিনি ছিলেন বসরার মানুষ। সেই সময় ইরাকের বসরা বাণিজ্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক ভাবনা বিনিময়ের ব্যস্ত কেন্দ্র। বিভিন্ন ভাষা, জাতি ও ধর্মের মানুষ এ শহরে বাস করত। ৭৫০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ এ শহরের বেশির ভাগ নাগরিক ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল, কিন্তু অনেকেই তাদের পূর্বতন বিশ্বাস, ধর্মীয় রীতিনীতি পুরোপুরি ত্যাগ করতে পারেনি। তাই অনেকেই উদ্যোগী হয়েছিল ইসলামী টেক্সট ও অনুশীলনকে তার উদ্ভবকালের আদর্শে ফিরিয়ে নিতে।
৭৫০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ আব্বাসীয় বিপ্লবে পতন হলো উমাইয়া খিলাফতের। আব্বাসীয় আমলে ইসলামী সাম্রাজ্য বিস্তৃত হলো নানা দিগন্তে। নতুন সম্ভাবনা উঁকি দিচ্ছিল ব্যবসা-বাণিজ্য আর জীবনের নানা ক্ষেত্রে। এমনি এক পরিস্থিতিতে রাবেয়া কবিতায় মানব জীবনের ভঙ্গুরতা ও আল্লাহর পরম আশ্রয়ের বাণী প্রচার শুরু করেন। তিনি দোজখের ভয়ের চেয়ে আল্লাহর প্রতি প্রেমকেই বেশি গুরুত্ব দিলেন। এমন দর্শনে সিক্ত রাবেয়ার কবিতা আজও পঠিত হয়। নিজের ভাবনাকে প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি অনেক রূপক গল্পেরও অবতারণা করেন। তিনি বৈষয়িক দুনিয়ায় না মজে অধ্যাত্মবাদী ভাবনাকে গুরুত্ব দিলেন। তিনি ভক্তি, বিনয় আর দারিদ্র্যকে বরণ করে নিতে আহ্বান জানালেন।
সুফিবাদের ইতিহাসে রাবেয়া বসরী আজও স্মরিত। তার মৃত্যুর অনেক শত বছর পার হয়েছে, সুফিবাদী চিন্তার নানা বিবর্তন হয়েছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও রাবেয়াকে এখনো স্মরণ করা হয়। তার জীবন সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি তথ্য পাওয়া যায় নিশাপুরের সুফি ফরিদউদ্দিন আত্তারের ত্রয়োদশ শতাব্দীর বিখ্যাত সুফি জীবনীগ্রন্থ তাজকিরাতুল আউলিয়ায়। আত্তার রাবেয়ার প্রশংসা করেছেন। উনিশ শতকে নাইজেরিয়ায় মুসলিম নারীদের শিক্ষিত করে তোলার কারিগর নানা আসমাউ (১৭৯৩-১৮৬৫) রাবেয়া বসরীকে খুব শ্রদ্ধা করতেন। আরবের বিভিন্ন দেশে রাবেয়ার কবিতা গানের সুরে গাওয়া হয়। বিশ শতকের মিসরীয় গায়িকা উম্মে কুলসুম একটি আরব সিনেমায়ও রাবেয়ার কবিতার কথায় কণ্ঠ দিয়েছেন।
নিশাপুরের ফাতিমা
রাবেয়া বসরীর মৃত্যুর দুইশ বছর পরে ইতিহাসে আবির্ভূত হলেন আরেকজন নারী সুফি। তিনি নিশাপুরের ফাতিমা। ইরানের নিশাপুর জগদ্বিখ্যাত অনেক সুফির জন্মস্থান। সেই সুফি সৌরভে ফাতিমাও আছেন। ১০০০ সালের কাছাকাছি কোনো সময়ে তার জন্ম। মৃত্যু ১০৮৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে। তিনি নবম শতকের একজন গুরুত্বপূর্ণ সুফি হিসেবে বিবেচিত হন।
সুফি পথের জন্য ফাতিমা বিলাসী জীবন পরিত্যাগ করেন। তিনি জন্মস্থান ইরান ছেড়ে অনেক বছর মক্কায় কাটান। এছাড়া ফিলিস্তিন ও সিরিয়ায়ও ব্যাপকভাবে ভ্রমণ করেছেন। তিনি একজন অভিজাতের কন্যা ছিলেন। তার পিতার নাম ছিল আবু আলী। তিনি ইসলামী শাস্ত্রে পণ্ডিত ছিলেন। পিতা ছিলেন ফাতিমার প্রথম এবং প্রধান শিক্ষক। আবু আলী একটি খানকাহ ও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ইসলামের প্রতি ভালোবাসা তিনি পিতার শিক্ষাতেই পেয়েছিলেন। চৌদ্দ বছর বয়সেই তিনি পিতাকে হারান। এরপর তিনি তার পিতার বন্ধু মোহাম্মদ আল সুলামির কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেন। হাদিস শাস্ত্রে ফাতিমার গভীর জ্ঞান ছিল।
বিয়ে করেছিলেন সুফি শেখ আহমাদ বিন খিদরুয়াকে। তারা স্বামী-স্ত্রী অধ্যাত্মবাদী জীবন যাপন করতেন। তাসাউফের ব্যাখ্যাকার হিসেবে ফাতিমা খ্যাতি পেয়েছিলেন। তার সঙ্গে হযরত বায়েজিদ বোস্তামি ও হজরত আবু হাফস আল-হাদ্দাদের ভালো জানাশোনা ছিল। তিনি একই সঙ্গে হজরত দুল-নান আল মিসরির শিক্ষক ছিলেন। মিসরি বলেছেন, তার ওস্তাদি আল্লাহর প্রিয় বান্দা। তাকে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে আপনার মতে সুফি শিক্ষকদের মধ্যে আপনি কাকে শ্রেষ্ঠ বিবেচনা করেন? জবাবে মিসরি বলেন, ‘মক্কার এক নারী, যিনি ফাতিমা নিশাপুরি নামে পরিচিত।’ আবু ইয়াজিদ আল-বিস্তানি বলেন, ‘আমার জীবনে আমি একজন পুরুষ ও একজন নারীকে শিক্ষক হিসেবে পেয়েছি। এই নারী শিক্ষক ছিলেন নিশাপুরের ফাতিমা। আমি যখনই তাকে অধ্যাত্মবাদের কোনো স্তরের কথা বলেছি তখন মনে হয়েছে তিনি নিজেই তা অনুভব করেছেন।’
ফাতিমা একবার ছাত্র হজরত দুল-নান আল মিসরিকে উপহার পাঠিয়েছিলেন। মিসরি সেটা এই বলে ফেরত পাঠিয়েছিলেন যে একজন নারী সুফির উপহার গ্রহণ করাটা আমার জন্য অবমাননাকর ও দুর্বলতার চিহ্ন। তার এ কথার জবাবে ফাতিমা বলেন, ‘আরেকজন সুফির উদ্দেশ্য নিয়ে যে সুফি সন্দেহ করেন তার চেয়ে নিম্নস্তরের মানুষ আর হতে পারে না।’
বলখ থেকে একবার এক নারী ফাতিমার কাছে এসেছিলেন শিষ্যত্ব গ্রহণ করতে। ফাতিমা বলেছিলেন, আল্লাহর সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করো। সেটাই আমাদের বন্ধু করে তুলবে।
ফাতিমার জীবন সাক্ষ্য দেয় সেকালে নিশাপুরে নারীরা ধর্মীয় তত্ত্ব, শিক্ষা, প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। সুফিবাদের বিকাশে নিশাপুরে ধর্মীয় শাস্ত্রে নারীদের পড়াশোনার সুযোগ বাড়ছিল। এই শিক্ষিত নারীরা আবার কিশোরীদের শিক্ষা দিচ্ছিলেন। শুধু ফাতিমার পিতা নন, সেই সময় নিশাপুরে আরো অনেকেই তাদের কন্যাদের ধর্মীয় শিক্ষায় ঋদ্ধ করেছিলেন।
এসএম রশিদ: লেখক





