পৃথিবীখ্যাত রাশান ঔপন্যাসিক, ফিওদর মিখাইলোভিচ দস্তয়েভস্কি জীবনের বেশির ভাগ সময়ে, বিশেষ করে তার সাহিত্য জীবনের পুরোটা সময় এপিলেপসি বা মৃগীরোগে আক্রান্ত ছিলেন। রোগজনিত সমস্যাকে বড় করে দেখে তিনি নিজেকে দুর্ভাগ্যের শিকার বা গুরুত্বপূর্ণ কাজে অপারগ হিসেবে মেনে নিতে পারতেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, বাস্তবে তা না করে তিনি মৃগীরোগের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতিকে কাজে লাগিয়েছেন অনন্যসাধারণ সাহিত্যকর্ম সৃষ্টিতে। দস্তয়েভস্কির উপন্যাসে মৃগীরোগে আক্রান্ত কয়েকটি চরিত্র সে রকমই নির্দেশ করে।

মৃগীরোগের খিঁচুনি বা এপিলেপটিক সিজারের চিকিৎসা হিসেবে প্রথম ওষুধ আবিষ্কার হয় ১৮৫৭ সালে। ১৮৬১ সালে লন্ডনের ন্যাশনাল হসপিটাল ওষুধ প্রয়োগে সফলভাবে মৃগীরোগীর খিঁচুনি নিয়ন্ত্রণে আনতে সমর্থ হয়। দস্তয়েভস্কির জীবন বিবেচনা করলে দেখা যায় উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে তার মৃগীরোগের বিষয়টি ব্যাপকভাবে প্রকাশ পায়, যে সময়টা বাজারে মৃগীরোগের ওষুধের আবির্ভাব ও মোটামুটি সহজলভ্যতার দিকে ইঙ্গিত করে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি এবং উন্নতির পথে রোগটি সম্পর্কে মানুষ তখন যত জানতে পেরেছে ততটাই উপকৃত হয়েছে। দস্তয়েভস্কির রচনায় মানুষের মানসিক টানাপোড়েনের বিচিত্র চিত্র পাওয়া যায়। একই সঙ্গে, সাধারণ একটি স্নায়ুতান্ত্রিক জটিলতা কল্পকাহিনীতে দক্ষ এবং অসামান্য ক্ষমতাধর একজন লেখকের কলমে মহিমান্বিত হয়ে উঠেছে।

দস্তয়েভস্কির অসুস্থতা ও অন্যান্য

পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত দস্তয়েভস্কির চিঠি এবং মেডিকেল রিপোর্টগুলো বিবেচনা করে প্রকাশিত বিভিন্ন রিপোর্টে দেখা যায়, সিবারিয়ায় বন্দি থাকাকালীন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার কারণে দস্তয়েভস্কির জীবনে খিঁচুনির মতো ভয়াবহ সমস্যা ঘটেনি। শিশুকালের কোনো ভয়ানক অভিজ্ঞতা কিংবা ভয়ংকর কোনো স্মৃতিও তাকে মৃগীরোগের দিকে নিয়ে যায়নি, অনেক বর্ণনায় মনস্তত্ত্ববিদরা যেমনটা মনে করেন বলে অতীতে জানিয়েছেন।

দস্তয়েভস্কির জন্ম ১৮২১ সালের ৩০ অক্টোবর, মস্কোর সাধারণ এক হাসপাতালে। ১৮৩৮ সালে তার ভাই, মিখাইলের সঙ্গে তিনি একটি মিলিটারি ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটে পড়তে চলে যান। দস্তয়েভস্কির সমসাময়িক এবং বন্ধু লেখকদের বর্ণনায়, ১৮৩৮ থেকে ১৮৪৩ সালে সেখানে ছাত্র থাকা অবস্থায়, কোনো একদিন তিনি প্রথম খিঁচুনির অভিজ্ঞতা লাভ করেন। দস্তয়েভস্কির ক্লাসের বন্ধু, লেখক গ্রিগোরোভিচের বর্ণনায় দেখা যায়, ১৮৪৪ সালে প্রথম দস্তয়েভস্কির খিঁচুনির সমস্যা নিয়ে কথা বলেন। তার বর্ণনায়, ট্রটস্কি রাস্তা দিয়ে হেঁটে একটি শেষকৃত্যানুষ্ঠানে যাওয়ার সময়ে প্রথম তিনি শারীরিক সমস্যা বোধ করেন এবং  খিঁচুনির পরের দুই-তিন দিনের জন্য বিষণ্ন হয়ে পড়েন।

প্রথম খিঁচুনি অনুভব করার কয়েক বছর পরে দস্তয়েভস্কি নিজে তার বর্ণনা দেন। তিনি জানান, অপ্রত্যাশিত কোনো মনস্তাত্ত্বিক পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিলেন। কয়েক মুহূর্তের জন্য এমন হয়েছিল যে তিনি কিছু চিন্তা করতে পারছিলেন না এবং স্মৃতিশূন্য হয়ে পড়েছিলেন। কখনো কখনো ওরকম অভিজ্ঞতার পরে তার অনুভূতিশূন্য কিছু মুহূর্ত কেটেছে, কখনোবা তার তীব্র আনন্দের অনুভূতিও হয়েছে। পরে যদিও এ পরিস্থিতিটি একরকমের খিঁচুনি হিসেবে জানা গেছে কিন্তু তখন তাকে ‘দিবাস্বপ্ন’ বা ‘জ্ঞানীর কল্পনা’ বলে উড়িয়ে দেয়া হতো। ধীরে ধীরে এমন হয় যে ২৩ বছর বয়সের পরে তার প্রায় প্রতি রাতেই খিঁচুনি হয়। পরবর্তীকালে, দস্তয়েভস্কির বন্ধুরা (গণিতবিদ সোফিয়া কোভালিভস্কায়া ও কবি নিকোলাই স্ট্রাখভ) জানান এবং একই সঙ্গে দস্তয়েভস্কির উপন্যাস, দ্য ইডিয়ট ও ডেমনেস একই রকমের বর্ণনা পাওয়া যায় যে প্রতিবার অদ্ভুত নিরবচ্ছিন্ন প্রশান্তির অনুভূতির পরপর খিঁচুনির আবির্ভাব হয়। দস্তয়েভস্কি যখন জ্ঞান ফিরে পেতেন তখন স্মৃতি থেকে আগের পরিস্থিতি বর্ণনা করতেন।

১৮৪৯ সালের এপ্রিল মাসে তথাকথিত পেট্রাশেভস্কি সার্কেলের সদস্য হওয়ার অপরাধে কয়েকজন সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী বুদ্ধিজীবীসহ দস্তয়েভস্কিকে গ্রেফতার করা হয়। সরকারের বিরুদ্ধে লিখিত কাগজপত্র বিলি করার অপরাধে দস্তয়েভস্কিকে গ্রেফতার করা হয়। পিটার অ্যান্ড পল দুর্গে গুলি করে হত্যার রায়ও ঘোষিত হয়। সৌভাগ্যবশত গুলি ছোড়ার মাত্র দু-এক মিনিট আগে আকস্মিক জার তাকে মৃত্যুদণ্ড থেকে মুক্তি দিয়ে সিবারিয়ান বন্দিশালায় চার বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেন। তারপর বাকি জীবন দস্তয়েভস্কি রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে কাটাতে হবে বলেও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন।

সিবারিয়ার বন্দিদশায় ১৮৫০ সালে প্রথম দাপ্তরিকভাবে দস্তয়েভস্কির মৃগীরোগের রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। খিঁচুনির ফলে যে তিনি শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছেন, তা-ও উল্লেখ করা হয়। একের পর এক খিঁচুনির কারণে চিকিৎসক সহজেই প্রমাণ করতে পারেন যে এ পরিস্থিতিতে তাকে সেনাবাহিনীর সদস্যপদ দেয়া সমস্যার হবে। ১৮৫৩ সালে তাই সেনাবাহিনী থেকে তার মুক্তি ঘটে। তবে সেই সময়ে আবিষ্কৃত খিঁচুনির ওষুধ তিনি সেবন করতেন বলে কোথাও উল্লেখ নেই।

দস্তয়েভস্কিকে সবচেয়ে বেশি আগলে রেখেছিলেন তার দ্বিতীয় স্ত্রী, অ্যানা গ্রিগোরিভনা। ১৮৬৬ সালে, দ্য গ্যাম্বলার উপন্যাস ছাপানোর সময়ের মধ্যে শেষ করার উদ্দেশ্যে স্টেনোগ্রাফার হিসেবে অ্যানাকে তিনি চাকরি দিয়েছিলেন। অ্যানার স্মৃতিচারণে, ‘প্রায়ই শব্দ পেয়ে নিজের ঘর থেকে দৌড়ে তার ঘরে যেতাম। দেখতাম ঘরের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে খিঁচুনির প্রকোপে তার মুখ বিকৃত হয়ে আসছে। তাকে ধরতে গেলেই তিনি মেঝেতে পড়ে যেতেন। প্রায়ই রাতের বেলায় এমনটা হতো। এ কারণে তিনি নিচু সোফা বা বিছানায় ঘুমাতেন।’

দস্তয়েভস্কি জীবনের দুই-তৃতীয়াংশ সময়ে মৃগীরোগজনিত খিঁচুনির সমস্যায় ভুগেছেন। জীবনের শেষ বিশ বছরে অন্তত ১০২ বার খিঁচুনির শিকার হয়েছেন। অথচ তার পরও জীবনের শেষের দিকেও তিনি তার অসাধারণ সৃষ্টি, ব্রাদার করমাজভ উপন্যাসটি সম্পন্ন করেছেন।

দস্তয়েভস্কির উপন্যাসে মৃগীরোগ

কল্পকাহিনীতে দস্তয়েভস্কি মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা তুলে ধরতে সিদ্ধহস্ত ছিলেন। তার উপন্যাসের চরিত্রগুলোর মধ্যে অন্তত এক-চতুর্থাংশ নানা রকম মানসিক জটিলতা বা ব্যাধিতে ভোগে। বারোটি উপন্যাসের মধ্যে পাঁচটিতে এ রকম চরিত্র দেখতে পাওয়া যায়। তাদের কারো কারো খিঁচুনি হয়, যাদের অন্তত পাঁচজন মৃগীরোগের শিকার, অন্যদের হিস্টিরিয়াসহ অন্যান্য জটিলতা থাকে। চরিত্রের খিঁচুনি ও অন্য উপসর্গগুলো দস্তয়েভস্কি তার উপন্যাসে উনিশ শতকের চিকিৎসাবিজ্ঞানে ও সমাজে প্রচলিত শব্দের সাহায্যে বর্ণনা করেছেন। তদুপরি, মূলত নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকে বর্ণনা এগিয়েছে।

১৮৪৭ সালে দ্য ল্যান্ডলেডি উপন্যাসে মুরিন, অর্ডিনভ ও কাতারিনা; ১৮৬১ সালে হিউমিলিয়েটেড অ্যান্ড ইনসাল্টেড উপন্যাসে নেলি (্এলিনা, লেনোচাকা) ও নাতাশা; ১৮৬৯ সালে দ্য ইডিয়ট উপন্যাসে মিশকিন; ১৮৭২ সালে ডেমনস উপন্যাসে কিরিলভ এবং ১৮৮০ সালে ব্রাদার্স কারমাজভ উপন্যাসে স্মারডিয়াকভ চরিত্রগুলোর মাধ্যমে এপিলেপসি বা মৃগীরোগের জটিলতা প্রকাশ পেয়েছে। 

দ্য ল্যান্ডলেডি

উপন্যাসটির ছোট পরিসরে দেখা যায় যে অর্ডিনভ একজন বিচক্ষণ মানুষ, বসবাসের জন্য একটি জায়গার সন্ধানে আছেন। তিনি ইলিয়া মুরিন নামের একজনের ঘর ভাড়া নেন। মুরিন একজন বয়স্ক লোক, যিনি ক্যাতরিনা নামের সুন্দরী এক তরুণীর সঙ্গে পাশের ঘরে থাকেন। ক্যাতরিনা ও অর্ডিনভ প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। তাদের আবেগে ভাসার দিনগুলোয় প্রত্যেকেরই কিছু শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়, যাতে সম্পর্কের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হয়। মুরিন একসময় ক্যাতরিনাকে হুমকি দিতে চায়। তখন মুরিনের এপিলেপসি সংক্রান্ত খিঁচুনির বর্ণনা আসে,

মুরিন মেঝেতে পড়ে ছিল। তার মুখ লালায় ভেসে যাচ্ছিল। ব্যথায় তার মুখ বিকৃত হয়ে আসছিল আর শক্ত করে রাখা ঠোঁটের ওপরে ফেনা থমকে ছিল। অর্ডিনভ বুঝতে পেরেছিলেন যে দুর্ভাগা মানুষটা মৃগীরোগে আক্রান্ত্ম। তারপর একখানে মুরিন অর্ডিনভের কাছে প্রকাশ করে, ‘তোমারও যে এ রকম খারাপ রোগ আছে, তা কে অনুমান করবে? তবে আমার বেলা সমস্যাটা বারবার হয়। আমি অবশ্য বুকের সঙ্গে একটা ছুরি রাখি।’ তারপর ক্যাতরিনার দিকে ছুরিটা তাক করে মুরিন বলে, ‘আমি অসুস্থ মানুষ। আমার ঘন ঘন খিঁচুনি হয়।’

অর্ডিনভের ক্ষেত্রেও একটি খিঁচুনির মুহূর্ত দেখা যায়, যদিও সরাসরি উল্লেখ নেই। একদিন অর্ডিনভ সোফায় বসতেই ঘুমিয়ে পড়ে। পরে লক্ষ করে তার ঘুমটা স্বাভাবিক ছিল না, অনেকটা যেন ছিল অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো কিছু। জেগে ওঠার পরে তার অদ্ভুত আনন্দের অনুভূতি হয় কিন্তু মুখের ভেতরে জিবটা অবশ হয়ে যায়। ক্যাতরিনা তখন তাকে এক গ্লাস পানি এনে দেয়। পানি মুখে দিতেই সে সত্যি সত্যি অজ্ঞান হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, ক্যাতরিনার খিঁচুনির কথা উল্লেখ করা হয়েছে মাত্র একবার। বর্ণনাটি অনেকটা এ রকম, ক্যাতরিনা অসাড় হয়ে বসে আছে, অপলক তাকিয়ে আছে সামনের দিকে, তার ঠোঁটগুলো মৃত মানুষের মতো নীল বর্ণ ধারণ করেছে, তার চোখের পাতা মূর্তির মতো স্থির, গায়ের রঙ হয়ে উঠেছে মৃতের মতো ফ্যাকাশে, বুক চিরে দুর্বোধ্য কিছু শব্দ বেরিয়ে আসতেই সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে।

হিউমিলিয়েটেড অ্যান্ড ইনসাল্টেড

উপন্যাসের মৃগীরোগগ্রস্ত চরিত্রটির নাম এলিনা। যদিও তার মৃত মা তাকে নেলি বলে ডাকতেন। নেলি নামেই উপন্যাসে চরিত্রের উল্লেখ বেশি পাওয়া যায়। উপন্যাসে অন্তত সাত স্থানে নেলির এপিলেপসি বা অস্বাভাবিক শারীরিক পরিস্থিতির কথা উল্লেখ আছে।

যেমন:           নেলির খিঁচুনি শুরু হলো। গোঙানির শব্দ পেলাম আমরা। এলিনা দাঁড়িয়েই ছিল কিন্তু পরমুহূর্তে অজ্ঞান হয়ে পড়ল। তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসতে লাগল দুর্বোধ্য শব্দ, অপার্থিব চিত্কার। তারপর মাটিতে ধড়াম করে পড়ে গিয়েই তার শরীরটা প্রবল খিঁচুনিতে কেঁপে উঠল। তার মুখটা ছিল অভিব্যক্তিশূন্য, পুরোপুরি মৃগীরোগের দখলে।

নাতাশা, উপন্যাসের আরেকটি চরিত্র যার একবার মাথা ঘুরে খিঁচুনি শুরু হয় এবং সে একজনের বাহুবন্ধনের মধ্যে থেকে মাটিতে পড়ে যায়। এ ঘটনার দুই সপ্তাহ পরেই নাতাশা মৃত্যুবরণ করে।

দ্য ইডিয়ট

উপন্যাসের প্রধান চরিত্র প্রিন্স মিশকিন। ছাব্বিশ-সাতাশ বছর বয়সের প্রিন্স মিশকিন মাঝারি উচ্চতার, বেশি সাদা গায়ের রঙে হালকা রঙের দাড়িতে ঢাকা মুখমণ্ডলের অধিকারী। তার চোখ ভাসা ভাসা আর নীলচে। সেই চোখের কেউ যদি ভালোমতো তাকায় তবে দেখবে সেখানে অদ্ভুত নিস্তব্ধতা আছে, আছে কিছু ব্যতিক্রমও, যা মৃগীরোগীদের থাকে। শারীরিক সুস্থতার জন্য তাকে বিদেশে পাঠানো হয়েছিল। স্নায়ুতন্ত্রের অস্বাভাবিক কিছু জটিলতায় পড়েছিল সে যাকে বলে এপিলেপসি বা মৃগীরোগ। শরীরে খিঁচুনি হওয়া তার জন্য নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার ছিল।

একবার এক লোকের কথা শুনেছিলাম যে বারো বছর জেলখানায় ছিল। তার নিজের মুখেই গল্পটা শুনি। আমার অধ্যক্ষের অধীনেই চিকিৎসা নিয়েছিলেন তিনি। তিনি প্রায়ই অজ্ঞান হয়ে যেতেন। প্রায়ই খুব একা লাগত আর তখন তিনি কাঁদতেন। একবার আত্মহত্যাও করতে চেয়েছিলেন। কয়েকজন সঙ্গীর সঙ্গে লোকটাকে একবার ফায়ারিং স্কোয়াডে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। রাজনৈতিক অপরাধে তাকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয়া হয়েছিল। তারপর আদেশ পালনের জন্য নিয়ে যাওয়ার বিশ মিনিটের মাথায় মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে তাকে অন্য শাস্তির জন্য মনোনীত করা হয়।

উপন্যাসে মিশকিনকে বলা এই প্যারাটি নিশ্চিতভাবে দস্তয়েভস্কির নিজেরই জীবনঘেঁষা কিংবা তারই প্রতিচ্ছবি। অন্য এক চরিত্র যখন মিশকিনকে হত্যা করার প্রচেষ্টা চালায়, তখন থেকেই তার মধ্যে এপিলেপসি বা মৃগীরোগের উপসর্গ প্রকট হয়ে ওঠে। ঘটনার পরদিন মিশকিন খিঁচুনির কারণে মেঝেতে পড়ে যায়। উপন্যাসে তার পড়ে যাওয়ার ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ আছে। পড়ার সময়ে তার হাতের ধাক্কা লেগে একটি চাইনিজ ফুলদানি ভেঙে যায়। খিঁচুনির ঘটনার পরে তিনি এক ডাক্তারের অধীনে চিকিৎসা গ্রহণ করেন।

ডেমনস

অ্যালক্সি কিরিলভ হলো ডেমনস উপন্যাসে সেই চরিত্র, যার মধ্যে মৃগীরোগের উপসর্গ দেখা যায়। ঘটনাচক্রে, কিরিলভ এবং আরেক চরিত্র, শাতভ একসঙ্গে আমেরিকায় যায়। উপযুক্ত সুবিধার অভাব এবং কখনো ভয়ানক দুস্থ অবস্থায় সেখানকার শ্রমিকদের কাজ করার অভিজ্ঞতা দেখতে তারা সেখানে যায়। দেখার পরে ক্লান্ত ও বিমর্ষ অবস্থায় ফিরে আসে। কিরিলভ ফিরে এসে লেবায়াদকিনের পাশের বাড়িতে ওঠে যেখানে তার বোন মারিয়া থাকে। মারিয়া মানসিক রোগগ্রস্ত। কিরিলভ তাকে কিছুটা দেখেশুনে রাখে আর ঘটনাচক্রে তার বর্ণনায় ধীরে ধীরে নিজের মানসিক সমস্যাগুলোও আসতে থাকে। তবে তার মধ্যে মৃগীরোগের উপসর্গগুলোর উল্লেখ আসে প্রায় জীবনের শেষ প্রান্তে। 

কিরিলভ তোমাকে সতর্ক থাকতে হবে। আমি জানি কী করে মানুষ অজ্ঞান হয়। একজন মৃগীরোগী এটাতে দারুণভাবে বর্ণনা করতে পারেন, অবিকল তুমি যেমনটা করেছ। শুধু পাঁচ সেকেন্ড সময় পাওয়া যায়, আর তার পরই যেন কেবল শান্তি আর শান্তি। সাবধান, কিরিলভ, এটা কিন্তু মৃগীরোগ! তুমি এক সেকেন্ডও বেশি পাবে না।’ শুনে কিরিলভ সামান্য হাসে।  শাতভ ও কিরিলভের কথোপকথনে এটুকু স্পষ্ট হয় যে দস্তয়েভস্কি একজন মানুষের মৃগীরোগের বিভিন্ন স্তর সম্পর্কে পরিষ্কারভাবে অবগত এবং সাবলীলভাবে তা কল্পকাহিনীতে ব্যবহারে সফল।

ব্রাদার করমাজভ

এ উপন্যাসে মৃগীরোগগ্রস্ত চরিত্রের নাম পাভেল ফিওদরোভিচ স্মেরদিকভ। স্মেরদিকভের খিঁচুনি হয় মাত্র একবার। কিন্তু উপন্যাসে ওই একবারের খিঁচুনির বর্ণনা আসে পাঁচবার, ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ও উপস্থাপনায়। কারণ হলো, তার খিঁচুনি ঠিক সেই দিন ঘটে যেদিন আরেক চরিত্র, ফিওদর পালভোভিচ খুন হন। প্রথম বর্ণনাটা দেখা যায় পাভেলের নিজের ভাষায়। সে মনে করে, তার খিঁচুনি হয়েছিল নিজের বাবা, কারমাজভকে যেদিন সে খুন করেছিল, তার আগের দিন।

শেষ কথা

ফিওদর দস্তয়েভস্কির উপন্যাস, বুদ্ধিদীপ্ত দর্শন, আদর্শ, আইনকানুন, সামাজিক রীতিনীতি, শিল্পের ইতিহাস, ধর্ম এবং সর্বোপরি মনস্তত্ত্বের অভূতপূর্ব সমাহার। যা হোক, কথায় বলে, দীর্ঘদিন ভোগা রোগীর চেতনা ও অভিজ্ঞতা প্রায় চিকিৎসকের সমান। দস্তয়েভস্কির মৃগীরোগের অভিজ্ঞতা তার উপন্যাসকে এমনভাবে সমৃদ্ধ করেছে যে কেবল সাহিত্যের পাঠক ছাড়াও, স্নায়ুবিক জটিলতায় ভোগা রোগীর মনস্তত্ত্ব বুঝতে পেশাদার চিকিৎসকও হয়তো উপকৃত হতে পারেন।   

 (লেখায় দস্তয়েভস্কির উপন্যাস থেকে উদ্ধৃত অংশগুলো বর্তমান লেখকের অনুবাদ)

 আফসানা বেগম: কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক