[এমির পুরো নাম লুবভ ফিওদরোভনা দস্তয়েভ্স্কায়া, জন্ম ১৪ সেপ্টেম্বর ১৮৬৯ উত্তর জার্মান কনফেডারেশনের ড্রেসডেন শহরে। বিশ্বখ্যাত কথাসাহিত্যিক ফিওদর দস্তয়েভস্কি ও তার দ্বিতীয় স্ত্রী আনা স্নিতকিনার দ্বিতীয় সন্তান। প্রথমটির কন্যা, সোনিয়া, দস্তয়েভস্কির মনে বেদনার ছাপ রেখে ঠিক আগের বছর তিন মাস বয়সেই মৃত্যুবরণ করে। এমির ছোট আরো দুটি ভাই জন্ম নেয়। দস্তয়েভস্কি যখন মারা যান এমি কেবল ১১ ছাড়িয়ে ১২-তে পড়েছেন।

এমির খ্যাতি দুটি কারণে—বাবাকে নিয়ে তার বই ‘দস্তয়েভস্কি অ্যাজ পোর্ট্রেড বাই হিজ ডটার’ বহুল পাঠ্য, দ্বিতীয় কারণটি একটি বিশেষ সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী—ফিলাটেলিক অ্যাসোসিয়েশনের সবার সঙ্গে পরিচিতি। তিনি রাশিয়ার প্রথম নারী স্ট্যাম্প সংগ্রাহক—ফিলাটেলিস্ট।

বিখ্যাত বাবাকে নিয়ে লেখা বইটি ১৯২০ সালে প্রথম জার্মানিতে প্রকাশিত হয়। এমি তার মাতৃভাষায় নয়, ফরাসি ভাষায় বইটি লেখেন এবং বিভিন্ন ইউরোপীয় ভাষায় সেটি অনূদিত হয়। এমি বাবার যে স্মৃতি তুলে এনেছেন, দস্তয়েভস্কি গবেষকরা তার সবটুকু বিশ্বাস করতে রাজি নন। তারা মনে করেন, তার রচনা পুরোপুরি বস্তুনিষ্ঠ নয়। ১১ বছর বয়স পর্যন্ত এমি বাবাকে পেয়েছেন। তিনি স্মৃতি হিসেবে যা উল্লেখ করেছেন তার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হচ্ছে মায়ের কাছে শোনা কাহিনী। আর মা আনা স্নিতকিনা দস্তয়েভস্কির প্রথম স্ত্রী মারিয়া ইসায়েভার ব্যাপারে ঈর্ষাপরায়ণ ছিলেন। আনার সেই ঈর্ষার প্রতিফলন দেখা যায় মেয়ের লেখায়। এমি দুটো উপন্যাসও রচনা করছেন। বাবাকে নিয়ে লেখা তার বইয়ের ২৩তম অধ্যায়টির নাম ‘বাবা হিসেবে দস্তয়েভস্কি’—এ অধ্যায়টি সংক্ষেপে অনুসৃত হলো। ভূমিকা বন্ধনীভুক্ত অংশ নিবন্ধকার/অনুবাদকের রচনা]

(দস্তয়েভস্কির প্রথম স্ত্রী মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা পূর্ব বিবাহজাত সন্তান পাভেলকে এক সময় স্নেহ করলেও পরবর্তী সময়ে তার আচরণে ক্ষিপ্ত ছিলেন। তাদের কাহিনী নিয়ে নোবেল বিজয়ী জেএস কোয়েটজি একটি উপন্যাস লিখেছেন—দ্য মাস্টার অব পিটার্সবার্গ)

সেছলের উদ্ভট আচরণ দেখে দস্তয়েভস্কি আমার ভাই ও আমাকে নিয়ে খুব গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে শুরু করলেন। প্রথমটাতে ব্যর্থ হওয়ায় আমাদের ব্যাপারে তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। অধিকাংশ শিশুর যখন সময়টা নার্সারিতেই কাটে, বাবা তখন আমাদের পড়াশোনা করাতে শুরু করলেন। তিনি হয়তো ভেবেছেন তার যে অসুস্থতা তাতে হয়তো বেশি দিন বাঁচবেন না। কাজেই হাতে যতটুকু সামান্য সময় আছে তাতে আমাদের মধ্যে যতটা সম্ভব ভালো কিছুর বীজ বুনে যাবেন। আমার বাবার বাবা তার ছেলের ব্যাপারে যে শিল্পপদ্ধতি অবলম্বন করেছিলেন, আমাদের বেলায়ও তিনি একই পদ্ধতি বেছে নিলেন। আর সেটি হচ্ছে মহান লেখকদের রচনা পড়ে শোনানো। কিন্তু আমার দাদার বাড়িতে এই পড়াটা আবার জোর উচ্চারণে তাকে পড়ে শোনাতে হতো। তবে দস্তয়েভস্কি নিজে পড়িয়েই সন্তুষ্ট ছিলেন। কারণ সাহিত্যবোধের উন্মেষ না হওয়া সেই কাঁচা বয়সে এসব স্মরণ রাখা আমাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না।

তবে প্রথম ঘটনাটি অনপনেয় কালিতেও আমার স্মৃতিতে লেগে আছে। স্টারায়া রুশাতে শরৎ সন্ধ্যায় যখন হলদে পাতা মাটি ঢেকে আছে, শুরু হলো ঝড়ো বৃষ্টি। বাবা ঘোষণা করলেন তিনি শিলারের ‘রবার্স’ পড়ে শোনাবেন। আমার বয়স তখন সাত বছর আর আমার ভাইয়ের ছয়। দস্তয়েভস্কি খুব আগ্রহ নিয়ে আবেগ মিশিয়ে পড়ে গেলেন। মাঝে মাঝে থেমে জটিল বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করলেন। আমরা হাঁ করে শুনছিলাম। আমাদের শিশুমনে জার্মান নাটক অদ্ভুত কিছু মনে হলো। আমরা অদ্ভুত দেশ জার্মানি সম্পর্কে কী আর ভাবতে পারি। বাবা ডাক্তারের পরামর্শে নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে প্রতি বছর জার্মানিতে যান। আমি জানি সেখানকার বাচ্চারা লক্ষ কানওয়ালা গাধার পিঠে চড়ে বেড়ায়। কিন্তু শিলারের নাটকে কোনো গাধা নেই। তবে দুর্ব্যবহার করা একজন বাবা ছিলেন, যিনি তার ছেলেদের সঙ্গে কেবল ঝগড়া করেন। একটি ছোট মেয়েও ছিল, যে কাঁদত আর তাদের মস্ত ঝগড়া মিটিয়ে দিতে চেষ্টা করত। আমি বাবার কথা শুনছি আর ভাবছি, যারা কেবল ঝগড়া করে তাদের সঙ্গে থাকাটা নিশ্চয়ই একটা ভয়ংকর ব্যাপার। তার পরও তাদের জার্মানিতে থাকতে হচ্ছে, যেখানে অনেক লম্বা কানের ছোট গাধা রয়েছে, কিন্তু সবাই সারাক্ষণ ঝগড়া করে কেন? জার্মানদের নিশ্চয়ই মেজাজ খারাপ থাকে।

সাত বছর বয়সে আমি শিলারের নাটক না বুঝলেও এটা বেশ বুঝতে পেরেছি নাটকটা বাবার খুব ভালো লেগেছে আর তাকে খুশি করার জন্য আমি বোঝার ভান ধরে বসেছি। অধিকাংশ ছোট মেয়েরা ধূর্ত হয়ে থাকে—আমিও তাদের মতো বুদ্ধির পরিচয় দিতে মাথা নেড়ে ‘হুঁ’ ‘হাঁ’ করছি এবং শিলার মতো মেধাবী মানুষকে বোঝার ভান করছি। নাটকের দুই ভাই, দুই মুর যেমন ভয়ংকর অপরাধমূলক কাজে মরিয়া হয়ে জড়িয়ে পড়েছে, বাবার পড়া শুনে যদিও আমার হাই উঠছে, ঘুমিয়ে পড়াটা হবে একটি অপরাধ। সুতরাং ভীষণ ঘুম পেলেও আমি শাক্তি খাটিয়ে আমার শিশুসুলভ চোখ খোলা রাখার চেষ্টা করি। কিন্তু আমার ভাই ফিওদর কোনো ধরনের পরোয়া না করে ঘুমিয়ে পড়ে। তার শ্রোতাদের এ অবস্থা দেখে বাবা হেসে উঠলেন। নিজেকেই ধিক্কার দিলেন, ‘ওরা তো কিছুই বুঝতে পারছে না, ওরা অনেক ছোট।’

আবারো তার সাহিত্য সন্ধ্যা শুরু করার আগে বাবা কয়েক মাস অপেক্ষা করলেন। এবার তিনি পছন্দ করলেন রুশ উপকথা, যা আমাদের চারণ কবিরা গ্রামীণ সন্ধ্যায় সমবেত শ্রোতাদের শোনাতেন। এ ধরনের পড়াশোনা না শেখা ‘হোমার’ গল্প তাদের অসাধারণ স্মৃতি থেকে নির্দ্বিধায় হাজার পদ্য বুলিয়ে দিতে পারেন। তাদের পঙিক্তগুলোর ছন্দোবদ্ধ পুনরাবৃত্তি বিচিত্র স্বাদ ও অভিব্যক্তি প্রকাশ করে। এরা বাস্তবিকই কবি। যে কবিতা তারা আবৃত্তি করছে, সেই কবিতার সঙ্গে তাত্ক্ষণিকভাবে নতুন নতুন পঙিক্তও যোগ করছে। এর বিষয় বিস্তার বীর প্রিন্স ভ্লাদিমির, রুশ আর্থার বলা যায়। তাকে ঘিরে থাকে বিশিষ্ট সব যোদ্ধা। দস্তয়েভস্কি আমাদের শিশুসুলভ কল্পলোকে কী ঘটছে বুঝতে চেষ্টা করতেন। বাবা আমাদের পুশকিনের গল্প শুনিয়েছেন, গোগলের ‘তারাস বুলবা’, পুশকিনের মধ্যযুগীয় কাহিনী ‘পুওর নাইট’, সের্ভান্তেসের দন কিহোতে—সব তার কাছ থেকে শোনা।

তিনি আমাদের পড়ার দিকে জোর দিয়েছেন, কিন্তু থিয়েটারকে উপেক্ষা করেননি। রাশিয়ায় বাবা-মা শিশুদের ব্যালে নাচ দেখাতে নিয়ে যান। কিন্তু দস্তয়েভস্কি ব্যালে নাচের তেমন গুরুত্ব দেননি, তিনি আমাকে নিয়ে গেছেন অপেরায়। অবাক ব্যাপার, আমরা বারবার একটাই উপভোগ করেছি—পুশকিনের কবিতায় ‘রুসলাম ও লুডমিলা’। আমি যে বই পড়তে পছন্দ করতাম, তারা এটাতে খুব গর্ব বোধ করতেন। অক্ষরজ্ঞান হওয়ার পর কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আমি পড়তে শিখি। হাতের কাছে যে বই পাই তা-ই গোগ্রাসে পড়তে থাকি। আমার এসব উল্টাপাল্টা পড়াশোনা মা একটুও পছন্দ করতেন না, বরং প্রতিবাদ করতেন। কিন্তু দস্তয়েভস্কি প্রশ্রয় দিতেন। কারণ তিনি সম্ভবত আমার মধ্যে নিজের শৈশবের প্রতিফলন দেখতে পেতেন। আমার জন্য তার পছন্দ ছিল কারামজিনের লেখা ইতিহাসের বই, আর ঐতিহাসিক উপন্যাস, এসব নিয়ে আমার সঙ্গে কথা বলতেন। আমি যা বুঝতে অক্ষম ছিলাম বুঝিয়ে দিতেন। সকালের নাশতার সময় আমি তার সঙ্গ পেতাম, এটা ছিল আমার জন্য দিনের শ্রেষ্ঠ অংশ। আমাদের সাহিত্যবিষয়ক কথোপকথন শুরু হলো—কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত বেশি দিন ধরে তা চলল না।

বাবা আমাকে প্রথম যে বইটা দিলেন তা কারামজিনের হিস্ট্রি অব রাশিয়া, সচিত্র একটি চমত্কার বই। (নিকোলাই কারামজিন ১৭৬৬-১৮২৬, তথা ঐতিহাসিক রোমান্টিক কবি ও সমালোচক, তার হিস্ট্রি অব রাশিয়া ১২ খণ্ডের জাতীয় ইতিহাস। রুশ ইতিহাসের অনেক ভুলে যাওয়া বীর সম্পর্কে তিনি তার ইতিহাস গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন)

বাবা ছবিগুলোর ব্যাখ্যা দিলেন—দ্বাদশ শতাব্দীর শাসক রুবিক কিয়েভে এসে হাজির হলেন। তার পুত্র আইগর যাযাবর সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। যাযাবরা চারদিক থেকে ছোট স্লাভ দেশ ঘিরে ফেলেছে। ভ্লাদিমির তার এলাকায় খ্রিস্টধর্মের দীক্ষা নিচ্ছেন। তাতারদের আক্রমণ প্রতিহত করছে মহান রাশিয়া। এমন আরো অনেক ছবি। নরমান প্রিন্স রোগভলদের কন্যা রোনেদা আমার প্রিয় নায়িকা। আমাদের শিশুসুলভ নাটকে তার ভূমিকায় অভিনয় করতে চাইতাম। আমি যখন ইউরোপ ভ্রমণ শুরু করি, সব জায়গাতেই নরমানদের চিহ্ন খুঁজে বেড়াতাম। কিন্তু আমাকে অবাক করেছে সামনে যা কিছু পড়ছে সবই লাতিন কিংবা জার্মান সংস্কৃতির। ইউরোপ যখন মধ্যযুগীয় বর্বরতায় ডুবে যাচ্ছিল, বিবেকের স্বাধীনতা ও নিজ নিজ ধর্ম পালনের অধিকার নরমনরাই সমুন্নত রেখেছে।

বড় হয়ে আমার জীবনের এ অধ্যায়টির বিশ্লেষণ করতে চেষ্টা করেছি, বাবা আমার হাতে তখন শিশুতোষ কোনো বই তুলে দেয়নি। সে বয়সে শিশুপাঠ্য একটি মাত্র বই পড়েছি ‘রবিনসন ক্রুসো’—এটি বাবা দেননি, মা দিয়েছেন। আমার ধারণা, শিশুতোষ বই সম্পর্কে দস্তয়েভস্কির কোনো ধারণাই ছিল না। কারণ তার শৈশবে রাশিয়ায় এ ধরনের কোনো বইই ছিল না। আরেকটি বিষয় আমাকে পুরো কৌতূহলী করে তোলে। সাহিত্যের এত কথা দস্তায়ভস্কি সানন্দে আমার সঙ্গে আলোচনা করলেও কখনো তার শৈশবের কথা বলেননি, কিন্তু আমার সঙ্গে তার ছোলবেলার একটি দূরত্ব বজায় রাখতেন। তিনিও নিজের বাবা দস্তয়েভস্কির, তাদের দাদা বা ইউক্রেনের চাচাদের কথা বলতেন না। চার্চে আমাদের নিয়ে সব ধর্মীয় আচারে যোগ দিতেন। দিনে দুবার তিনি চার্চের যেতেন, উপোস করতেন। রাত ২-৩টির দিকে যে ধর্মীয় সভা হতো, তাতে শিশুরা যেত না, কিন্তু বাবা আমাকে নিয়ে গেছেন। সেখানে একটি চেয়ারে বসিয়ে হাত দিয়ে ঘিরে রেখেছেন। আমার বয়স তখন নয় বছর।