শোনা যায় ব্রিটিশ লেখক ও এমপি ক্রিস্টোফার হোলিস (১৯০২-১৯৭৭) বলেছিলেন, ‘নির্বাচিত হওয়ার আগে সব হবু এমপির দস্তয়েভস্কি বিষয়ে পরীক্ষা নেয়া উচিত। পাস করলে তবেই তাদের এমপি মনোনীত করা উচিত।’

১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দের ২২ ডিসেম্বর সকাল ৭টায় বিপ্লবী তত্পরতায় যুক্ত থাকার অভিযোগে ২১ জনকে গুলি করে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। এদের মধ্যে একজন ছিলেন ফিওদর দস্তয়েভস্কি। কারা চত্বরে সবাইকে সারি বেঁধে দাঁড় করানো হলো। কর্মকর্তা সবার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ পড়ে শোনালেন এবং রায়ও জানিয়ে দিলেন—‘সেনটেন্সড টু বি শট!’

দণ্ডপ্রাপ্তদের সবার জামাকাপড় খুলে নেয়া হলো। বরফ শীতল ঠাণ্ডায় সবাই তাদের জীবনের অন্তিম মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করতে থাকলেন। ২০ মিনিট কাটল। দস্তয়েভস্কি তার দুই সঙ্গীর কাছ থেকে শেষ বিদায় নিলেন। কাছেই এক রুশ চার্চের গম্বুজে সূর্যকিরণ চমকাচ্ছিল। দস্তয়েভস্কির মনে হলো এ কিরণ যেন সেই দুনিয়া থেকে আসছে, যেখানে তিনি কয়েক মুহূর্ত পরেই পা রাখবেন। জীবন ও মৃত্যুর মধ্যে যে অভেদ্য রহস্য ঠিক সেই বিন্দুতেই দাঁড়ানো তিনি।

হঠাৎই দৌড়ে এলেন এক কর্মকর্তা। রুমাল উড়িয়ে সংকেত দিলেন, কাছে এসে জানালেন প্রথম জার নিকোলাস তার ‘অসীম করুণা’য় সবার মৃত্যুদণ্ড রদ করেছেন। বরং সবাইকে এবার সাইবেরিয়ায় নানা মেয়াদে কারাভোগের জন্য পাঠানো হবে।

গুলিবিদ্ধ হওয়ার অপেক্ষায় থাকার ২০ মিনিট সেদিনের সেই বন্দিদের চিরকালের মতো বদলে দিয়েছিল। গ্রিগরিয়েভ পাগল হয়ে গিয়েছিলেন। অন্যদের নার্ভাস ব্রেকডাউন হয়েছিল। দস্তয়েভস্কি আর কোনোদিন স্মরণ করতে পারেননি সেদিন সকালে কেন তার শরীরে ঠাণ্ডার কোনো অনুভূতি হয়নি। সেদিনই খুব সম্ভবত জন্ম হয়েছিল দস্তয়েভস্কির অস্তিত্ববাদের, মানুষের ভুল আর যন্ত্রণাভোগের বিষয়ের অন্তর্দৃষ্টির।

১৬ বছর বয়সে দস্তয়েভস্কি একদিন শুনেছিলেন খুন হয়েছেন তার পিতা। সেদিন শুরু হয়েছিল দুনিয়ার যন্ত্রণায় জমে যাওয়ার প্রথম অনুভূতি। এরপর এসেছিল সেই ২২ ডিসেম্বরের সকাল। তবে সেদিন সেই বরফশীল সকালে দস্তয়েভস্কির আর ঠাণ্ডা লাগছিল না।

১৭ বছর বয়সে মিলিটারি ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে সেইন্ট পিটার্সবার্গ কলেজে পড়তে যান। সে বয়সেই তার পড়া হয়ে গিয়েছিল হোমার, শেকসপিয়ার, গ্যাটে, শিলার, গোগোল, হুগো প্রমুখ।

গ্র্যাজুয়েশনের পর মিলিটারি ক্যারিয়ার ছেড়ে লেখক জীবন বেছে নেন দস্তয়েভস্কি। পুওর ফোক সমালোচকদের দৃষ্টি কাড়ে। কিন্তু এরপর প্রকাশিত উপন্যাসগুলো সেকালের পাঠককে আকর্ষণ করতে পারেনি। এরপর মধ্যবিত্তদের উদারতাবাদী একটি সমাজতান্ত্রিক দলের সঙ্গে যুক্ত হন। পরিণতিতে সেই মৃত্যুদণ্ড এবং পরবর্তী সময় সাইবেরিয়ায় কারাবাস। এ সময় চোর, খুনিসহ নানা অপরাধীদের সঙ্গে বাস করেছেন তিনি। এ রকম পতিত মানুষদের তিনি দেখেছেন কৌতূহল নিয়ে, করুণাসিক্ত হূদয় দিয়ে। দস্তয়েভস্কির সঙ্গে জেল খাটা এক পোলিশ বন্দি জাসট্রজেমবস্কি বলেছিলেন, ‘দস্তয়েভস্কির উষ্ণ ও বন্ধুত্বপূর্ণ আলাপ আমাকে ভেঙে পড়া থেকে রক্ষা করেছিল। তার সংবেদনশীলতা, অনুভূতির সূক্ষ্ম প্রকাশ আমাকে প্রভাবিত করেছিল। দস্তয়েভস্কি সেই মানুষদের একজন মিশেল (ফরাসি ইতিহাসবিদ) যাদের সম্পর্কে বলেছেন, ‘পুরুষদের মধ্যে সবচেয়ে সাহসী এবং একই সঙ্গে নারী সুলভ বৈশিষ্ট্যেরও অধিকারী।’ দস্তয়েভস্কি এবং জাসট্রজেমবস্কি চোখের জলে টোবোলস্কে একে অন্যকে বিদায় জানিয়েছিলেন। সাইবেরিয়ায় তিনি যে ক’জন বন্দির সঙ্গে মিশেছিলেন তারা দস্তয়েভস্কির পরবর্তী সব লেখাতেই কোনো না কোনোভাবে ছাপ রেখেছেন। বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে বন্দিদের সঙ্গে তার আদানপ্রদানের কিছু না থাকলেও দস্তয়েভস্কি অপরাধী এই অচ্ছুতদের মধ্যে ‘গভীর, দৃঢ় ও সুন্দর চরিত্রের’ মানুষ খুঁজে পেয়েছিলেন। তিনি বললেন, এ মানুষগুলো সেই শক্তির ভুক্তভোগী, যার ওপর তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। দস্তয়েভস্কির গুণমুগ্ধ দার্শনিক নিেশ পরবর্তীকালে এই রুশ মাস্টারের মূল্যায়ন আমলে নিয়ে এ রকম মানুষদের সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘সবল মানুষদের দুর্বলে পরিণত করা হয়েছে।’

খুব সম্ভবত প্রথম রুশ সাহিত্যিক হিসেবে দস্তয়েভস্কি মানুষের মনের প্রকৃতিকে অনুসন্ধান করেছিলেন। নিজে কিছু আরোপ না করে বরং তুলে এনেছিলেন এ প্রজাতির সব দ্বন্দ্ব। মানুষ যেমন নীতিহীন আবার একই সঙ্গে সন্ত। সাইকোঅ্যানালিসিস এই রুশ সাহিত্যিকের কাছে গভীরভাবে ঋণী। ইউরোপের মধ্যবিত্তের, সহজ করে বলা যায় আধুনিক মানুষদের নৈতিকতা, চরিত্রের ভেঙে পড়াকে সময়ের আগেই দেখতে পেয়েছিলেন। শোনা যায় আধুনিক সাইকোঅ্যানালিসিসের জনক ফ্রয়েড তার শেষ জীবনে দস্তয়েভস্কির উপন্যাসের চরিত্রগুলোকে আর পড়তে চাইতেন না, কারণ তাদের বিভক্ত মনের যে বিবরণ তিনি দিয়েছেন, তা ফ্রয়েড প্রতিদিন যেসব রোগী নিয়ে কাজ করতেন তাদের মতোই। ফ্রয়েডের রোগী কিংবা দস্তয়েভস্কির চরিত্রের ক্ষেত্রে সব প্রেরণা এবং সিদ্ধান্তের কেন্দ্র তাদের ‘সাবকনশাস মাইন্ড’। তার কাহিনীতে চরিত্রগুলো কিংবা পরিণতি কোনো নিখুঁত, আদর্শ ধারাবাহিকতা নয় বরং রহস্যময়, অধ্যাত্মিক, অনির্ণেয়।


দস্তয়েভস্কি নিজেকে কখনো সাইকোলজিস্ট বিবেচনা করতেন না। বরং জোর দিয়ে ঘোষণা করেছেন, ‘আমি কোনো সাইকোলজিস্ট নই। আমি বরং রিয়ালিস্ট।’ নিেশ বলেছিলেন দস্তয়েভস্কিই একমাত্র মনস্তত্ত্ববিদ, যার কাছ থেকে তার কিছু শেখার আছে।

২২ ডিসেম্বরের সে সকালটাই সম্ভবত চিরতরে বদলে দিয়েছিল দস্তয়েভস্কিকে, জীবন-মৃত্যুর সীমানায় দাঁড়িয়ে থাকার সে অভিজ্ঞতা তাকে আর অগভীর কোনো ভাবনা কিংবা মূল্যায়নে আগ্রহী করেনি। ‘ম্যাজিক অব এক্সট্রিম’ অভিভূত করেছিল তাকে। তিনি মানুষের মনের গভীরতম, অন্ধকার ঘরের সন্ধান করেছেন। সেই ঘরে মানুষের লুকানোর কিছু নেই। সেখানে সে কেবল ঈশ্বরের মুখোমুখি। দস্তয়েভস্কি নিজেই বলেছেন, ‘সবসময়, সবকিছুতে আমি চরম বিন্দুর খোঁজ করি। দুনিয়ার রহস্যময়তা, ভাগ্যের সামনে মানুষ অসহায়। দস্তয়েভস্কি দেখেছেন সেখানে ঈশ্বর ছাড়া আর কারো নিয়ন্ত্রণ নেই।’ এক জায়গায় তিনি লিখেছিলেন, ‘পিঁপড়া তার ঘর এবং কাজের সূত্র জানে... কিন্তু মানুষ জানে না।’ অস্তিত্ববাদী দর্শনে দস্তয়েভস্কির নোটস ফ্রম আন্ডারগ্রাউন্ড ক্ল্যাসিক্যাল নিদর্শন। পরবর্তীকালে অস্তিত্ববাদী দর্শনের অন্যতম স্রষ্টা জ্যাঁ পল সার্ত্রের কথায় শোনা যায় দস্তয়েভস্কির প্রতিধ্বনি। সার্ত্রের কথাটা মোটামুটি এমন—সবকিছুই নির্ণয় করা গেছে, কিন্তু জীবনটা কীভাবে কাটাতে হবে সেটা কেউ বলতে পারে না। দস্তয়েভস্কি মনে করতেন উনিশ শতকের শেষ ভাগে ইউরোপে অভূতপূর্ব বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে। কারণ ইউরোপের মন আর রাজনীতির সব আদর্শ ভেঙে পড়ছে। ক্রুদ্ধ স্বরে তিনি ঘোষণা করেছিলেন, ‘আর কোনো সর্বজনীন আদর্শ নেই। সবকিছু ম্লান, বাষ্পের মতো; সব মানুষ নিস্তেজ! আমরা সবাই শূন্য, কেবলই শূন্য!’

দস্তয়েভস্কি দিয়ে নিেশ প্রভাবিত হয়েছিলেন। এ দুজনের জীবনে অসুস্থতা ছিল একটি সাধারণ বিন্দু। দুজনই এক্ষেত্রে কাছাকাছি প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। নিেশর কাছে মনে হয়েছিল অসুস্থতা যেন এক মেটাফিজিক্যাল শক্তি। নিেশ অসুস্থতায় ভুগে ভুগে জীবনের অর্থ খুঁজতে বেড়িয়েছিলেন—যে জীবন নিশ্চিত নিয়মে চলে না। নিেশর মতো দস্তয়েভস্কিও অসুস্থতাকে সৃষ্টিশীলতার একটি শর্ত হিসেবে দেখেছেন।

নরওয়েজিয়ান চিত্রশিল্পী এডভার মুংক যখন মারা যান, তখন তার মৃত্যুশয্যার পাশের টেবিলে পাওয়া গিয়েছিল দস্তয়েভস্কির উপন্যাস ডেমনস। মুংক দস্তয়েভস্কি দিয়ে প্রভাবিত ছিলেন। অনেক সমালোচক এটাও মনে করেন যে তার বিশ্বখ্যাত শিল্পকর্ম দ্য স্ক্রিম দস্তয়েভস্কির সৃষ্ট চরিত্র দিয়ে প্রভাবিত। দস্তয়েভস্কির মতো মুংকও খুঁজেছেন মানুষের আত্মাকে, আবরণ সরিয়ে তাকে উন্মুক্ত করতে চেয়েছেন সবার সামনে।

দস্তয়েভস্কি আর নিেশও একই কাজ করেছেন। নিেশ নিজেকে বলতেন, ‘আই অ্যাম ডাইনামাইট,’ আর দস্তয়েভস্কির কাহিনী বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে অস্বস্তি, কলঙ্ক, ক্ষোভে ঢাকা পড়ে থাকা মানব জীবনকে।

 

লেখাটি মূলত উইলিয়াম হুবেনের দস্তয়েভস্কি, কিয়ের্কেগার্দ, নিেশ অ্যান্ড কাফকা গ্রন্থ অবলম্বনে তৈরি

 

শানজিদ অর্ণব: লেখক ও অনুবাদক