অথচ আজ বিশ্বকাপের মঞ্চে চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন জার্মানির বিপক্ষে ম্যাচের আগে সবচেয়ে বেশি আলোচিত নাম—ইয়ান দিওমান্দে। মাত্র ১৯ বছর বয়সী এ আইভরিয়ান উইঙ্গারের উত্থান এতটাই চমকপ্রদ যে জার্মান শিবিরের সংবাদ সম্মেলন থেকে অনুশীলন মাঠ সবখানেই ঘুরেফিরে আসছে তার নাম। আজ দিবাগত রাত ২টায় টরন্টোর বিএমও ফিল্ডে গ্রুপ ‘ই’-এর গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে মুখোমুখি হবে জার্মানি ও আইভরি কোস্ট। দুই দলই নিজেদের প্রথম ম্যাচ জিতে এসেছে। তবে কুরাসাওকে ৭-১ গোলে বিধ্বস্ত করা জার্মানির সামনে এবার অপেক্ষা করছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চ্যালেঞ্জ। প্রতিপক্ষের আক্রমণভাগে রয়েছেন দিওমান্দে, আমাদ দিয়ালো ও নিকোলাস পেপের মতো গতিময় ফুটবলাররা। বিশেষ করে বুন্দেসলিগায় ঝড় তোলা দিওমান্দেকে ঘিরেই এখন সবচেয়ে বেশি সতর্ক জুলিয়ান নাগেলসমানের দল।
একুয়েডরের বিপক্ষে ১-০ ব্যবধানে জেতা ম্যাচে ইয়ান দিওমান্দে স্কোরশিটে নাম তুলতে না পারলেও আইভরি কোস্টের আক্রমণের অন্যতম প্রাণভোমরা ছিলেন। বাঁ প্রান্ত থেকে বারবার বল নিয়ে এগিয়ে গিয়ে তিনি একুয়েডরের রক্ষণকে পেছনে ঠেলে দেন। তার দ্রুত দিক পরিবর্তন, ওয়ান-অন-ওয়ান ড্রিবলিং এবং পেছনের ফাঁকা জায়গায় দৌড় একুয়েডরের ডিফেন্ডারদের সতর্ক রাখে পুরো ম্যাচজুড়ে। শেষ পর্যন্ত আমাদ দিয়ালোর জয়সূচক গোলের পেছনেও আইভরি কোস্টের এমন দ্রুত আক্রমণের ভূমিকা ছিল। আরবি লাইপজিগের এ উইঙ্গার গত মৌসুমে বুন্দেসলিগায় ১২ গোল ও ৮ অ্যাসিস্ট করে ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোরও নজরে রয়েছেন।
দিওমান্দের সবচেয়ে বড় শক্তি কেবল গতি নয়। তার বিশেষত্ব হলো স্টার্ট-স্টপ ড্রিবলিং। মুহূর্তের মধ্যে থেমে গিয়ে আবার বিস্ফোরক গতিতে ছুটে যাওয়ার ক্ষমতা ডিফেন্ডারদের ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়। ম্যাচপূর্ব সংবাদ সম্মেলনে জার্মান অধিনায়ক কিমিখও সে কথাই জানান। তিনি বলেন, ‘দিওমান্দের অ্যাক্সেলারেশন অবিশ্বাস্য।’ কিমিখ একা নন, জার্মান রক্ষণভাগের খেলোয়াড়দের কাছেও দিওমান্দে বড় উদ্বেগের নাম। জার্মান ডিফেন্ডার আন্তোনিও রুডিগার আরো এক ধাপ এগিয়ে দিওমান্দেকে তুলনা করেছেন ‘এক্সপ্রেস ট্রেন’-এর সঙ্গে। রুডিগারের মতে, দিওমান্দে, নিকোলাস পেপে ও আমাদ দিয়ালোকে দূর থেকে আসতে দেখা যায়, কিন্তু তার পরও তাদের থামানো কঠিন।
জার্মানির জন্য সমস্যাটা শুধু একজন খেলোয়াড়কে মার্ক করা নয়। কারণ আইভরি কোস্টের পুরো আক্রমণভাগই গতি ও ট্রানজিশনের ওপর দাঁড়িয়ে। মাঝমাঠে ফ্রাঙ্ক কেসি ও সেকো ফোফানার শক্তিশালী উপস্থিতি বল পুনরুদ্ধারে সাহায্য করে, এরপর মুহূর্তের মধ্যে বল চলে যায় দিওমান্দে, আমাদ দিয়ালো বা পেপের পায়ে। তারা এক-দুই স্পর্শে পুরো মাঠ অতিক্রম করতে পারে। ফলে জার্মানির মতো উচ্চ লাইন নিয়ে খেলা দলের জন্য এটি স্বাভাবিকভাবেই বিপজ্জনক সমীকরণ।
এ কারণেই সম্ভবত জুলিয়ান নাগেলসমান গত কয়েক দিনে কৌশলগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা বাড়িয়ে দিয়েছেন। সাধারণত ৪-২-৩-১ ফরমেশনে খেললেও অনুশীলনে দেখা গেছে জার্মানি কখনো ৫-৪-১, কখনো ৪-২-২-২ ছকে নিজেদের সাজাচ্ছে। এ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পেছনে মূল কারণ আইভরি কোস্টের গতিময় আক্রমণভাগ। সাধারণত জার্মানি ৪-২-৩-১ ছকে খেলে, যেখানে দুই ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার রক্ষণকে সুরক্ষা দেন এবং সামনে ভির্টজ, মুসিয়ালা, সানে ও হাভার্টজের মতো সৃজনশীল খেলোয়াড়রা আক্রমণের দায়িত্ব নেন। এ কাঠামোতে আক্রমণভাগে সংখ্যাগত সুবিধা তৈরি করা সহজ হলেও ফুলব্যাকরা ওপরে উঠে গেলে তাদের পেছনে ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়। দিওমান্দে ও আমাদ দিয়ালোর মতো দ্রুতগতির উইঙ্গারদের বিপক্ষে সেটিই বড় ঝুঁকি।
এ কারণেই অনুশীলনে ৫-৪-১ ছক ব্যবহার করে দেখেছেন নাগেলসমান। এ ব্যবস্থায় সানে নিচে নেমে পঞ্চম ডিফেন্ডারের ভূমিকা পালন করেন। ফলে কিমিখ, টাহ, শ্লটারবেক ও ব্রাউনের সঙ্গে আরো একজন রক্ষণভাগে যুক্ত হওয়ায় জার্মানি ট্রানজিশন মুহূর্তে বেশি সুরক্ষা পাবে। বিশেষ করে দিওমান্দেকে ওয়ান-অন-ওয়ান পরিস্থিতি না দিয়ে দুই বা তিনজনের ঘেরাটোপে রাখার সুযোগ তৈরি হবে।
অন্যদিকে ৪-২-২-২ ফরমেশনটি মূলত আক্রমণাত্মক বিকল্প। এখানে হাভার্টজের পাশে দ্বিতীয় স্ট্রাইকার হিসেবে মুসিয়ালাকে রাখা হয়, আর ভির্টজ ও সানে ভেতরের চ্যানেলে খেলেন। ফলে জার্মানি প্রতিপক্ষের দুই সেন্টারব্যাককে ক্রমাগত চাপে রাখতে পারে এবং বক্সের আশপাশে বেশি খেলোয়াড় জড়ো করতে পারে। তবে এ ছকের বড় শর্ত হলো বল হারানোর সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত কাউন্টার-প্রেসিং করা। কারণ আইভরি কোস্ট যদি প্রথম প্রেস ভেঙে বেরিয়ে যেতে পারে, তাহলে দিওমান্দের গতি জার্মানির জন্য বড় বিপদ হয়ে উঠতে পারে।
কুরাসাওর বিপক্ষে জার্মানির সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাদের পজিশনাল রোটেশন। ফ্লোরিয়ান ভির্টজ, জামাল মুসিয়ালা, লেরয় সানে ও কাই হাভার্টজ নিয়মিত জায়গা বদল করেছেন। ফলে প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডাররা কাকে অনুসরণ করবে, আর কাকে জোনাল মার্কিং করবে সে সিদ্ধান্তই নিতে পারেনি। কিন্তু আইভরি কোস্টের বিপক্ষে একই ধরনের আগ্রাসী অবস্থান জার্মানিকে ঝুঁকিতেও ফেলতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ‘রেস্ট ডিফেন্স’। আধুনিক ফুটবলে আক্রমণ করার সময় পেছনে কতজন খেলোয়াড় পাল্টা আক্রমণ সামলাতে অবস্থান করছেন, সেটিই রেস্ট ডিফেন্স। কুরাসাওর বিপক্ষে জার্মানি প্রায়ই মাত্র দুই বা তিনজন খেলোয়াড়কে পেছনে রেখেছিল। আইভরি কোস্টের বিপক্ষে সে বিলাসিতা সম্ভব নয়। দলটির গোলরক্ষক ম্যানুয়েল নয়্যারও সতর্ক করেছেন, ‘এক সেকেন্ডের জন্যও মনোযোগ হারানো যাবে না। কারণ প্রতিপক্ষের ফরওয়ার্ডদের গতি এমন যে একটি ভুল পাস বা বল হারানো মুহূর্তেই বিপদ ডেকে আনতে পারে।’
ফলে ম্যাচের একটি বড় কৌশলগত প্রশ্ন হলো জার্মানি কি নিজেদের স্বাভাবিক আক্রমণাত্মক দর্শন ধরে রাখবে, নাকি কিছুটা সংযত হবে? গত কয়েক বছরে জার্মানির বড় সমস্যাগুলোর একটি ছিল ভারসাম্যের অভাব। আক্রমণে অতিরিক্ত খেলোয়াড় তুলে এনে তারা প্রায়ই কাউন্টার অ্যাটাকে গোল খেয়েছে। ২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপের হতাশাজনক বিদায়ের পেছনেও সেই প্রবণতা কাজ করেছে। নাগেলসমান দায়িত্ব নেয়ার পর দলটিকে আরো বাস্তববাদী করার চেষ্টা করছেন। আইভরি কোস্ট ম্যাচ সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হতে পারে।
আইভরি কোস্ট শুধু রক্ষণাত্মক ফুটবল খেলবে না। দিওমান্দে, আমাদ দিয়ালো ও পেপেকে একসঙ্গে সামনে রাখার অর্থ হলো তারা জার্মানির ডিফেন্সকে নিয়মিত চাপে রাখার চেষ্টা করবে। বিশেষ করে রুডিগার ও নিকো শ্লটারবেকের মধ্যকার ফাঁকা জায়গা কিংবা ফুলব্যাকদের পেছনের করিডোরে আঘাত হানতে চাইবে তারা।
জার্মানির সামনে ইতিবাচক দিকও কম নেই। ভির্টজ ও মুসিয়ালা বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে সৃজনশীল তরুণ ফুটবলারদের মধ্যে অন্যতম। তারা লাইন ভেঙে পাস দিতে পারেন, সংকীর্ণ জায়গায় বল ধরে রাখতে পারেন এবং প্রতিপক্ষের রক্ষণকে টেনে বের করে আনতে পারেন। আইভরি কোস্ট যদি খুব নিচে নেমে রক্ষণ সাজায়, তাহলে এই দুই প্লেমেকার পার্থক্য গড়ে দিতে পারে। কাই হাভার্টজও ফালস নাইন ও প্রচলিত স্ট্রাইকার—দুই ভূমিকাতেই কার্যকর। ফলে আইভরি কোস্টের সেন্টারব্যাকদের জন্য পুরো ম্যাচজুড়ে অবস্থান ধরে রাখা সহজ হবে না।
তবে শেষ পর্যন্ত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ইয়ান দিওমান্দে। বিশ্বকাপ ইতিহাসে অনেক তরুণ ফুটবলারের ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে একটি বড় ম্যাচ। দিওমান্দের জন্য জার্মানির বিপক্ষের এ লড়াইটিও তেমন এক উপলক্ষ হয়ে উঠতে পারে।










