টোকিও অলিম্পিকে (২০২১ সালে অনুষ্ঠিত) যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে অবিশ্বাস্য লড়াই হয়। যুক্তরাষ্ট্র ৩৯টি স্বর্ণ জিতে টেবিলের শীর্ষস্থানে থাকলেও চীন খুব দূরে ছিল না। তারা ৩৮টি স্বর্ণ জয় করে। এবার প্যারিস অলিম্পিকেও শীর্ষস্থানের লড়াই চলছে এ দুই পরাশক্তির মধ্যে। সমানতালে লড়ছিল দুটি দেশ। গতকাল রাত ৯টা পর্যন্ত ৩৬টি স্বর্ণসহ ৮৬টি পদক জিতে টেবিলের এক নম্বরে ছিল চীন। ৩৩টি স্বর্ণসহ মোট ১১৩টি পদক নিয়ে দুইয়ে অবস্থান করছিল আমেরিকানরা। আজ শেষ হচ্ছে প্যারিস অলিম্পিক। সন্ধ্যায় শেষ ইভেন্ট পর্যন্ত থাকছে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই।
এ দুটি বড় দেশ অলিম্পিকে যেন গাণিতিক হিসাব কষেই পদক জিতে নেয়। তারা নির্দিষ্ট ইভেন্টগুলোকে টার্গেট করে এবং সেই লক্ষ্যে অ্যাথলিটদের প্রস্তুতও করে। ফলও প্রত্যাশামতো আসে। এবারো তার ব্যতিক্রম নয়। অলিম্পিকে চিরাচরিতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তির জায়গা হলো ট্র্যাক ও সাঁতারের পুল; চীনের ডাইভিং, শুটিং, বক্সিংয়ের মতো ইভেন্ট। দুটি দেশই এ ইভেন্টগুলোয় প্যারিসে ভালো করছে।
প্যারিসে শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত অ্যাথলেটিকসের ট্র্যাক থেকে সর্বোচ্চ স্বর্ণ ও সর্বোচ্চ পদক জয় করে যুক্তরাষ্ট্র। ১১টি স্বর্ণসহ ২৯টি পদক জয় করে দেশটি। পাশাপাশি ১০টি রৌপ্য ও ৮টি ব্রোঞ্জ জিতেছে আমেরিকানরা। অথচ ১০টি পদকও পায়নি অন্য কোনো দেশ! গতকাল রাত ও আজ শেষ দিনের ইভেন্ট থেকে আরো কিছু পদক জয়ের জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। ট্র্যাক ও ফিল্ডে যুক্তরাষ্ট্রের ধারেকাছে কেউ নেই। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৩টি স্বর্ণ জিতেছে কানাডা। অ্যাথলেটিকস থেকে চীন মাত্র একটি স্বর্ণ জিততে পেরেছে।
তিন-চারদিন ধরেই অ্যাথলেটিকসে রাজত্ব করে এসেছে অলিম্পিক ইতিহাসের সফলতম দেশটি। বৃহস্পতিবার রাতে দুর্দান্ত ফল করে তারা। মেয়েদের লং জাম্পে যুক্তরাষ্ট্রের টারা ডেভিস-উডহল, মেয়েদের ৪০০ মিটার হার্ডলসে যুক্তরাষ্ট্রের সিডনি ম্যাকলফলিন-লেভরন ও ছেলেদের ১১০ মিটার হার্ডলসে যুক্তরাষ্ট্রের গ্র্যান্ট হলোওয়ে স্বর্ণ জয় করেন। এ তিন স্বর্ণ দিয়ে চীনকে পেছনে ফেলে যায় যুক্তরাষ্ট্র। সেই রাতে স্তাদে দ্য ফ্রান্স স্টেডিয়ামের ট্র্যাক থেকে তিনটি স্বর্ণ ছাড়াও তিনটি রৌপ্য ও দুটি ব্রোঞ্জ পায় যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্য দিয়ে তারা স্বর্ণপদকে চীনকে টপকানোর পাশাপাশি মোট পদকের সংখ্যায় সেঞ্চুরিও করে ফেলে।
স্প্রিন্টের চারটি রেস থেকে যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য দুটি স্বর্ণ জিতেছে। ছেলেদের ১০০ মিটারে লাইলস ও মেয়েদের ২০০ মিটারে গ্যাব্রিয়েল টমাস স্বর্ণ জয় করেন। মেয়েদের ১০০ মিটারে সেন্ট লুসিয়ার জুলিয়েন আলফ্রেড ও ছেলেদের ২০০ মিটারে বতসোয়ানার লেতসিলে তেবোগো হেসেছেন শেষ হাসি। শুক্রবার রাতে ছেলেদের ৪০০ মিটার হার্ডলসে যুক্তরাষ্ট্রের রাই বেঞ্জামিন, মেয়েদের ১০ হাজার মিটারে কেনিয়ার বিয়াট্রিচ চেবেত, মেয়েদের ৪০০ মিটার ফাইনালে ডমিনিকান রিপাবলিকের মারিলেইদি পলিনহো, ছেলেদের ১০০ মিটার রিলেতে কানাডা, মেয়েদের ১০০ মিটার রিলেতে যুক্তরাষ্ট্র স্বর্ণ জয় করেছে।
ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ইভেন্ট হলো ১০০ মিটার স্প্রিন্ট। ২০০৮ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত টানা তিনটি অলিম্পিকে ১০০ মিটারে শ্রেষ্ঠত্ব দেখান জ্যামাইকান কিংবদন্তি উসাইন বোল্ট। তার অবসরের পর ছেলেদের ১০০ মিটারে শ্রেষ্ঠত্ব হারিয়েছে জ্যামাইকা। টোকিওতে স্বর্ণ জয় করেন ইতালির মার্সেল জ্যাকবস। প্যারিসে জ্যাকবস ব্যর্থ হয়েছেন, নতুন সূর্য উদিত হয়েছে এবার। বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন নোয়াহ লাইলস অলিম্পিকের নতুন দ্রুততম মানব হয়েছেন। মেয়েদের ১০০ মিটারে ফেভারিট ছিলেন বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন শা’কারি রিচার্ডসন। যদিও সবাইকে বিস্মিত করে দিয়ে অলিম্পিক স্বর্ণ জিতে নেন ক্যারিবিয়ান দ্বীপ দেশ সেন্ট লুসিয়ার জুলিয়েন আলফ্রেড। ১০.৭২ সেকেন্ড সময় নিয়ে তিনি চ্যাম্পিয়ন হন। শা’কারি রৌপ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের মেলিসা জেফারসন ব্রোঞ্জ জিতেছেন।
প্যারিসে মেয়েদের ২০০ মিটারে যুক্তরাষ্ট্রের গ্যাব্রিয়েল টমাস, ছেলেদের ৪০০ মিটার দৌড়ে যুক্তরাষ্ট্রের কুইন্সি হল, ১৫০০ মিটারে যুক্তরাষ্ট্রের কোল হকার, শট পুটে যুক্তরাষ্ট্রের রায়ান ক্রুজার স্বর্ণ জিতেছেন। শুক্রবার রাতে মেয়েদের ১০০ মিটার রিলে দলে ছিলেন শা’কারি, গ্যাব্রিয়েল টমাস, মেলিসা জেফারসন ও তানিশা টেরি।
ট্র্যাকে সবসময় আধিপত্য করা যুক্তরাষ্ট্র এবার কয়েকটি ইভেন্টে হোঁচটও খেয়েছে। যেমন, ৪০০ মিটার মিশ্র রিলেতে তাদের হতাশ করে স্বর্ণ জিতে নেয় নেদারল্যান্ডস দল। আমেরিকানরা চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পথে থাকলেও ডাচ রানার ফেমকে বলের শেষ মুহূর্তের ঝলকে সেটি তারা পারেনি। মেয়েদের ৪০০ মিটার হার্ডলসেও স্বর্ণের আশা করছিলেন ফেমকে বল। যদিও সিডনি ম্যাকলফলিনের সঙ্গে পেরে উঠলেন না ডাচ রানার।
ট্র্যাকে গতকাল রাতে কিছু ইভেন্ট ছিল। মেয়েদের ম্যারাথন, ছেলে ও মেয়েদের ৪০০ মিটার রিলে, ছেলেদের ৮০০ মিটার দৌড়, ছেলেদের হাই জাম্প, মেয়েদের ১৫০০ মিটার দৌড়, ছেলেদের ৫,০০০ মিটার দৌড়, মেয়েদের ১১০ মিটার হার্ডলস, মেয়েদের বর্ষা নিক্ষেপ থেকে বেশ কিছু স্বর্ণপদক জয়ের সম্ভাবনা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের। হয়তো এ ট্র্যাকই শেষ পর্যন্ত ১ নম্বর আসনে বসিয়ে দেবে আমেরিকানদের।
শুধু অ্যাথলেটিকসই নয়, সাঁতারের পুল থেকেও সর্বোচ্চ স্বর্ণ ও মোট পদকে সেরা যুক্তরাষ্ট্র। তারা ৮টি স্বর্ণসহ মোট ২৮টি পদক জিতেছে। কানাডার ১৭ বছর বয়সী জলকন্যা সামার ম্যাকিনটশ তিনটি ও ফরাসি সুপারস্টার লিওঁ মারশাঁ চারটি স্বর্ণ জিতে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যে ভাগ বসায়। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৭টি স্বর্ণ জিতেছে অস্ট্রেলিয়া। কেইলি ম্যাককিওন, মলি ও’কালাহান, আরিয়ার্নে টিটমাস ব্যক্তিগত ও টিম ইভেন্টে পুল থেকে অস্ট্রেলিয়াকে সাফল্য এনে দিয়েছেন। চীন ২টি স্বর্ণসহ ১২টি পদক জিতেছে সাঁতার থেকে।
ট্র্যাকে যুক্তরাষ্ট্র আধিপত্য করলে চীন রাজত্ব করেছে ডাইভিংয়ে। প্যারিসে নারী ও পুরুষ মিলে ডাইভিংয়ে ৮টি ইভেন্টের সবগুলোই জিতে নিয়েছে দেশটি। ১৯৮৪ সাল থেকে ডাইভিংয়ের ৭২টি স্বর্ণের মধ্যে ৫৫টি জিতেছে চীন। ২০০৮ সালের বেইজিং অলিম্পিক থেকে তারা আরো অপ্রতিরোধ্য—এ সময় ৪০টি স্বর্ণের মধ্যে তারা জিতেছে ৩৫টি।
ডাইভিং ছাড়া শুটিংয়েও ভালো করেছে চীন। শুটিংয়ে ১৫টি স্বর্ণের মধ্যে ৫টি জিতেছে চীন। দেশটি মোট ১০টি পদক জয় করে। শুটিংয়ে যুক্তরাষ্ট্র ১টি স্বর্ণসহ ৫টি পদক পায়।
জিমন্যাস্টিকস থেকে ৩টি স্বর্ণ জিতেছে যুক্তরাষ্ট্র, যার দুটিই এসেছে সিমোন বাইলসের একক নৈপুণ্যে। আরেকটি স্বর্ণ এসেছে টিম অল-অ্যারাউন্ড থেকে। জিমন্যাস্টিক থেকে চীন ২টি স্বর্ণসহ ১১টি পদক জিতেছে। এছাড়া জাপান জিতেছে ৩টি স্বর্ণপদক।
এবারের অলিম্পিকে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ৫৯২ জন ও চীনের ৪০৫ জন অ্যাথলিট প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে।










