প্রথম নারী সাফ ফুটসাল চ্যাম্পিয়নশিপে শিরোপার সুবাস পাচ্ছে বাংলাদেশ দল। আজ বেলা ২টায় ব্যাংককের নন্থাবুরি স্টেডিয়ামে মালদ্বীপের বিপক্ষে খেলবে সাবিনা খাতুনের দল। এ ম্যাচে জিতলে কিংবা ড্র করলেই শিরোপা উৎসব করবে লাল-সবুজ জার্সিধারী মেয়েরা। শিরোপা উৎসব হতে পারে সাবিনারা হারলেও। সেক্ষেত্রে ভুটান ও নেপাল ম্যাচের ফল বাংলাদেশের পক্ষে যেতে হবে।
বড় কোনো অঘটন না হলে বাংলাদেশের শিরোপা একরকম নিশ্চিতই হয়ে গেছে। কেননা প্রতিপক্ষ মালদ্বীপ সাত দলের এ আসরে টেবিলের তলানিতে রয়েছে, আর বাংলাদেশ ১৩ পয়েন্ট নিয়ে সবার শীর্ষে। একটি ম্যাচও জিততে পারেনি মালদ্বীপ, হেরেছে পাঁচটিতেই। দলটির খেলোয়াড়রা করেছেন ১০ গোল, আর গোল হজম করেছেন ২০টি। বাংলাদেশ পাঁচ ম্যাচের চারটি জিতেছে, একটি করেছে ড্র। কোনো হার নেই সাবিনাদের। প্রতিপক্ষকে ২৪ গোল দিয়েছে লাল-সবুজরা, আর হজম করেছে মাত্র ৮টি। বাংলাদেশ দলের ২৪ গোলের মধ্যে ১০টিই করেছেন অধিনায়ক সাবিনা খাতুন।
এ পরিসংখ্যান আর ফর্ম বিবেচনায় আজ কোনোভাবেই বাংলাদেশের সামনে পাত্তা পাওয়ার কথা না মালদ্বীপের। বাংলাদেশ হারলেও চ্যাম্পিয়ন হবে, যদি নেপালের সঙ্গে ভুটান জিততে না পারে। ১১ পয়েন্ট নিয়ে ভুটান টেবিলের দুইয়ে অবস্থান করছে। বাংলাদেশ ড্র করলে ভুটান জিতলেও লাভ হবে না। গোল ব্যবধানে এগিয়ে থাকায় বাংলাদেশই শিরোপা উৎসব করবে।
বৃহস্পতিবার ভুটানের কাছে হেরে শিরোপার রেস থেকে ছিটকে গেছে ভারত। আজ তারা আনুষ্ঠানিকতার ম্যাচ খেলবে শ্রীলংকার সঙ্গে।
জাতীয় ফুটবল দলে ব্রাত্য হয়ে পড়া সেই সাবিনা, মাসুরাদের হাত ধরে আরো একটি সাফ মুকুট হাতছানি দিচ্ছে বাংলাদেশকে। ২০২২ সালে নেপালের মাঠে সাবিনা খাতুন, কৃষ্ণা রানীদের নৈপুণ্যে প্রথমবারের মতো নারী ফুটবলে দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছিল বাংলাদেশ। সেই সাফল্য তারা ধরে রাখে ২০২৪ সালের আসরেও। সেই আসরে বাম পায়ের এক জাদুকরী গোলে বাংলাদেশকে দ্বিতীয় সাফ শিরোপা এনে দেন ঋতুপর্ণা চাকমা। সেই গোলটিই তাকে সুপারস্টার বানিয়ে দেয়। এরপর থেকে ঋতুপর্ণা বাংলাদেশ নারী ফুটবলের ‘পোস্টার গার্ল’। সেবার অবদান রেখেছিলেন দলের প্রতিটি খেলোয়াড়ই। তহুরা খাতুন করেছিলেন ৫ গোল। সাফজয়ী স্কোয়াডে ছিলেন সবচেয়ে অভিজ্ঞ নাম সাবিনা ছাড়াও মাসুরা পারভীন, মাতসুশিমা সুমাইয়া।
কিন্তু নেপালে সেবার সাফ আসর চলাকালে সিনিয়রদের বাদ দেয়া নিয়ে কোচ পিটার বাটলারের সঙ্গে খেলোয়াড়দের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। এটার রেশ থাকে দেশে ফেরার পর পর্যন্ত। সাফ জিতে দেশে আসার পর সিনিয়র খেলোয়াড়রা কোচের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং তাকে বাদ দিতে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের কাছে লিখিত অভিযোগও করেন। এতে কোচ-ফুটবলার অঘোষিত ‘যুদ্ধ’ শুরু হয়, যাতে শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হন কোচ বাটলার। এরপর জাতীয় ফুটবল দলে ব্রাত্য হয়ে যান একঝাঁক সিনিয়র ফুটবলার। গত বছর শুরুর দিকে মিয়ানমারে অনুষ্ঠিত এএফসি উইমেনস এশিয়ান কাপের বাছাইপর্ব উতরে ইতিহাস গড়ে বাংলাদেশ দল। এরপর বাটলার ফেডারেশনের আরো আস্থা অর্জন করেন এবং সাবিনারা যেন চিরতরে দলে জায়গা হারিয়ে ফেলেন।
জাতীয় ফুটবল দল থেকে ছিটকে পড়ে বসে থাকেননি সাবিনা, মাতসুশিমা সুমাইয়া, মাসুরা পারভীনরা। তারা ভুটানের লিগে খেলে নিজেদের ফিট রেখেছেন। এছাড়া কৃষ্ণা রানী সরকার ও নিলুফার ইয়াসমিন নীলাও বাটলারের দলে ব্রাত্য হয়ে পড়েন। তারাও খেলেন ভুটানে। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ সামনে রেখে এই পাঁচ ফুটবলারই পরে ডাক পান নারী ফুটসাল দলে। এতে তাদের যেমন খেলার সুযোগ তৈরি হয়, তেমনি তাদের কল্যাণে বাংলাদেশেরও আরেকটি সাফ মুকুট জয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়।
তবে ৪০ মিনিটের ও আলাদা টার্ফের ‘ফাইভ-এ-সাইড’ ফরম্যাটের এ খেলায় তো তারা অভ্যস্ত ছিলেন না। এখানে ক্ষিপ্রগতির ফুটবল খেলতে হয়, সিদ্ধান্তও নিতে হয় দ্রুততম সময়ে। ইরানের ফুটসাল কোচ সাঈদ খোদারাহমি সাফ ফুটবলের শিরোপাজয়ী এ মেয়েদের ফুটসালের জন্য তৈরি করতে থাকেন নিবিড় পরিচর্যায়। এ চ্যালেঞ্জে তিনি ও সাবিনারা উভয়ই সফল। আজ শিরোপা উদযাপনে যা পূর্ণতা পেতে যাচ্ছে।
শুক্রবার পাকিস্তানকে ৯-১ গোলে ভাসিয়ে শিরোপা জয় প্রায় নিশ্চিত করে ফেলে বাংলাদেশ। ওইদিন আরেক ম্যাচে ভুটানের কাছে ২-১ গোলে হেরে শিরোপার রেস থেকে ছিটকে যায় ভারত। এখন বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী কেবল ভুটান। নেপালের বিপক্ষে দেশটির জয়ের বিপরীতে মালদ্বীপের বিপক্ষে বাংলাদেশ হেরে গেলেই মিলবে সেই সমীকরণ। কিন্তু সেই সম্ভাবনা ক্ষীণ।
সব মিলিয়ে সাফে ‘হ্যাটট্রিক’ জিততে চলেছেন সাবিনা এবং এ পথে তিনিই দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। পাকিস্তানের বিপক্ষে অধিনায়ক সাবিনা একাই করেন চার গোল। ম্যাচের ৮, ১৬, ৩৪ ও ৪০ মিনিটে চার গোল করেন জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক। এছাড়া নওশীন জাহান ও কৃষ্ণা রানী করেন জোড়া গোল। অন্য গোলটি করেন নীলা। আসরে ১০ গোল নিয়ে শীর্ষে সাবিনা। ৭ গোল নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে ভারতের খুশবু সরোজ। এছাড়া বাংলাদেশের কৃষ্ণা ৫ গোল, সুমাইয়া ৩ গোল, নওশিন ও মাসুরা উভয়ই ২ গোল এবং লিপি ও নীলা উভয়ই ১ গোল করেন।
শক্তিশালী ভারতকে ৩-১ গোলে হারিয়ে প্রথম নারী সাফ ফুটসাল আসর শুরু হয় বাংলাদেশ দলের। দ্বিতীয় ম্যাচে ভুটানের সঙ্গে ৩-৩ গোলে ড্র করে বসে তারা। পরের তিন ম্যাচেই আসে টানা জয়। নেপালকে ৩-০ গোলে, শ্রীলংকাকে ৬-২ গোলে ও পাকিস্তানকে ৯-১ গোলে হারান সাবিনা-কৃষ্ণারা।
সাঈদ খোদারাহমি বাংলাদেশ ফুটসালে ছেলে ও মেয়ে উভয় দলেরই কোচের দায়িত্বে রয়েছেন। তবে মেয়েদের দলকে শিরোপার কাছাকাছি নিয়ে গেলেও ছেলেদের দলটিকে নিয়ে সাফল্য পাননি তিনি। ছেলেদের সাত দলের সাফ ফুটসাল চ্যাম্পিয়নশিপে ৬ ম্যাচে ৭ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের চারে অবস্থান করছিল বাংলাদেশ। বৃহস্পতিবার পাকিস্তানের কাছে ১-৫ গোলে হেরে শিরোপার রেস থেকে ছিটকে পড়ে তারা। গতকাল রাউন্ড রবিন লিগের শেষ ম্যাচে নেপালের কাছে তারা হেরেছে ১-৪ গোলে। ভারতের কাছে শ্রীলংকা হারলে টেবিলের পাঁচে নেমে যাবে বাংলাদেশ।










