বৈরী রাজনৈতিক সম্পর্কের জেরে প্রায় দুই দশক ধরে পাকিস্তানের মাটিতে খেলতে যায় না ভারতীয় ক্রিকেট দল। সেই ধারাবাহিকতায় আসন্ন আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতেও পাকিস্তানের মাঠে খেলবে না রোহিত শর্মার দল। ফলে বাধ্য হয়েই ভারতের সব ম্যাচ নিরপেক্ষ ভেন্যু দুবাইয়ে আয়োজন করছে আইসিসি। এমনকি ভারত-পাকিস্তান ফাইনাল হলেও ম্যাচটি দুবাইয়ে হবে বলে আগেই জানিয়ে দেয়া হয়েছে।

দুই দেশের মধ্যকার এ টানাপড়েনের পরও তাদের ম্যাচ নিয়ে সমর্থকদের মধ্যে তুমুল আগ্রহ। ২৩ ফেব্রুয়ারি দুবাইয়ে মুখোমুখি হবে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারত ও পাকিস্তান। ওই ম্যাচের টিকিটের জন্য চলছে হাহাকার। বৈশ্বিক আসরে এ নিয়ে টানা তিন বছর ভারত-পাকিস্তান মুখোমুখি হচ্ছে বলেই বাড়তি উন্মাদনা একটু বেশিই। এর আগে তারা খেলেছে ২০২৩ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপ আহমেদাবাদে ও ২০২৪ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ নিউইয়র্কে।

আইসিসির ক্যালেন্ডার থেকে হারিয়েই যেতে বসেছিল চ্যাম্পিয়নস ট্রফি আসর। সর্বশেষ এটি বসেছিল ২০১৭ সালে। বিরতি দিয়ে ২০২১ সালে আবারো এই আসরটি ফেরানোর ঘোষণা দেয় আইসিসি। তখন অনেকে এ ঘোষণায় অবাক হয়েছিলেন। কেননা এরই মধ্যে বিশ্বজুড়ে ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক টি-টোয়েন্টি লিগের জয়জয়কার। সবাই টাকার পেছনে ছুটছে। আশঙ্কা ছিল, ওয়ানডে ফরম্যাটের চ্যাম্পিয়নস ট্রফি আয়োজন করে আইসিসির লোকসান হতে পারে। আবার পরের আসরটি পাকিস্তানে হবে বলেও আরেক সংকট দেখা দেয়। ভারত তো নিশ্চিতভাবেই প্রতিবেশী দেশে খেলতে যাবে না। তার ওপর ওয়ানডে ফরম্যাট। লোকসান গুনতে আইসিসি তৈরি হও! কিন্তু চিত্রটা পাল্টে দিল ভারত-পাকিস্তান লড়াই। দিন যত ঘনিয়ে আসছে ততই বাড়ছে কথার লড়াইও। দুই পরাশক্তির জন্যই যেন জমে উঠতে যাচ্ছে চ্যাম্পিয়নস ট্রফি।

২০০৮ সালের পর পাকিস্তানের মাঠে খেলেনি ভারত। ২০১২ সালে দুই দেশ সর্বশেষ দ্বিপক্ষীয় ওয়ানডে সিরিজ খেলেছে। সেবার ভারতের মাঠে সিরিজটা ২-১-এ জয় করে পাকিস্তান। রাজনৈতিক টানাপড়েনে এরপর আর কোনো দ্বিপক্ষীয় সিরিজ হয়নি। দুই দল এখন শুধু বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক আসরে মুখোমুখি হয়। ২০২৩ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপ ও ২০২৪ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে একে অন্যের বিপক্ষে লড়েছে এশিয়ান জায়ান্টরা। আরেকটি বৈশ্বিক আসরে দুই দল মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

আহমেদাবাদের ম্যাচে পাকিস্তানের দর্শকদের ভিসা দেয়া হয়নি, এমনকি পাকিস্তানি সাংবাদিকরাও ভারতের ভিসা পাননি। পাকিস্তান ক্রিকেট দল ডানপন্থী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির রাজ্য গুজরাটের আহমেদাবাদে খেলতে চায়নি। তবু ভারতের চাওয়াই প্রাধান্য পায়, ম্যাচটি সেখানেই আয়োজন করা হয়। এত কিছুর পরও মাঠে তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না।

সেই দৃশ্যের অবতারণা হতে পারত লাহোর কিংবা করাচিতে। যদিও ভারতীয়রা সেখানে খেলতে যাচ্ছে না বলে ক্রিকেট সমর্থকরা বহুল প্রত্যাশিত এই দৃশ্য দেখা থেকে বঞ্চিতই হচ্ছেন।

আইসিসির হেড কোয়ার্টারের সন্নিকটেই দুবাই ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট স্টেডিয়াম। এই গ্রাউন্ডে গ্যালারি ভরে যায় খুব কম ম্যাচেই। যদিও এবার ভিন্ন এক দৃশ্যের অবতারণা হতে চলেছে। ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের টিকিট অনলাইনে ছাড়ার পর কয়েক মিনিটেই সব বিক্রি হয়ে যায়! টিকিটের দামও চড়া। সবচেয়ে সস্তা টিকিটের দাম ১৩৬ ডলার, দামিটার দাম ১৩০০ ডলার। গত বছর নিউইয়র্কে এই দুই দলের ম্যাচের টিকিট বিক্রি হয়েছিল আকাশচুম্বী দামে। তখন টিকিট পুনঃবিক্রি হয়েছিল ২৫০০ থেকে ১০ হাজার ডলারে!

ভারত-পাকিস্তান লড়াই বলে কথা। অবশ্য ২০ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের বিপক্ষে ভারতের ম্যাচের সব টিকিট ফুরিয়ে যায়নি, কিছু টিকিট এখনো অবিক্রীত রয়ে গেছে।

বৈশ্বিক আসর মানেই ভারতের আধিপত্য। ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে কর্তৃত্ব করে এসেছে ‘মেন ইন ব্লু’রা। ওয়ানডে এখন পর্যন্ত আটবারের দেখায় প্রতিবারই জিতেছে ভারত। ১৯৯২ বিশ্বকাপ ৪৩ রানে, ১৯৯৬ বিশ্বকাপে ৩৯ রানে, ১৯৯৯ বিশ্বকাপে ৪৭ রানে, ২০০৩ বিশ্বকাপে ৬ উইকেটে, ২০১১ বিশ্বকাপে ২৯ রানে, ২০১৫ বিশ্বকাপে ৭৬ রানে, ২০১৯ বিশ্বকাপে ডিএলএস মেথডে ৮৯ রানে ও ২০২৩ বিশ্বকাপে ৭ উইকেটের জয় পায় ভারত। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে হেড-টু-হেডে ৬-১-এ এগিয়ে ভারত। অবশ্য চ্যাম্পিয়নস ট্রফির রেকর্ড পাকিস্তানেরই পক্ষে। এখন পর্যন্ত তিনবারের মুখোমুখিতে প্রতিবারই পাকিস্তান জিতেছে।

২০০৪ সালে বার্মিংহামে ৩ উইকেটে, ২০০৯ সালে সেঞ্চুরিয়নে ৫৪ রানে ও লন্ডনে ২০১৭ সালের ফাইনালে ১৮০ রানের বিশাল ব্যবধানে ভারতকে হারায় পাকিস্তান। রোববার চতুর্থবারের মতো চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে ক্রিকেটের দুই পরাশক্তি, দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দল।