শুক্রবার ভোরে আর্জেন্টিনার জয়ের মধ্য দিয়ে পর্দা উঠেছে ৪৮তম কোপা আমেরিকা ফুটবল টুর্নামেন্টের। উত্তর আমেরিকার দল কানাডাকে ২-০ গোলে হারিয়ে শুভসূচনা করে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা। গত আসরে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোয় অনুষ্ঠিত ফাইনালে স্বাগতিকদের হারিয়ে ১৫তম শিরোপা জিতে নেয় আর্জেন্টিনা। এবারো কি লিওনেল মেসির হাতেই উঠছে শিরোপা, নাকি গতবার ফাইনালের হারের দুঃখ ভোলার উপলক্ষ পাবে ব্রাজিল?
অংশগ্রহণকারী দলের হিসাবে এবার ইতিহাস গড়ল কোপা আমেরিকা। এই প্রথম কোপায় অংশ নিচ্ছে মোট ১৬টি দল। লাতিন মহাদেশের দশটি এবং উত্তর ও মধ্য আমেরিকার ছয়টি দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ পেয়েছে। এবারের আসর বসছে যুক্তরাষ্ট্রে। দেশটির মোট ১৪টি ভেন্যুতে খেলাগুলো হবে। ১৪ জুলাই (বাংলাদেশ সময় ১৫ জুলাই সকাল ৬টা) মিয়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে ফাইনালের মধ্য দিয়ে পর্দা নামবে এবারের আসরের।
১৬টি দল চারটি গ্রুপে ভাগ হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে এবারের কোপায়। ‘এ’ গ্রুপে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ চিলি, পেরু ও কানাডা। ‘বি’ গ্রুপে মেক্সিকো, একুয়েডর, ভেনেজুয়েলা ও জ্যামাইকা, ‘সি’ গ্রুপে যুগ্মভাবে রেকর্ড ১৫ বারের চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ে খেলবে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র, বলিভিয়া ও পানামার সঙ্গে। নয়বারের লাতিন ও পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল ‘ডি’ গ্রুপে খেলবে কলম্বিয়া, প্যারাগুয়ে ও কোস্টারিকার সঙ্গে।
আর্জেন্টিনা উদ্বোধনী দিন মাঠে নামলেও তাদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিল প্রথম ম্যাচ খেলবে তারও চারদিন পর। বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার ভোর ৬টায় সেলেসাওরা প্রথম ম্যাচ খেলবে মধ্য আমেরিকার দেশ কোস্টারিকার সঙ্গে।
প্রতি গ্রুপ থেকে দুটি করে দল সরাসরি উঠে যাবে কোয়ার্টার ফাইনালে। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা কিংবা উরুগুয়ের মতো ফেভারিট দলগুলোর মূল চ্যালেঞ্জ শুরু হবে মূলত নকআউট পর্ব থেকেই।
কোপার প্রস্তুতি ম্যাচে গুয়াতেমালাকে ৪-১ গোলে ও একুয়েডরকে ১-০ গোলে হারায় আর্জেন্টিনা। কোপায়ও সেই ফর্ম ধরে রেখে কানাডাকে ২-০ গোলে হারিয়ে দেয় আলবিসেলেস্তেরা। গোল করেন হুলিয়ান আলভারেজ ও লাউতারো মার্টিনেজ। গতকাল ‘এ’ গ্রুপের দ্বিতীয় ম্যাচে গোলশূন্য ড্র করেছে চিলি ও পেরু। ফলে ৩ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপের শীর্ষে থাকছে আর্জেন্টিনাই।
আজ ভোরে ‘বি’ গ্রুপ ম্যাচে মুখোমুখি হয় একুয়েডর ও ভেনেজুয়েলা। সকাল ৭টায় মেক্সিকোর মুখোমুখি হবে ক্যারিবিয়ান দেশ জ্যামাইকা। সোমবার ভোর ৪টায় বলিভিয়ার বিপক্ষে খেলবে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র।
চরম নাটকীয়তা আর রোমাঞ্চকর মুহূর্ত নিয়ে হাজির হচ্ছে আরেকটি কোপা আমেরিকা আসর। ফুটবল বিশ্লেষকদের চোখে, এবারো কোপায় ফেভারিট মেসির আর্জেন্টিনা। আলবিসেলেস্তেরা ২০২১ সালে কোপা ও ২০২২ সালে বিশ্বকাপ জয় করে। বর্তমান ফর্ম ও সাম্প্রতিক রেকর্ডই আর্জেন্টিনাকে হট ফেভারিটের মর্যাদা দিচ্ছে।
বুকিং সাইটগুলোর চোখেও আর্জেন্টিনা এবার ফেভারিট। টুর্নামেন্টের ইতিহাসে সর্বোচ্চ (উরুগুয়ের সঙ্গে যুগ্মভাবে সর্বোচ্চ ১৫ বার চ্যাম্পিয়ন) শিরোপাজয়ী ও সর্বশেষ আসরের চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। সেই সঙ্গে বর্তমান দলটি রয়েছে অনবদ্য ফর্মে। লিওনেল মেসির মতো নেতা রয়েছেন বলেই আর্জেন্টিনাকে ঘিরে প্রত্যাশা বেড়েছে। তিনি ফিট থাকলে এখনো যে ম্যাচে ব্যবধান গড়ে দিতে পারেন। বয়সটা ৩৭ হয়ে গেলেও ফিট থাকলে তাকে আটকানো প্রতিপক্ষের রক্ষণের জন্য এখনো বড় চ্যালেঞ্জের।
মেসির পাশাপাশি একঝাঁক তরুণ খেলোয়াড় আর্জেন্টিনার শক্তি। ম্যানসিটির ফরোয়ার্ড হুলিয়ান আলভারেজ, চেলসির মিডফিল্ডার এঞ্জো ফার্নান্দেজ ছাড়াও অ্যালেক্সিস ম্যাক-অ্যালিস্টার ও আলেহান্দ্রো গারাঞ্চো স্বপ্ন দেখাচ্ছেন আর্জেন্টিনাকে।
লাতিন জায়ান্ট ব্রাজিলের গত কয়েকটি বছর খারাপ কেটেছে। ২০২১ সালের কোপা ফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে পরাজয়ের পর ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপেও বিবর্ণ ছিল সেলেসাওরা। এতে তাদের ওপর কোপা জয়ের চাপ বাড়ছে। সর্বশেষ ২০১৯ সালের কোপা শিরোপা জয় করে ব্রাজিল। এবার কোপার শিরোপা পুনরুদ্ধার ও গত আসরের ফাইনালে হারের প্রতিশোধ নিতে মরিয়া হবেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, রদ্রিগো, এনদ্রিকরা।
দুঃসময় তাড়াতে ব্রাজিল এ বছর কোচ হিসেবে নিয়োগ করেছে অভিজ্ঞ দরিভাল জুনিয়রকে। সেই থেকে তারা তিন ম্যাচে অপরাজিত। সর্বশেষ কোপার প্রস্তুতি ম্যাচে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করেছে। নতুন কোচ দলের মধ্যে নতুন প্রাণ ও আশার সঞ্চার করেছেন। ফলে কোপায় আশা জেগেছে ব্রাজিলের।
এবারো কোপায় খেলা হচ্ছে না নেইমারের। এটা ব্রাজিলের জন্য চরম দুর্ভাগ্যের যে বড় আসর এলেই নেইমার কোনো না কোনো চোটের সঙ্গে লড়াই করেন। এর পরও ব্রাজিলের স্কোয়াড যথেষ্ট শক্তিশালী। সেলেসাওদের আক্রমণভাগের নেতৃত্বে থাকবেন ভিনিসিয়ুস, যিনি এবার ব্যালন ডি’অর জয়ের ক্ষেত্রে ফেভারিট।
আর্জেন্টিনার মতোই ব্রাজিলের স্কোয়াডও অভিজ্ঞ ও তারুণ্যের মিশেলে গড়া। সেলেসাও সমর্থকরা বড় আসরে ১৭ বছরের কিশোর এনদ্রিকের পারফরম্যান্স দেখায় অপেক্ষায় থাকবেন। অভিষেকের পর টানা তিন ম্যাচে গোল করা এনদ্রিককে এরই মধ্যে পেলের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে।
আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল তো কোপার চির ফেভারিট। সেই সঙ্গে উরুগুয়েও। লাতিন মহাদেশের শ্রেষ্ঠত্বের আসর মানেই উরুগুয়েকে হিসাবের মধ্যে রাখতে হবে। এবারো তার ব্যতিক্রম হবে না। টুর্নামেন্টে যুগ্মভাবে ১৫ বার শিরোপা জয় করা দলটি ২১ বার ফাইনাল খেলেছে! সর্বশেষ ২০২১ সালে কোপা জয় করা লা সেলেস্তেরা সবসময়ই মহাদেশীয় এ আসরে মেধাবী খেলোয়াড়সমৃদ্ধ দল মাঠে নামায় এবং তাদের হারানো সবসময়ই কঠিন।
লুইজ সুয়ারেজের বয়স ৩৭ হয়ে গেলেও তিনি এখনো প্রতিপক্ষের জন্য হুমকি। মেসির সঙ্গে ইন্টার মিয়ামিতে খেলেন তিনি। হয়তো নকআউটেই বন্ধুর মুখোমুখি হবেন সুয়ারেজ। উরুগুয়ে স্কোয়াডের বড় নাম হিসেবে আরো আছেন রিয়াল মাদ্রিদের ফেদেরিকো ভালভার্দে ও লিভারপুলের ডারউইন নুনেজ।










