তিনি নিঃসন্দেহে ফুটবলের সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মহাতারকা। কিন্তু প্রকৃতির নিয়মে প্রতিটি উজ্জ্বল দিনান্তেই একসময় গোধূলি ঘনিয়ে আসে। রোনালদোর আড়াই দশকের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের আকাশেও যেন এখন নেমেছে বিষণ্ণ পড়ন্ত বিকেল। একসময়ের ত্রাস জাগানো সেই অতিমানবিক ক্ষিপ্রতা আর নেই। বিশ্বকাপ ও ইউরোর মতো মর্যাদাপূর্ণ টুর্নামেন্টের টানা ১০টি ম্যাচে জাদুকরের পা থেকে আসেনি কোনো গোল!

কঙ্গো ডিআরের বিপক্ষে ১-১ গোলের নিষ্প্রভ ড্র যেন সেই নিভুনিভু প্রদীপেরই প্রতিচ্ছবি। তিনটি শট নিয়ে একটিও লক্ষ্যে রাখতে পারেননি তিনি। উদ্বেগ কেবল মহাতারকার ফর্ম নয়; পর্তুগালেরও। বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নে বিভোর দলটিকে খুঁজতে হবে এমন সমাধান, যেখানে কিংবদন্তির প্রতি শ্রদ্ধা অটুট থাকবে, কিন্তু তার সীমাবদ্ধতার ভারে থমকে হোঁচট খাবে না দলের পথচলা। অন্যভাবে বললে, রোনালদো সমস্যার ‘টোটকা’ খুঁজতেই হবে পর্তুগালকে।

পরিসংখ্যান বলছে, পুরো ম্যাচে তিনি মাত্র ২৫ বার বল স্পর্শ করেছেন। তিনটি শট নিয়েছেন, সবক’টি অবিশ্বাস্যভাবে লক্ষ্যভ্রষ্ট। কোনো সুযোগও তৈরি করতে পারেননি, কোনো কি-পাস নেই, কোনো সফল ড্রিবল নেই। হিটম্যাপ দেখলে বোঝা যায়, তিনি মূলত প্রতিপক্ষের বক্স ও ডানদিকের হাফ-স্পেসে অবস্থান নিয়েছেন। অর্থাৎ নিচে নেমে খেলা তৈরি করা বা ডিফেন্ডারদের টেনে বের করে জায়গা তৈরির কাজ খুব কমই করেছেন। এমনকি ডিফেন্সে সাহায্য করা বা প্রেসিং করার ক্ষেত্রেও তার অবদান ছিল শূন্য। যেন বক্সের ভেতরে সুযোগের অপেক্ষায় থাকা একজন স্ট্রাইকার। তার খেলা এখন নির্ভর করে সতীর্থদের কাছ থেকে পাওয়া সার্ভিসের ওপর। কিন্তু সমস্যা হলো, ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে সতীর্থদের কাছ থেকে সে সার্ভিসও পর্যাপ্ত ছিল না।

ম্যাচ শেষে রবার্তো মার্তিনেজের বক্তব্যেও সেই আক্ষেপ স্পষ্ট ছিল। তার মতে, দল গোল করার পর খেলার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং শেষ তৃতীয়াংশে গিয়ে স্ট্রাইকারকে প্রয়োজনীয় বল সরবরাহ করতে পারেনি। কোচের যুক্তি হলো, রোনালদোর নড়াচড়া কাজে লাগানোর মতো পরিস্থিতি তৈরি করতে পারেনি দল।

এ বক্তব্য সত্য বটে তবে পুরো সত্য নয়। একজন স্ট্রাইকারকে কার্যকর করতে যদি দলে এত বেশি কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে হয়, তাহলে সে স্ট্রাইকার উপযুক্ত বিকল্প কিনা? পর্তুগালের বর্তমান স্কোয়াডে ব্রুনো ফার্নান্দেজ, বার্নার্দো সিলভা, ভিটিনিয়া, জোয়াও নেভেস, পেদ্রো নেতো কিংবা ফ্রান্সিসকো কনসেইসাওয়ের মতো গতিশীল ও সৃজনশীল ফুটবলার আছেন। তবুও গোলের মুখ যে খোলা গেল না সেখানেই মার্তিনেজের কৌশলগত সীমাবদ্ধতার প্রশ্ন উঠে আসে।

রোনালদো ২০২২ বিশ্বকাপে ঘানার বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে গোল করার পর বিশ্বকাপ ও ইউরো মিলিয়ে টানা ১০ ম্যাচে গোলশূন্য। গত ইউরোতেও পাঁচ ম্যাচে গোল পাননি। অথচ এই সময়েও তিনি প্রায় সব ম্যাচেই দলের প্রধান স্ট্রাইকার হিসেবে খেলেছেন। যদি রোনালদোকে একাদশে রাখতেই হয় তবু বিকল্প কোনো পরিকল্পনা কেন করলেন না তিনি।

কঙ্গো ম্যাচে ৮৩তম মিনিটে যখন পর্তুগালের একটি গোল খুব বেশি প্রয়োজন, তখন কঙ্গো তাদের ডিফেন্সে ৫-৬ জন খেলোয়াড় নিয়ে রীতিমতো দেয়াল তুলে দিয়েছে। এমন একটি সময়ে মার্তিনেজ বদলি স্ট্রাইকার গনসালো রামোসকে মাঠে নামান। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, তিনি নিষ্প্রভ রোনালদোকে তুলে না নিয়ে মাঠ থেকে তুলে নেন মিডফিল্ডার ভিতিনহাকে। মার্তিনেজের যুক্তি ছিল, ‘বিশ্বের সেরা গোলস্কোরারকে এমন এক মুহূর্তে তুলে নেয়া অর্থহীন, যখন আপনার গোল প্রয়োজন।’ কিন্তু বাস্তবতা হলো, রোনালদোর সেই ‘সেরা গোলস্কোরার’ তকমাটি এখনো অক্ষুণ্ন আছে কি?

সমালোচকদের মতে, রোনালদো এখনো স্কোয়াডের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। তার অভিজ্ঞতা, নেতৃত্ব এবং বক্সে উপস্থিতি মূল্যবান। কিন্তু শুরু থেকে ৯০ মিনিট খেলার মতো অবস্থানে তিনি আর নেই। বরং ম্যাচের শেষ ২৫-৩০ মিনিটে ক্লান্ত ডিফেন্সের বিপক্ষে সতেজ রোনালদোকে নামানো হলে তিনি আরো কার্যকর হতে পারেন। তবে সেটা সহজ নয়। সিআর সেভেনকে বেঞ্চে বসানো কেবল কৌশলগত নয়, মানসিক দিক থেকেও বড় সিদ্ধান্ত।

ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে ম্যাচটি অন্তত দেখিয়ে দিয়েছে, পরিকল্পনা অনুযায়ী সফল না হলে পর্তুগালের হাতে কার্যকর বিকল্প খুব কম। তাই রোনালদোর ফর্ম নিয়ে যত আলোচনা থাকুক, রবার্তো মার্তিনেজের সবচেয়ে জরুরি কাজ সম্ভবত নির্ভরযোগ্য ‘প্ল্যান বি’ তৈরি করা—যাতে প্রয়োজন হলে কিংবদন্তির ওপর নির্ভর না করেও জয়ের পথ খুঁজে নেয়া যায়।