এটি শুধু বিপণন বার্তা নয়; বিশ্বকাপের দর্শনেরও অংশ। কিন্তু ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের দিকে তাকালে দেখা যায়, মাঠের ভেতরে যতটা ফুটবল থাকবে, মাঠের বাইরে ততটাই উপস্থিত থাকবে ভূরাজনীতি, অভিবাসননীতি, নিরাপত্তা উদ্বেগ, মানবাধিকার বিতর্ক ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রদর্শন।
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো মিলে আয়োজন করছে ১০৪ ম্যাচের এ আসর। ২০১৭ সালে যখন এ তিন দেশ আয়োজক হওয়ার পরিকল্পনা শুরু করেছিল, তখন তাদের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতার ভিত্তি ছিল উত্তর আমেরিকান মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি। কিন্তু সময় বদলেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কানাডা ও মেক্সিকোর সম্পর্ক আগের মতো নেই। সীমান্ত, অভিবাসন, বাণিজ্য শুল্ক ও নিরাপত্তা নিয়ে মতপার্থক্য বেড়েছে। ফলে যে বিশ্বকাপকে উত্তর আমেরিকার ঐক্যের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়েছিল, সেটিই এখন অনেকের কাছে রাজনৈতিক টানাপড়েনের আয়না।
সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রমণ ও ভিসা নীতি। বিশ্বকাপে অংশ নেয়া খেলোয়াড়, কোচ ও কর্মকর্তাদের জন্য বিশেষ ছাড় থাকলেও সমর্থকদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। ট্রাম্প প্রশাসনের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা কয়েকটি দেশের নাগরিকদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হাইতি ও ইরান, যাদের জাতীয় দল বিশ্বকাপে খেলবে। আইভরি কোস্ট ও সেনেগালের মতো দেশও আংশিক বিধিনিষেধের আওতায়। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, যদি একটি দল তাদের হাজারো সমর্থককে সঙ্গে নিয়ে বিশ্বকাপে যেতে না পারে, তবে সেটি কি উদযাপনের অংশ থাকে?
খেলার মনস্তত্ত্বে সমর্থকদের ভূমিকা বিশাল। গ্যালারিতে পরিচিত পতাকা, পরিচিত ভাষা এবং নিজ দেশের মানুষের উপস্থিতি খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। আফ্রিকার অনেক সমর্থক জানিয়েছেন, তারা ভিসা পাওয়ার যোগ্য হলেও যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদ, অতিরিক্ত তল্লাশি কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যবেক্ষণের আশঙ্কায় সেখানে যেতে অনাগ্রহী। অনেকে বিকল্প হিসেবে কানাডা বা মেক্সিকোকে বেছে নিচ্ছেন। এর অর্থ হলো, কিছু দল মাঠে খেললেও তাদের প্রকৃত সমর্থকশক্তি গ্যালারিতে অনুপস্থিত থাকতে পারে।
বিশ্বকাপকে ঘিরে আরেকটি বড় প্রশ্ন নিরাপত্তা। যুক্তরাষ্ট্র সরকার এরই মধ্যে শত শত মিলিয়ন ডলার ব্যয় করছে সাইবার নিরাপত্তা, জরুরি সাড়া ব্যবস্থা, ড্রোন প্রতিরোধ ও আইন-শৃঙ্খলা জোরদারের জন্য। কারণ গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মূল্যায়নে দেখা গেছে, অভিবাসন ইস্যু এবং ইরান যুদ্ধকে ঘিরে সৃষ্ট উত্তেজনা চরমপন্থী হামলা কিংবা রাজনৈতিক সহিংসতার ঝুঁকি বাড়িয়েছে।
বিশেষ করে ইরান যুদ্ধ বিশ্বকাপের প্রস্তুতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে ইরান জাতীয় দল প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করতে অনাগ্রহ প্রকাশ করে। পরে ফিফার মধ্যস্থতায় তাদের বেজ ক্যাম্প স্থানান্তর করা হয় মেক্সিকোর সীমান্তবর্তী শহর তিজুয়ানায়। দলটি ম্যাচ খেলতে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করবে, কিন্তু তাদের প্রস্তুতির মূল অংশ হবে মেক্সিকোয়। আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাসে এমন ঘটনা বিরল। এটি দেখিয়ে দেয়, ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা এখন সরাসরি একটি দলের টুর্নামেন্ট প্রস্তুতিকেও প্রভাবিত করছে।
মেক্সিকোও পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়। দেশটির কিছু অঞ্চলে মাদক চক্রের সহিংসতা বিশ্বকাপের প্রস্তুতিকে উদ্বেগের মধ্যে ফেলেছে। একটি বড় অপরাধ চক্রের নেতাকে হত্যার পর গুয়াদালাহারায় সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে; সড়ক ও জনপরিসরে হামলার ঘটনা ঘটে। যদিও আয়োজকরা নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আশ্বাস দিচ্ছেন, তবু আন্তর্জাতিক দর্শকদের মধ্যে উদ্বেগ রয়ে গেছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থা আইসিইর সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়েও বিতর্ক চলছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, বিশ্বকাপ নিরাপত্তায় তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। কিন্তু মানবাধিকারকর্মী ও কিছু দেশের সরকার আশঙ্কা করছে, এতে বিদেশী দর্শকরা আতঙ্কিত হতে পারেন। এমনকি লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফাই স্টেডিয়ামের কয়েক হাজার কর্মী আইসিইকে ভেন্যুর বাইরে রাখার দাবিতে আন্দোলনও শুরু করেছেন। সমালোচকদের মতে, ফুটবল উৎসবের পরিবেশের সঙ্গে কড়া অভিবাসন নজরদারির ছবি সাংঘর্ষিক।
এ বিশ্বকাপে মানবাধিকার প্রশ্নটিও বিশেষভাবে সামনে এসেছে। ২০২৬ সালের আয়োজন ছিল প্রথম বিশ্বকাপ, যেখানে বিডিং প্রক্রিয়াতেই মানবাধিকার মানদণ্ড যুক্ত করা হয়। আয়োজক শহরগুলো শ্রমিক অধিকার, বৈষম্যবিরোধী নীতি এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো অভিযোগ করেছে, বাস্তবে অনেক প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি। অভিবাসন নীতি, বাকস্বাধীনতা, বর্ণবৈষম্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সমালোচনা অব্যাহত রয়েছে।
অবশ্য ফিফার অবস্থান বরাবরের মতোই জটিল। একদিকে তারা মানবাধিকারের পক্ষে কথা বলে, অন্যদিকে আয়োজক দেশকে অস্বস্তিতে ফেলতে চায় না। কারণ বিশ্বকাপ ফিফার অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি। এক কাতার বিশ্বকাপই ফিফার চার বছরের আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি এনে দিয়েছিল। ২০২৬ সালের আসর থেকে আয় ১১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে মানবাধিকার ও ব্যবসায়িক স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা ফিফার জন্য সবসময়ই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
বিশ্বকাপের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘স্পোর্টস ডিপ্লোমেসি’। ট্রাম্প প্রশাসন এরই মধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছে, তারা এ টুর্নামেন্টকে যুক্তরাষ্ট্রের সফট পাওয়ার প্রদর্শনের সুযোগ হিসেবে দেখতে চায়। বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ, আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি উন্নয়ন এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারে বিশ্বকাপকে ব্যবহার করার পরিকল্পনার কথাও প্রকাশ পেয়েছে। ইতিহাস বলছে, বড় ক্রীড়া আয়োজন প্রায়ই রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি নির্মাণের হাতিয়ার হয়েছে। রাশিয়া ২০১৮ সালে বিশ্বকাপ আয়োজন করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের ইতিবাচকভাবে তুলে ধরতে চেয়েছিল। কাতারও ২০২২ সালে একই কৌশল নিয়েছিল। এখন যুক্তরাষ্ট্রও সেই পথেই হাঁটছে।
অন্যদিকে বিশ্বকাপের মঞ্চ আন্তর্জাতিক দ্বৈত মানদণ্ডের বিতর্কও সামনে আনছে। রাশিয়া ইউক্রেনে আক্রমণের পর বিশ্বকাপ থেকে নিষিদ্ধ হয়েছে। কিন্তু গাজা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলকে নিষিদ্ধ করার দাবি গুরুত্ব পায়নি। সমালোচকদের মতে, আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত অনেক সময় নীতির চেয়ে ক্ষমতার ভারসাম্য দ্বারা বেশি প্রভাবিত হয়।
তবু সবকিছুর মাঝেও ফুটবলের নিজস্ব এক শক্তি রয়েছে। এ বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো খেলবে কেপ ভার্দে, কুরাসাও, জর্ডান ও উজবেকিস্তান। নতুন দলগুলোর উপস্থিতি বিশ্বকাপকে আরো বৈচিত্র্যময় করে তুলেছে। অনেক ম্যাচে এমন দুই দল মুখোমুখি হবে, যারা এর আগে কখনো একে অন্যের বিরুদ্ধে খেলেনি। নতুন সংস্কৃতি, নতুন গল্প ও নতুন কূটনৈতিক সম্পর্কের সম্ভাবনাও তৈরি হবে সেই ম্যাচগুলোর মাধ্যমে।
বলা যায়, সীমান্ত রাজনীতি, যুদ্ধ, অভিবাসন, নিরাপত্তা, মানবাধিকার এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থ একসঙ্গে এসে দাঁড়িয়েছে ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে। মাঠে হয়তো দর্শকরা দেখবেন পাস, ড্রিবল আর গোলের সৌন্দর্য; কিন্তু মাঠের বাইরের বাস্তবতায় চলবে আরেকটি অদৃশ্য প্রতিযোগিতা—ক্ষমতা, প্রভাব এবং আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির লড়াই।










