টেনিস ইতিহাসের দুই অন্যতম সেরা খেলোয়াড় সেরেনা উইলিয়ামস ও রজার ফেদেরারের রূপকথার মতো ক্যারিয়ারের সমাপ্তি ঘটেছে ২০২২ সালে। ২৩ বারের গ্র্যান্ড স্লাম চ্যাম্পিয়ন সেরেনা গত বছর ইউএস ওপেন খেলে টেনিসকে বিদায় জানান। সম্প্রতি দ্বিতীয় কন্যা সন্তানের মা হয়েছেন তিনি। অন্যদিকে, গত বছর সেপ্টেম্বরে লন্ডনে লেভার কাপ দিয়ে টেনিসকে বিদায় জানান আরেক কিংবদন্তি খেলোয়াড় ফেদেরার। এ দুই টেনিস জাদুকরকে ছাড়াই এবার শুরু হচ্ছে বছরের শেষ গ্র্যান্ড স্লাম আসর ইউএস ওপেন। আগামীকাল নিউইয়র্কের ফ্ল্যাশিং মিডোতে শুরু হবে ইউএস ওপেন টেনিস।
সেরেনা (৬) ও ফেদেরার (৫) দুজন মোট ১১ বার জিতেছেন ইউএস ওপেন। ফ্ল্যাশিং মিডোতে এ প্রথম খেলবেন না তাদের দুজনের কেউই। এ অভাব পূরণ হওয়া কঠিন।
দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে টেনিস বিশ্বকে শাসন করেছেন সেরেনা ও পুরুষ এককে ‘বিগ থ্রি’ খ্যাত ফেদেরার, রাফায়েল নাদাল ও নোভাক জোকোভিচ। ফেদেরার ৪১ বছর বয়সে অবসর নিয়েছেন। ৩৭ বছর বয়সী রাফায়েল নাদাল হিপে অস্ত্রোপচার করানোয় এ বছর জানুয়ারির পর আর খেলেননি। আগামী বছরের আগে আর ফেরার সম্ভাবনা নেই। ৩৬ বছর বয়সী জোকোভিচ এখনো ফর্মের তুঙ্গে থাকলেও খুব বেশিদিন হয়তো খেলবেন না।
তবে ‘বিগ থ্রি’র জায়গা নেয়ার মতো যোগ্য একজনকে অন্তত পেয়ে গেছে টেনিস। তিনি কার্লোস আলকারাজ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতিক্রিয়াই বলে দেয়, জোকোভিচ ও আলকারাজের সর্বশেষ ম্যাচে চোখ রেখেছেন তারা। ইউএস ওপেন সামনে রেখে সিনসিনাটি মাস্টার্সের ফাইনালে মুখোমুখি হন দুজন। তাদের ম্যাচ মানেই টেনিসের এক ধ্রুপদী লড়াই। সাড়ে ৩ ঘণ্টার লড়াইয়ে দুজনকে যেন কিছুতেই আলাদা করা যাচ্ছিল না। অবশেষে তৃতীয় সেটের টাইব্রেকারে জয় পান অভিজ্ঞ জোকোভিচ।
সিনসিনাটি মাস্টার্সের ফাইনালে আলকারাজকে হারিয়ে এবারের উইম্বলডন ফাইনালে হারের প্রতিশোধও নিয়ে নিলেন ২৩ বারের গ্র্যান্ড স্লাম চ্যাম্পিয়ন।
কিন্তু সহজে জিততে পারেননি জোকার। দ্বিতীয় সেটে ম্যাচ পয়েন্ট বাঁচিয়েছেন তিনি। আর ২০ বছর বয়সী আলকারাজ তৃতীয় সেটে চার চারটি ম্যাচ পয়েন্ট বাঁচিয়েছেন। যদিও শেষ রক্ষা হয়নি এ তরুণ তুর্কির। তিনি শেষ অবধি হেরেছেন ৫-৭, ৭-৬ (৭), ৭-৬ (৪) গেমের ব্যবধানে। সেরেনা-ফেদেরার-উত্তর টেনিসের যে পরিবর্তনকাল চলছে, সেখানে জোকোভিচ-আলকারাজ ম্যাচটি আশা দেখায়। সুপারস্টারদের শূন্যতা পূরণে পুরোপুরি তৈরি আলকারাজ।
ম্যাচ শেষে লড়াকু আলকারাজকে নিয়ে জোকোভিচ বলেন, ‘বালক, তুমি তো কিছুতেই হাল ছাড়ো না। তোমার এ দিকটা আমি ভালোবাসি। কিন্তু তুমি এভাবে কিছু পয়েন্ট না পেলেই আমি খুশি হতাম! সেটা জানো নিশ্চয়ই।’ আলকারাজ উত্তরে বলেছেন, ‘আপনার মতো চ্যাম্পিয়নের কাছ থেকে আমি অনেক কিছু শিখছি।’
সম্প্রতি উইম্বলডন ফাইনালে জোকোভিচকে হারিয়েছেন আলকারাজ। উইম্বলডন ফাইনালে ম্যারাথন লড়াই শেষে জিতেছেন আলকারাজ। এবার সিনসিনাটিতে দেখা গেল দুজনের আরেকটি জমজমাট লড়াই। জোকোভিচের সর্বশেষ তিনটি ইভেন্টের মধ্যে তিনবারই মুখোমুখি হন এ দুজন এবং তিনটিই ছিল ভিন্ন কোর্টে। এবার ফ্ল্যাশিং মিডোতে শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে নামছেন তিনবারের ইউএস ওপেন চ্যাম্পিয়ন জোকোভিচ ও বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আলকারাজ। খুব সম্ভবত এ দুজনের লড়াইটাই নির্ধারণ করে দেবে, কে হবেন এবার চ্যাম্পিয়ন।
এ বছর উইম্বলডন কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা আটলান্টা থেকে উঠে আসা ২৭ বছর বয়সী ক্রিস ইউব্যাংকস বলেন, ‘বহু বছর ধরে খেলাটিতে কর্তৃত্ব করেছেন কিংবদন্তিরা। কিন্তু ফাদার টাইমকে কেউ হারাতে পারে না। প্রত্যেককেই তাদের জীবনের পরবর্তী ধাপে পা রাখতে হয় ও র্যাকেট তুলে রাখতে হয়। সেরেনা, রজার ও রাফায়েলের ক্ষেত্রে এটি ঘটতে দেখাটা আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যের। এখন ক্রান্তিকাল চলছে। নারী ও পুরুষদের টেনিসে এখন নতুনদের সামনে সুযোগ এসেছে নিজেদের মেলে ধরার ও নিজেদের অবস্থান তৈরি করার।’
নারীদের টেনিসে আগামী কয়েকটি বছর কর্তৃত্ব করতে তৈরি ২২ বছর বয়সী ইগা সিয়ানতেক, ২৫ বছর বয়সী আরিনা সাবালেঙ্কা ও ২৪ বছর বয়সী এলেনা রিবাকিনা। ইগা এরই মধ্যে চারটি গ্র্যান্ড স্লাম শিরোপা জিতেছেন। ২০২২ সালে জিতেছেন ইউএস ওপেন। বাকিরা একবার করে গ্র্যান্ড স্লাম জিতেছেন। যদিও এদের কেউই সেরেনার মানে যেতে পারবেন, এমন সম্ভাবনা দেখাতে পারেননি।
ইউএস টেনিস অ্যাসোসিয়েশনের সিইও ও নির্বাহী পরিচালক লিউ শিয়ার বলেছেন, ‘২০২২ সালে আমরা দেখেছি একঝাঁক তরুণ খেলোয়াড়কে উঠে আসতে।’ গত তিন বছরে মাস্টার্স ১০০০ টুর্নামেন্টে জয়ী অন্তত ১০ জন তরুণ খেলোয়াড় রয়েছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম আলকারাজ, ২০ বছর বয়সী হোলগার রুনে ও ২২ বছর বয়সী ইয়ান্নিক সিনার।
দুই বছর আগে ইউএস ওপেনের সেমিফাইনাল খেলা ২৩ বছর বয়সী ফেলিক্স অগার-আলিসিয়ামে বলেন, ‘গ্র্যান্ড স্লাম ও মাস্টার্সে আমরা নতুন মুখ দেখা শুরু করেছি। জোকোভিচ ও নাদাল শেষ ধাপে রয়েছেন। নতুনরা আসছে। টেনিসের এ পরিবর্তনকালে উজ্জ্বল আলকারাজ। জোকোভিচ কিন্তু এখনো মিশন শেষ করেননি।’
সেটি জোকোভিচও বুঝিয়ে দিয়েছেন। সিনসিনাটিতে আলকারাজকে হারানোর পর নিজের জামা ছিঁড়েছেন আর বাঘের মতো গর্জন দিয়ে বলতে চেয়েছেন, তিনি এখনো ফুরিয়ে যাননি। হয়তো ফ্ল্যাশিং মিডোতে দেখা যাবে আরেকটি ফেদেরার-আলকারাজ ধ্রুপদী লড়াই।










