ছেলেদের ফুটবলে টাকার ছড়াছড়ি। তারকা খেলোয়াড়দের সই করাতে প্রয়োজন পড়ে কোটি কোটি ডলার। আবার তাদের বেতনের পেছনেও খরচ অনেক। যেমন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে বছরে ২০ কোটি ডলার পারিশ্রমিক দিয়ে সই করিয়েছে সৌদি আরবের ক্লাব আল-নাসের। ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলোয়ও তারকা খেলোয়াড়রা বছরে আয় করেন কোটি কোটি ডলার। আবার তাদের দলবদলেও হয় দুনিয়া কাঁপানো সব চুক্তি। যেমন ২০১৭ সালে বার্সেলোনা থেকে ২০০ মিলিয়ন পাউন্ডে (২২২ মিলিয়ন ইউরো) নেইমারকে দলভুক্ত করেছিল ফরাসি জায়ান্ট প্যারিস সেন্ট জার্মেই (পিএসজি)। এছাড়া মোনাকো থেকে কিলিয়ান এমবাপ্পেকে কিনতে ১৬৩ মিলিয়ন পাউন্ড (১৮০ মিলিয়ন ইউরো) খরচ করেছিল পিএসজি।
ছেলেদের ফুটবলের দলবদলে ১০০ মিলিয়ন পাউন্ডের গণ্ডি তো এখন হরহামেশাই পেরিয়ে যায়। নারী ফুটবলের ট্রান্সফারেও ফি বাড়ছে হুহু করে। যদিও তা এখনো ছেলেদের ফুটবলের তুলনায় যোজন যোজন পিছিয়ে। তিন বছরে তিনবার বিশ্ব রেকর্ড ভাঙার পরও কেবলই ১ মিলিয়ন ডলারের গণ্ডি পেরোল মেয়েদের ফুটবলের ট্রান্সফার ফি। লিভারপুল থেকে কানাডা জাতীয় দলের খেলোয়াড় অলিভিয়া স্মিথকে ১০ লাখ পাউন্ড বা ১৩ লাখ ৬০ হাজার ডলারে (প্রায় ১৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা) দলভুক্ত করেছে ইংলিশ ক্লাব আর্সেনাল। এর মধ্য দিয়ে মেয়েদের ফুটবলের দলবদলে হয়েছে নতুন বিশ্বরেকর্ড। ২০ বছর বয়সী স্মিথই বিশ্বের প্রথম ‘মিলিয়ন পাউন্ড নারী প্লেয়ার’।
ছেলেদের ফুটবলের মতো মেয়েদের ফুটবলের দলবদলে ফি অতটা আকাশচুম্বী না হলেও প্রতি বছর বাড়ছে। এই যেমন ২০২২ সালে নারী ফুটবলে বিশ্ব রেকর্ড ট্রান্সফার ফি (৪ লাখ ৭০ হাজার ডলার) দিয়ে ইংলিশ তারকা কিরা ওয়ালশকে দলে টেনেছিল স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনা। তিন বছর যেতে না যেতেই ৭ নম্বরে নেমে গেছে ওয়ালশের সেই রেকর্ড। ২০২৫ সালেই দুবার ভাঙল রেকর্ড। সর্বশেষটি হলো গত বৃহস্পতিবার স্মিথের দলবদলে।
চলতি বছর জানুয়ারিতে রেকর্ড ৯ লাখ পাউন্ডে (১১ লাখ ডলার) নাওমি গিরমাকে কিনেছিল চেলসি। আর এ অংকই আমেরিকান ডিফেন্ডারকে বানিয়েছে নারী ফুটবলের ইতিহাসের প্রথম ‘মিলিয়ন ডলার খেলোয়াড়’। তিনি বিশ্বের অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার। চেলসিতে যোগ দেয়ার আগে গিরমা খেলতেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্লাব সান ডিয়েগো ওয়েভে। ২০২৪ অলিম্পিকে যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যাম্পিয়ন করতে বড় ভূমিকাই রেখেছেন গিরমা। এরপর পাড়ি জমান চেলসিতে। যদিও ছয় মাসও টিকল না তার বিশ্ব রেকর্ড। অলিভিয়া স্মিথকে ইতিহাসের প্রথম ‘মিলিয়ন পাউন্ড প্লেয়ার’ হিসেবে দলে টেনে নতুন রেকর্ড গড়েছে লন্ডন জায়ান্ট আর্সেনাল। ২০২৫ সালের শুরুতে এফএ কাপের কোয়ার্টার ফাইনালে স্মিথের কাছেই হেরেছিল গানাররা। সেই ম্যাচের জাদুকরী পারফরম্যান্সে মুগ্ধ হয়েই ১৩ লাখ ৬০ হাজার ডলারে তাকে কিনেছে আর্সেনাল।
২০১৯ সালে মাত্র ১৫ বছর ৯৪ দিন বয়সে কানাডা জাতীয় দলে অভিষেকের পরই আলোচনায় আসেন অলিভিয়া স্মিথ। নর্থ টরন্টো নিট্রোস থেকে পর্তুগালের স্পোর্টিং লিসবন ক্লাবে নাম লেখানোর পর ২০২৩-২৪ মৌসুমে প্রথম পেশাদার লিগে খেলে তিনি ১৮ ম্যাচে ১৩ গোল করেন। ২০২৪ সালের গ্রীষ্মে ক্লাব রেকর্ড ২ লাখ পাউন্ড ফি দিয়ে তাকে সই করায় ইংলিশ ক্লাব লিভারপুল। উইমেনস সুপার লিগে ২০ ম্যাচে সাত গোল করেন তিনি। এবার তাকে লুফে নিল ইউরোপসেরা দল আর্সেনাল।
উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপাজয়ী আর্সেনাল তাদের স্কোয়াডের শক্তি বাড়াল স্মিথকে নিয়ে। এর আগে গত মে মাসে চোলে কেলিকে ম্যানসিটির কাছ থেকে ও টেইলর হাইন্ডসকে লিভারপুল থেকে দলভুক্ত করে তারা।
অলিভিয়া স্মিথ ও নাওমি গিরমার পর নারী ফুটবলের আলোচিত ৮ দলবদল:
তারসিয়ানে (হিউস্টন ড্যাস থেকে অলিম্পিক লিওঁ): এনডব্লিউএসএলে মাত্র এক মৌসুম খেলেই ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দামি নারী ফুটবলার হয়ে যান তারসিয়ানে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাকে দলে টানে ফরাসি জায়ান্ট অলিম্পিক লিওঁ। ফরাসি সংবাদমাধ্যম লে’কিপের তথ্যমতে, ২১ বছর বয়সী এ ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্ডারের জন্য লিওঁ খরচ করেছে প্রায় ৯ লাখ ৬০ হাজার ডলার। ফরাসি নারী লিগের ইতিহাসে এটিই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় ট্রান্সফার। আর কয়েক সপ্তাহ আগেই যদি চুক্তি সম্পন্ন হতো, তবে এটিই হতো বিশ্ব রেকর্ড।
র্যাচেল কুন্দানানজি (মাদ্রিদ সিএফএফ থেকে বে এফসি): জাম্বিয়ান খেলোয়াড় র্যাচেল কুন্দানানজিকে কিনে দলবদলে নতুন বিশ্ব রেকর্ড গড়েছিল বে এফসি। এনডব্লিউএসএলের নতুন দল বে এফসি মাদ্রিদ সিএফএফ থেকে তাকে কিনতে খরচ করে ৮ লাখ ৬২ হাজার ডলার। এর আগে স্প্যানিশ ক্লাবটির জার্সিতে ৪৩ ম্যাচে ৩৩ গোল করেছিলেন কুন্দানানজি। তবে বে এফসিতে প্রথম মৌসুমে বড় প্রভাব রাখতে পারেননি এ ফরওয়ার্ড। ২১ ম্যাচে করেছেন পাঁচ গোল।
বারবারা বান্দা (সাংহাই শেয়লি থেকে অরল্যান্ডো প্রাইড): জাম্বিয়ার হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে ঝলমলে পারফরম্যান্স প্রদর্শন করা বারবারা বান্দা ক্লাব ফুটবলে খেলতেন চীনা উইমেনস সুপার লিগের দল সাংহাই শেংলিতে। তিনি আলোতে আসেন ২০২৪ সালে। যুক্তরাষ্ট্রের অরল্যান্ডো প্রাইড তাকে ৭ লাখ ৪০ হাজার ডলার খরচ করে দলে টানে।
কিরা ওয়ালশ (ম্যানচেস্টার সিটি থেকে বার্সেলোনা ও বার্সেলোনা থেকে চেলসি): ২০২২ সালের গ্রীষ্মে ম্যানচেস্টার সিটি ছেড়ে বার্সেলোনায় যোগ দেন কিরা ওয়ালশ। ৪ লাখ ৭০ হাজার ডলার ট্রান্সফার ফিতে বার্সায় যোগ দেয়ার পর তিনিই ছিলেন বিশ্বের সবচেয়ে দামি নারী ফুটবলার। বার্সেলোনায় দুটি চ্যাম্পিয়নস লিগ, দুটি লিগ, একটি কোপা দে লা রেইনা আর তিনটি সুপার কাপ জিতেছেন তিনি।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে স্পেন থেকে ইংল্যান্ডে ফিরে আসেন কিরা। দলবদলের শেষ দিনে তাকে দলে টানে চেলসি। প্রাথমিক ফি ধরা হয়েছিল ৫ লাখ ৭২ হাজার ডলার, তবে বিবিসি স্পোর্টের খবর, নানা শর্ত আর বোনাস মিলিয়ে এ অংক শেষ পর্যন্ত গিয়ে ঠেকতে পারে ১০ লাখ ৭ হাজার ৬০০ ডলারে।
প্রিসিলা (ইন্টারনাসিওনাল থেকে ক্লাব আমেরিকা): ব্রাজিলের ইন্টারনাসিওনাল থেকে ২০২৪ সালে মেক্সিকোর ক্লাব আমেরিকায় যোগ দেন প্রিসিলা। ট্রান্সফার ফি ছিল ৪ লাখ ৯৭ হাজার ডলার।
মারিয়া রামিরেস (লেভান্তে থেকে চেলসি): ২০২৪ সালের শুরুর দিকে অস্ট্রেলীয় তারকা স্ট্রাইকার স্যাম কার চোটে পড়েন। কারের শূন্যতা পূরণে চেলসি ৪ লাখ ৮৬ হাজার ডলার খরচ করে স্পেনের লেভান্তে থেকে দলে টানে মারিয়া রামিরেসকে।
কিকা নাজারেত (বেনফিকা থেকে বার্সেলোনা): ২০২৪ সালের গ্রীষ্মে পর্তুগিজ তারকা কিকা নাজারেত পাড়ি জমান কাতালুনিয়ায়। ১৬ বছর বয়সে বেনফিকার হয়ে প্রথম ম্যাচ খেলা নাজারেত ২১ বছর বয়সে যোগ দেন বার্সেলোনায়। কাতালানরা প্রায় ৪ লাখ ৩২ হাজার ডলার খরচ করে তাকে দলভুক্ত করে।










