ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক মিলিয়ে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান তাড়ার রেকর্ড গড়ে বিপিএলে নিজেদের টানা দ্বিতীয় শিরোপা জিতে নিয়েছে ফরচুন বরিশাল। এ আসর দেখেছে অসংখ্য রেকর্ড। এছাড়া সর্বোচ্চ রান করেছেন এক বাংলাদেশী, সবচেয়ে বেশি উইকেট নেয়ার কীর্তিও এক বাংলাদেশীর। সব মিলিয়ে ১৯ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান ও দুবাইয়ে শুরু হতে যাওয়া আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফির যথেষ্ট প্রস্তুতি কি নিতে পারল বাংলাদেশ দল?

এবারের আসরে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ছিল নানা বিতর্ক। কখনো ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকরা সংবাদ শিরোনাম হয়েছে খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক পরিশোধ না করে কিংবা তাদের চেক বাউন্স করায়, কখনো বা ফিক্সিং নিয়ে গুঞ্জন চলেছে। এরই মধ্যে ফাইনালে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেমন হলো, তেমনটি গ্যালারিতে ছিল না তিল ধারণের জায়গা। তাহলে কি একাদশ বিপিএল সফল, নাকি বিপিএলের ইতিহাসে এবারের আসরটি কলঙ্কিত এক অধ্যায় হয়ে থাকবে?

এবার আশা জাগানিয়া হলো ব্যাটিংয়ে স্থানীয় ক্রিকেটারদের দাপট। রান চার্টে শীর্ষ পাঁচজনের মধ্যে চারজনই বাংলাদেশী। খুলনা টাইগার্সের ওপেনার নাঈম শেখ সর্বোচ্চ ৫১১ রান নিয়ে শেষ করেছেন এবারের আসর। তার দল প্লে-অফ থেকে বিদায় নেয়। তিনি এ রান করেছেন ১৪ ম্যাচে ৪২.৫৮ গড়ে। এর পরই ঢাকা ক্যাপিটালের তানজিদ হাসান তামিম (১২ ম্যাচে ৪৮৫ রান)। ১৪ ম্যাচে ৩০.৭৮ গড়ে ৪৩১ রান করে তিনে চট্টগ্রাম কিংসের ইংলিশ ব্যাটার গ্রাহাম ক্লার্ক। এর পরই বরিশালের অধিনায়ক তামিম ইকবাল ও দুর্বার রাজশাহীর এনামুল হক বিজয়। তামিম ১৪ ম্যাচে ৪১৩ রান ও বিজয় ১২ ম্যাচে ৩৯২ রান করেছেন।

শীর্ষ পাঁচের বাইরে সিলেটের জাকির হাসান ৩৮৯ রান, ঢাকার লিটন দাস ৩৬৮ রান, খুলনার মেহেদী হাসান মিরাজ ৩৫৫ রান, চট্টগ্রামের শামীম হোসেন ৩৫২ রান, একই দলের পারভেজ হোসেন ইমন ৩৩৮ রান, রাজশাহীর ইয়াসির আলী ৩৩৬ রান, খুলনার মাহিদুল ইসলাম অঙ্কন ৩১৬ রান, বরিশালের তাওহীদ হৃদয় ৩১২ রান ও রংপুরের সাইফ হাসান ৩০৬ রান করেছেন।

ব্যাটিংয়ের মতো বোলিংয়েও শীর্ষস্থান বাংলাদেশের দখলে। ১২ ম্যাচে ১২.০৪ গড়ে ২৫ উইকেট নিয়ে শেষ পর্যন্ত শীর্ষস্থানে রয়েছেন দুর্বার রাজশাহীর অধিনায়ক তাসকিন আহমেদ। যদিও শীর্ষ পাঁচে পাকিস্তানিদের আধিপত্য। দুই, তিন ও পাঁচে তিন পাকিস্তানি। চারে আছেন বাংলাদেশের খালেদ আহমেদ। বরিশালের ফাহিম আশরাফ ১১ ম্যাচে ২০ উইকেট নিয়ে দুইয়ে, রংপুর রাইডার্সের আকিফ জাভেদ ২০ উইকেট নিয়ে তিনে, চট্টগ্রামের খালেদ আহমেদ ২০ উইকেট নিয়ে চারে ও রংপুরের খুশদিল শাহ ১৭ উইকেট নিয়ে পাঁচে অবস্থান করছেন।

এছাড়া বাংলাদেশীদের মধ্যে খুলনার আবু হায়দার ১৭ উইকেট, চট্টগ্রামের শরিফুল ইসলাম ১৭ উইকেট, সিলেটের তানজিম হাসান সাকিব ১৬ উইকেট, চট্টগ্রামের আলিস আল ইসলাম ১৫ উইকেট, খুলনার হাসান মাহমুদ ১৪ উইকেট, একই দলের নাসুম আহমেদ ১৩ উইকেট, ঢাকার মুস্তাফিজুর রহমান ১৩ উইকেট, খুলনার অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ ১৩ উইকেট নিয়েছেন।

চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে বাংলাদেশ দলকে নেতৃত্ব দেবেন নাজমুল হোসেন শান্ত। সদ্য সমাপ্ত বিপিএলে তিন ভীষণ ফ্লপ। ৫ ম্যাচে করেছেন মাত্র ৫৬ রান, সর্বোচ্চ ৪১। ঢাকা ও সিলেটে ৪ ম্যাচ খেলার পর ১৬ জানুয়ারি চট্টগ্রামে পঞ্চম ম্যাচে করেন ২ রান। এরপর তাকে আর খেলায়নি বরিশাল। ঢাকায় শেষ পর্বে ফাইনাল পর্যন্ত সব ম্যাচেই তিনি ছিলেন দর্শকের ভূমিকায়।

গায়ানায় গ্লোবাল সুপার লিগে রংপুর রাইডার্সের হয়ে ভালো খেলা সৌম্য সরকার চোট কাটিয়ে ওঠার পর ২৬ জানুয়ারি রাজশাহীর বিপক্ষে প্রথম ম্যাচ খেলেন। সর্বশেষ ৩ ফেব্রুয়ারি খুলনার সঙ্গে এলিমিনেট ম্যাচে শূন্য রানের সময় রানআউট হয়ে যান। সব মিলিয়ে ৪ ম্যাচ খেলে করেছেন ১০৫ রান। সর্বোচ্চ ৭৪ রানের ইনিংস এসেছে তার ব্যাট থেকে।

চ্যাম্পিয়নস ট্রফির স্কোয়াডে ব্যাটিং ইউনিটের মধ্যে তানজিদ হাসান তামিম, পারভেজ হোসেন ইমন, তাওহীদ হৃদয় ভালো করেছেন। ১ সেঞ্চুরি ও ৪ ফিফটিতে ৪৮৫ রান করে তালিকার দুইয়ে ঢাকার তানজিদ। চট্টগ্রামকে ফাইনালে তোলার অন্যতম নায়ক পারভেজ হোসেন ইমন। ১৩ ম্যাচে ৩৩৮ রান করা ইমন নজর কেড়েছেন সাহসী ব্যাটিং দিয়ে। ফাইনালে ৪৯ বলে ৭৮ ও ১ ফেব্রুয়ারি রংপুরের বিপক্ষে ৪১ বলে ৭৫ রানের দুটি ইনিংস দিয়ে তিনি জাতীয় দলের নির্বাচকদের আস্থার প্রতিদান দিয়েছেন দারুণভাবে।

মিডল অর্ডারে আস্থার প্রতীক তাওহীদ হৃদয় ১৪ ম্যাচে করেছেন ৩১২ রান। বিপিএলে শেষ দিকে এসে নিজেকে ফিরে পান তিনি। প্রথম কোয়ালিফায়ার ম্যাচে ৫৬ বলে ৮২ রানের ইনিংস খেলে তিনি ফাইনালে তোলেন বরিশালকে। ফাইনালে খেলেন ২৮ বলে ৩২ রানের ইনিংস। মুশফিক অবশ্য হতাশ করেছেন। বাংলাদেশের মিডল অর্ডারের দীর্ঘদিনের ব্যাটিং কাণ্ডারি ১৪ ম্যাচে করেছেন ১৮৪ রান। টানা দ্বিতীয়বারের মতো শিরোপা জিতলেও ব্যাটার হিসেবে এই আসরটি তিনি ভুলে যেতে চাইবেন।

১৪ ম্যাচে ২০৬ রান নিয়ে শেষবারের মতো বাংলাদেশের হয়ে আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে যাচ্ছেন মাহমুদউল্লাহ। ওয়ানডেতে নিজের সর্বশেষ চার ইনিংসেই ফিফটি করা মাহমুদউল্লাহর সামর্থ্য নিয়ে কারো সংশয় নেই। যদিও বিপিএলটা রাঙাতে পারেননি, যার নেতিবাচক প্রভাব কি পড়বে চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে? উইকেটকিপার ও টেল-এন্ডে ব্যাট করা জাকের আলী অনিক সিলেট স্ট্রাইকার্সের হয়ে ১২ ম্যাচে করেছেন ২৪১ রান। কোনো ফিফটি পাননি, সর্বোচ্চ স্কোর ৪৭ রানের।

অলরাউন্ডারদের মধ্যে মেহেদী হাসান মিরাজ তারা হয়ে জ্বলছেন। ৩৫৫ রান করেছেন, সঙ্গে নিয়েছেন ১৩ উইকেট। একাদশ বিপিএলের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার জিতে তিনি যাচ্ছেন চ্যাম্পিয়নস ট্রফি খেলতে। যদিও খুলনা টাইগার্সের অধিনায়ক হিসেবে আক্ষেপ থাকছে তার। চট্টগ্রামের বিপক্ষে দ্বিতীয় কোয়ালিফায়ার ম্যাচে শেষ বলের বাউন্ডারিতে হেরেছে তার দল।

তরুণ অলরাউন্ডার রিশাদ হোসেন ফাইনালে ৬ বলে ১৮ রানের বিস্ফোরক ইনিংস খেলে বরিশালের শিরোপা জয়ে মূল্যবান অবদান রাখলেও গোটা টুর্নামেন্ট তার ভালো কাটেনি। ১১ ম্যাচ খেলে করেছেন মাত্র ৬৮ রান! বল হাতেও গড়পড়তা, ১১ ম্যাচে ৭ উইকেট। বামহাতি অর্থোডক্স স্পিনার নাসুম আহমেদ বল হাতে নিয়েছেন ১৩ উইকেট। ব্যাট হাতে করেছেন ১২ ম্যাচে ২৮ রান।

বিপিএলে কেউ কেউ রান না পেলেও বাংলাদেশের ব্যাটিং ইউনিট চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে ভালো করবে বলে মনে করেন সাবেক অধিনায়ক হাবিবুল বাশার। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি ব্যাটিং ইউনিট ভালো করবে।’ অধিনায়ক নাজমুল হোসেনকে নিয়ে উৎকণ্ঠার জায়গা আছে কিনা, এমন প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি না, কারণ এটা টি-টোয়েন্টি ফরম্যাট। ওয়ানডেতে সে ভালো ফর্মেই ছিল।’

চ্যাম্পিয়নস ট্রফিগামী বাংলাদেশ দলের পেস বোলিং ব্রিগেডের সবাই বিপিএলে ছন্দে ছিলেন। তাসকিন আহমেদ সর্বোচ্চ ২৫ উইকেট নেয়ার কৃতিত্ব দেখান। এছাড়া সিলেট স্ট্রাইকার্সের তানজিম হাসান সাকিব ১৬ উইকেট, ঢাকা ক্যাপিটালের মুস্তাফিজুর রহমান ১৩ উইকেট ও রংপুর রাইডার্সের নাহিদ রানা ১০ উইকেট নিয়েছেন।

বিপিএলের চেয়ে ভিন্ন ফরম্যাট হলেও চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে বাংলাদেশের পেসারদের নিয়ে আশাবাদী বাংলাদেশ জাতীয় দলের সাবেক কৃতী পেস বোলার হাসিবুল হোসেন শান্ত। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘তাসকিন তো আমাদের সেরা বোলার বলে আমি মনে করি। এছাড়া মুস্তাফিজ, তানজিম আর নাহিদও ভালো করবে বলে আমি মনে করি। তারা যদি ম্যাচের সিচুয়েশন অনুযায়ী বোলিং করতে পারে তাহলে ভালো কিছু আশা করাই যায়।’

এবারের বিপিএলে অসংখ্য রেকর্ডের ভিড়ে আলাদাভাবে উজ্জ্বল হয়ে থাকছে তাসকিনের ৭ উইকেট শিকারের কীর্তি। স্বীকৃত টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট ইতিহাস মাত্র তৃতীয় বোলার হিসেবে ৭ উইকেট নেয়ার কীর্তি গড়েন তিনি। বিপিএলে গত ২ জানুয়ারি তিনি ঢাকা ক্যাপিটালসের ৭ ব্যাটারকে সাজঘরে পাঠান। ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি মিলিয়ে এর আগে ৭ উইকেট শিকারের কীর্তি ছিল মাত্র দুজনের। ২০২৩ সালে এশিয়ান গেমস ক্রিকেটে চীনের বিপক্ষে ৮ রানে ৭ উইকেট শিকার করে বিশ্বরেকর্ড গড়েন মালয়েশিয়ার সিয়াজরুল ইদরুস। তিনি ভাঙেন ডাচ খেলোয়াড় কলিন অ্যাকারম্যানের রেকর্ড। ২০১৯ সালে ইংল্যান্ডের ভাইটালিটি ব্লাস্ট ক্রিকেটে বার্মিংহাম বিয়ার্সের বিপক্ষে ১৮ রানে ৭ উইকেট নেন লেস্টারের এই খেলোয়াড়। এই দুজনের পরই নিজের নামটি লিখিয়ে নিলেন তাসকিন।

এটা বিপিএলেরও সেরা বোলিংয়ের রেকর্ড। ২০২০ সালে রাজশাহী রয়্যালসের বিপক্ষে ১৭ রানে ৬ উইকেট শিকার করেছিলেন খুলনা টাইগার্সের পাকিস্তানি পেসার মোহাম্মদ আমির। তার রেকর্ড ভেঙে একাদশ বিপিএলে বোলিংয়ের নতুন রেকর্ড গড়লেন তাসকিন। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে ১০ রানে ৬ উইকেট নেয়ার কৃতিত্ব আছে মুস্তাফিজুর রহমানের। এছাড়া ক্যারিবিয়ান লিগে ৬ রানে ৬ উইকেট শিকারের কীর্তি আছে সাকিব আল হাসানের। এবারের বিপিএলে ৭ উইকেট নিয়ে এ দুজনকেই টপকে গেলেন তাসকিন।

বিপিএলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহের রেকর্ড হয়েছে এবার। ১২ জানুয়ারি সিলেটে রাজশাহীর বিপক্ষে ১ উইকেটে ২৫৪ রান তোলে ঢাকা। এর আগে সর্বোচ্চ সংগ্রহ ছিল রংপুরের ৪ উইকেটে ২৩৯ রান। ২০১৯ সালের আসরে চট্টগ্রামের বিপক্ষে এ রান তুলেছিল তারা। ২০২৪ সালে চট্টগ্রামের বিপক্ষে ২৩৯ রান তুলেছিল কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ানসও।

চ্যাম্পিয়নস ট্রফির বাংলাদেশ স্কোয়াড

নাজমুল হোসেন শান্ত (অধিনায়ক), সৌম্য সরকার, তানজিদ হাসান

তামিম, পারভেজ হোসেন ইমন, তাওহীদ হৃদয়, মুশফিকুর রহিম, মাহমুদউল্লাহ, মেহেদী হাসান মিরাজ, জাকের আলী, রিশাদ হোসেন,

নাসুম আহমেদ, তাসকিন আহমেদ, তানজিম হাসান সাকিব, মুস্তাফিজুর রহমান, নাহিদ রানা।