প্যারিস অলিম্পিকে জন্ম হয়েছে অনেক রূপকথার। অনেক সুপারস্টারের আবির্ভাব ঘটেছে এ অলিম্পিক আসরে। তরুণদের ভিড়ে নিজেদের অপ্রতিরোধ্য যাত্রা অব্যাহত রেখেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে দুই সফলতম নারী অলিম্পিয়ান কেটি লেডেকি ও সিমোন বাইলস। জলকন্যা লেডেকি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে অলিম্পিকে সর্বোচ্চ পদকজয়ী নারী অ্যাথলিট, আর বাইলস দেশের হয়ে সফলতম নারী জিমন্যাস্ট। বৃহস্পতিবার রাতে দুজনই গড়েছেন নতুন ইতিহাস। কাকতালীয় হলেও দুজনেরই বয়স ২৭ বছর এবং দুজনই অলিম্পিক ও বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন মিলিয়ে ৩৯টি করে পদক জিতেছেন!
সাঁতারের পুলে লেডেকির নামের পাশে রৌপ্য বড়ই বেমানান। তবু এ পদকেই তিনি ইতিহাস গড়েছেন। বৃহস্পতিবার রাতে পুলকে আলোকিত করে স্বর্ণ জিতেছেন কানাডার কিশোরী সামার ম্যাকিনটশ ও যুক্তরাষ্ট্রের কেট ডগলাস। এ রাতেই লেডেকি সতীর্থদের নিয়ে জিতলেন ২০০ মিটার ফ্রিস্টাইল রিলের রৌপ্য। অস্ট্রেলিয়ার কাছে হেরেছে তার দল। অস্ট্রেলিয়া দলে ছিলেন আরিয়ার্নে টিটমাস ও মলি ও’ক্যালাহান, যারা ব্যক্তিগত ইভেন্টে স্বর্ণ জিতেছেন আগেই। এবার রিলেতেও দেশকে স্বর্ণ এনে দেন।
লেডেকি রৌপ্য দিয়েই গড়েছেন ইতিহাস। তিনি এখন যুক্তরাষ্ট্রের সফলতম নারী অলিম্পিয়ান। তার চেয়ে বেশি পদক আর কোনো আমেরিকানের নেই। ডারা টোরেস, নাতালি কফলিন ও জেনি থম্পসন প্রত্যেকেই ১২টি করে অলিম্পিক পদক জিতেছেন। বৃহস্পতিবার রিলেতে রৌপ্য জিতে তাদের সবাইকে টপকে গেলেন লেডেকি। সাঁতারের কিংবদন্তি মাইকেল ফেলপস জিতেছেন ২৮টি স্বর্ণ। এছাড়া আর তিনজন পুরুষ লেডেকির চেয়ে বেশি পদক জিতেছেন।
এখানেই শেষ নয়। গতকাল রাতে মেয়েদের ৮০০ মিটার ফ্রিস্টাইলের ফাইনালে নামার কথা তার। এ ইভেন্টে পদক জিতলে রেকর্ডটা আরেকটু সংহত করতে পেরেছেন তিনি। স্বর্ণ জিতে থাকলে তিনি ছুঁয়ে ফেলেছেন সাবেক সোভিয়েত জিমন্যাস্ট লারিসা লাতিনিনার ৯ স্বর্ণপদকের রেকর্ড।
২০২৮ সালের লস অ্যাঞ্জেলেস গেমসেও খেলবেন বলে পরিকল্পনা রয়েছে লেডেকির। যদি সেটি পারেন, তবে এ রেকর্ডটি অনেক দূর নিয়ে যেতে সমর্থ হবেন।
এদিকে, টোকিওর পর প্যারিসেও পদকের হাসি হাসছেন সিমোন বাইলস। বৃহস্পতিবার অল-অ্যারাউন্ড জিমন্যাস্টিকসের স্বর্ণ জিতেছেন তিনি। এটি চলতি আসরে তার দ্বিতীয় ও সব মিলিয়ে ষষ্ঠ অলিম্পিক শিরোপা। এর মধ্য দিয়ে তিনি অমরত্বের পথে হাঁটছেন।
সবার চোখ ছিল জিমন্যাস্টিকসের ভল্টে। বাইলস ছিলেন আলোতে। বাইলসের খেলা মানেই গ্যালারিতে থাকে হলিউড তারকার মেলা। এদিনও ব্যতিক্রম হয়নি। তাদের নিরাশ করেননি তিনি। জিতে নেন টানা দ্বিতীয় স্বর্ণপদক। এ রাতে ব্রাজিলের রেবেকা আনদ্রাদে রৌপ্য ও বর্তমান চ্যাম্পিয়ন যুক্তরাষ্ট্রের সুনিসা লি ব্রোঞ্জ জিতেছেন।
রিও অলিম্পিকে এ ইভেন্টে স্বর্ণ জয় করা বাইলস টোকিওতেও ছিলেন ফেভারিট। যদিও মানসিক স্বাস্থ্যজনিত কারণে তিনি সরে দাঁড়ান। প্যারিসে ফিরেই টানা দুটি ইভেন্টে স্বর্ণ জিতলেন তিনি।
তবে এদিন সহজে জেতা হয়নি। ব্রাজিলিয়ান রেবেকা কঠিন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন তাকে। জয় শেষে সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে বাইলস বলেন, ‘আমি রেবেকার সঙ্গে আর লড়তে চাই না। আমি ক্লান্ত। সে খুবই কাছাকাছি ছিল। আমি কখনই এমন কাছাকাছি কাউকে পাইনি।’
এককের আগে টিম ইভেন্টেও স্বর্ণপদক গলায় পরেছেন বাইলস। মেয়েদের অল-অ্যারাউন্ড জিমন্যাস্টিকসে সর্বোচ্চ (ছয়টি) স্বর্ণপদক জয়ের গৌরব এখন তার। সর্বোচ্চ বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ পদক (৩০) জয়ের রেকর্ডও তার দখলে। দুটি অলিম্পিকে স্বর্ণজয়ী তৃতীয় নারী তিনি। তার আগে এ কীর্তি আছে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের কিংবদন্তি লারিসা লাতিনিনা (১৯৫৬, ১৯৬০) ও চেকোস্লোভাকিয়ার ভেরা কাসলাভস্কার (১৯৬৪ ও ১৯৬৮)।
৭২ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ হিসেবে এ ইভেন্টে স্বর্ণ জিতলেন বাইলস। এর আগে সর্বশেষ ১২ জন স্বর্ণজয়ী ছিলেন টিনএজ জিমন্যাস্ট। এমনকি ১৯৭২ সালে সর্বশেষ তিনি নন-টিনএজ ছিলেন সেই লুদমিলা তুরিশেভাও সদ্য বিশে পা রেখেছিলেন। আর বাইলস জিতলেন ২৭ বছর বয়সে।
সেই সঙ্গে জিমন্যাস্টিকসের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি পদক জয়ের রেকর্ডটাও আগেই নিজের করে নিয়েছেন বাইলস। এখন সেটিকে নিয়মিতই আরো সংহত করে নিচ্ছেন তিনি। অলিম্পিক ও বিশ্ব শিরোপা মিলিয়ে তার মোট পদক ছিল ৩৭টি, প্যারিসে তা নিয়ে গেলেন ৩৯-এ। প্যারিসে আরো পদক জেতার সুযোগ রয়েছে তার।
নয়টি অলিম্পিক পদক জিতে ইতিহাসের পঞ্চম সফলতম নারী অলিম্পিক জিমন্যাস্ট বাইলস, যুক্তরাষ্ট্রের তো বটেই। তার ওপরে রয়েছেন লাতিনিনা (১৮), ভেরা কাসলাভস্কা (১১), হাঙ্গেরির অ্যাগনেস কেলেতি (১০) ও সোভিয়েত ইউনিয়নের পলিনা আস্তাখোভা (১০)। স্বদেশী শ্যানন মিলারের সমান সাতটি পদক জিতে প্যারিসে আসা বাইলস চলতি আসরে জিতলেন ২টি পদক। এ আসরেই তার তালিকার দুইয়ে ওঠা সম্ভব।










