বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে এখন আলোচনা-গুঞ্জন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব চেলসি এফসির মালিকানা বদল নিয়ে। চেলসি কিনতে আগ্রহীদের জন্য দরপত্র জমাদানের শেষ সময় ছিল শুক্রবার রাত ৩টা। যদিও জানা গেছে, কিছু আগ্রহী ক্রেতার আবেদনের ভিত্তিতে সময়টা শনি ও আজ রোববার পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।

আগ্রহী প্রার্থী অন্তত ২০টি বলে গুঞ্জন থাকলেও নিশ্চিত হওয়া গেছে ১০-১৫টির ব্যাপারে। চেলসি ক্লাবটি বিক্রির বিষয়টি পরিচালনা করছে আমেরিকান ইনভেস্টমেন্ট ফার্ম রাইনে গ্রুপ, যারা আগামী সপ্তাহে ক্রেতাদের সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রকাশ করবে। সর্বশেষ যারা বিজয়ী হবেন তাদের প্রয়োজন হবে ব্রিটেন সরকারের অনুমোদন। বিশেষ করে তাদের তহবিলের উৎস কী এবং পরবর্তী সময়ে এ অর্থ কোথায় যাবে, তা খতিয়ে দেখা হবে।

চেলসির জন্য দাম চাওয়া হয়েছে ৩০০ কোটি পাউন্ড, যদিও একে ‘খুব বেশি’ বলে অভিহিত করেছেন কেউ কেউ। রোমান আব্রামোভিচ ক্লাবকে ১৫০ কোটি পাউন্ড লোনও দিয়েছেন। যদিও বলেছেন, এ লোনের অর্থ ফেরত দেয়া লাগবে না। আর চেলসি বিক্রিতে যে লাভ হবে তার পুরোই তিনি ইউক্রেন যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে দেবেন।

আব্রামোভিচ চেলসি কেনার পর থেকে ক্লাবটি প্রতি সপ্তাহে অন্তত ৯ লাখ পাউন্ড হারিয়েছে। এ মুহূর্তে মাসে বেতনের পেছনেই খরচ অন্তত ২৮ মিলিয়ন পাউন্ড। ২০০৩ সালে মাত্র ১৮ কোটি পাউন্ডে চেলসি কিনেছিলেন আব্রামোভিচ। তার সময়ে ব্লুজরা ২১টি শিরোপা জিতেছে, যার মধ্যে দুটি উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ। ক্লাবটি বর্তমান ইউরোপসেরা। চলতি আসরেও উঠেছে কোয়ার্টার ফাইনালে।  

রুশ ধনকুবের আব্রামোভিচের চেলসি বিক্রির প্রথম পদক্ষেপ বাধাগ্রস্ত হয়েছিল ব্রিটিশ সরকার তার সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার ফলে। যদিও সরকার নমনীয় হয়ে তাকে চেলসি বিক্রির সুযোগ দেয়া হয়েছে।

চেলসি কেনার দৌড়ে সম্ভাব্য প্রার্থী কারা:

১. লিভারপুলের সাবেক চেয়ারম্যান স্যার মার্টিন ব্রাউটন ও সেবাস্তিয়ান কো’র সমন্বয়ে গড়া কনসোর্টিয়াম।

২. একাধিক বিনিয়োগকারীকে নিয়ে কনসোর্টিয়াম তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের রিকেটস পরিবার, যারা মেজর লিগ বেজবল দল শিকাগো বুলসের মালিক।

৩. সুইস বিলিয়নেয়ার হ্যানসোর্গ উইস ও আমেরিকান ব্যবসায়ী টড বোহলি একটি কনসোর্টিয়াম তৈরি করে চেলসি কেনার চেষ্টা করছেন। তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন আমেরিকান পিআর নির্বাহী বারবারা শ্যারোন, ব্রিটিশ ব্যবসায়ী জোনাথন গোল্ডস্টেইন ও ব্রিটিশ সাংবাদিক ড্যানিয়েল ফিঙ্কেলস্টেইন।

৪. লন্ডনভিত্তিক ইনভেস্টমেন্ট ফার্ম এইথেল পার্টনার্স, যার প্রধান হিসেবে রয়েছেন পর্তুগিজ উদ্যোক্তা রিকার্ডো সিলভা।

৫. ব্রিটিশ ব্যবসায়ী কিন ক্যান্ডির সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন চেলসির সাবেক স্ট্রাইকার জিয়ানলুকা ভিয়াল্লি।

৬. তুরস্কের বিলিয়নেয়ার মুহসিন বাইরাক নিজেকে একজন শক্ত প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছেন।

৭. ক্রিস্টাল প্যালেসের একাংশের মালিক আমেরিকান বিলিয়নেয়ার ও ফিলাডেলফিয়া ৭৬ইয়ার্সের মালিক জস হ্যারিস কনসোর্টিয়াম তৈরি করেছেন নিউইয়র্ক জেটসের মালিক উডি জনসনের সঙ্গে।

৮. সর্বশেষ সৌদি আরবের একটি কনসোর্টিয়ামও রয়েছে লড়াইয়ে।

একটি কনসোর্টিয়ামের অংশ হয়ে প্রস্তাব দেন ধনকুবের টড বোহলি। তিনি ২০১৯ সালেও একবার চেলসি কেনার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। অন্যতম আগ্রহী সুইস বিলিয়নেয়ার উইস। ব্লিক পত্রিকাকে ৮৬ বছর বয়সী এই উইস বলেছেন, চেলসি কেনার সুযোগটি তিনি নিতে চান। ধারণা করা হয়, তিনি অন্তত ৪০০ কোটি পাউন্ডের মালিক। আগ্রহীদের মধ্যে আছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বন্ধু উডি জনসন অন্যতম।

ব্রিটিশ ব্যবসায়ী নিক ক্যান্ডি আছেন আলোচনায়। তিনি এ মাসের শুরুর দিকেই আগ্রহ প্রকাশ করেন। তার সঙ্গে এ বিডে যুক্ত হন চেলসির সাবেক স্ট্রাইকার জিয়ানলুকা ভিয়াল্লি। ইতালির সাবেক এই ফুটবলার বুধবার ক্যান্ডির সঙ্গে যৌথ বিডের ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, চেলসি কেনা নিয়ে জনাব ক্যান্ডির বিডে যুক্ত হতে পেরে আমি নিজেকে ভাগ্যবান ও গর্বিত মনে করছি।

সর্বশেষ বৃহস্পতিবার আগ্রহী ক্রেতার তালিকায় যুক্ত হন তার্কিশ ব্যবসায়ী মুহসিন বাইরাক। জানা গেছে, এ মুহূর্তে তিনি নগদ ১০০ কোটি পাউন্ড দিতে তৈরি আছেন। এছাড়া বাকিটা তিনি অন্যভাবে পরিশোধ করবেন। যেমন, নির্দিষ্ট কিছু রিয়েল স্টেট প্রকল্পের মালিকানা তিনি আব্রামোভিচকে দিয়ে দেবেন, যা প্রস্তাবের মধ্যে থাকছে। মুহসিন বলেছেন, আমরা শিগগিরই তার্কিশ পতাকা লন্ডনে নিয়ে যাব।

বাইরাক এবি গ্রুপ হোল্ডিংয়ের চেয়ারম্যান, যা ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত। ক্রিপ্টোকারেন্সি, কনস্ট্রাকশন, ট্যুরিজম ও জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ রয়েছে এই কোম্পানির।

এছাড়া চেলসি কিনতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের রিকেটস পরিবার, যারা মেজর লিগ বেসবলের দল শিকাগো কাবসের মালিক এবং একটি কনসোর্টিয়ামের অংশ হয়ে বিডে অংশ নেন সাবেক ব্রিটিশ অ্যাথলিট সেবাস্তিয়ান কো।

গুঞ্জন রয়েছে, আইরিশ ইউএফসি তারকা কনোর ম্যাকগ্রেগরকে নিয়েও। ইউএফসি খেলে বিপুল অর্থ আয় করেছেন ম্যাকগ্রেগর এবং গত বছর ১৮০ মিলিয়ন ডলার আয় করে তিনি ছিলেন বিশ্বের সবচেয়ে ধনী অ্যাথলিট। অতীতে তিনি ফুটবল ক্লাব কেনার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। বিশেষ করে স্কটিশ ক্লাব সেল্টিক আর ইংলিশ ক্লাব ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড রয়েছে তার পছন্দের তালিকায়।

আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞ কেরিয়ান ম্যাকগায়ারের বিশ্বাস, ইউএফসি সুপারস্টার বিপুল অর্থ আয় করেছেন এবং তিনি সামনের সারির একজন ক্রেতা হিসেবে আবির্ভূত হলেও হতে পারেন। ফুটবল ইনসাইডারকে ম্যাকগায়ার বলেন, কোনো কনসোর্টিয়ামের মাধ্যমে ক্রেতা হিসেবে আসতে পারেন ম্যাকগ্রেগর। তার নিজের হয়তো অত বেশি অর্থ নেই, কিন্তু তিনি নিজের ব্র্যান্ডকে কাজে লাগিয়ে ক্লাবটি কেনার মতো অর্থ জড়ো করতে সক্ষম।

মিরর, স্পোর্টিং নিউজ ও বিবিসি