সচরাচর ক্যারিয়ারের গোধূলিবেলায় চীন, যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের কোনো লিগে নাম লেখান ইউরোপে খেলা শীর্ষ তারকারা। পর্তুগিজ সুপারস্টার ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো গত জানুয়ারিতে ম্যানইউতে নিজের দ্বিতীয় পাঠ চুকিয়ে সৌদি লিগের দল আল নাসরে নাম লেখানোর সময় তার বয়স ৩৭ বছর। তার সৌদিযাত্রা নিয়ে কেউ অবাক হয়নি। কারণ অবসরের সময়ও সন্নিকটে। আর ক্যারিয়ারে বিশ্বকাপ ছাড়া সব অর্জনই ধরা দিয়েছে তার হাতে। লিওনেল মেসিও সবকিছু অর্জন করে ৩৬ বছর বয়সে নাম লেখান যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ সকারে। রিয়াল ছেড়ে সৌদি আরবের আল ইত্তিহাদ ক্লাবে যোগ দিয়েছেন ফরাসি গ্রেট করিম বেনজেমা। তার বয়স ৩৫। রিয়ালে সবকিছুই জয় করেছেন তিনি। তাই এই দলবদল স্বাভাবিকই।
কিন্তু ব্রাজিলিয়ান সুপারস্টার নেইমারের গোধূলিবেলা কি একটু আগেভাগেই এসে পড়ল? পেট্রোডলারের টানেই কি মাত্র একত্রিশ বছর বয়সে তিনি সৌদি আরবের অখ্যাত এক লিগে নাম লেখালেন?
ফরাসি ক্লাব প্যারিস সেন্ট জার্মেই (পিএসজি) ছেড়ে সৌদি লিগের দল আল হিলালে নাম লেখালেন নেইমার। তাকে অবশ্য বিক্রি করে দিয়েছে পিএসজি। এজন্য ফরাসি ক্লাবটি ফি হিসেবে পাবে ৯০ মিলিয়ন ইউরো (৭৭.৬ মিলিয়ন পাউন্ড)। এর সঙ্গে চুক্তিতে আরো কিছু শর্ত (অ্যাডস অন) যুক্ত রয়েছে। সব মিলিয়ে দলবদলে আল হিলালের খরচ আরেকটু বাড়বে। স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষে গত মঙ্গলবার আল হিলালে চুক্তির আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয় ৩১ বছর বয়সী সুপারস্টারের। ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ক্লাবটির সঙ্গে চুক্তি হয়েছে নেইমারের। দুই বছরে তিনি পাবেন ১৬ কোটি ইউরো। আর পিএসজিতে খেলে বছরে পেতেন ২ কোটি ৫০ লাখ ইউরো।
অমিত মেধাবী এক খেলেয়াড় নেইমার প্রচণ্ডভাবে ভাগ্যবিড়ম্বিত। কোনো না কোনো ট্র্যাজেডি কিংবা চোটের শিকার হয়ে তিনি বারবার বড় আসরে ব্যর্থ হয়েছেন। তাই তো ফুটবলের সুপারস্টার হয়ে কখনো জিততে পারেননি বিশ্বকাপ কিংবা কোপা আমেরিকা। অর্জন বলতে ২০১৩ সালের ফিফা কনফেডারেশন্স কাপ শিরোপা।
২০১৭ সালে দুনিয়া কাঁপানো চুক্তিতে বার্সেলোনা থেকে পিএসজিতে নাম লেখান নেইমার। তাকে বিশ্বরেকর্ড ২২২ মিলিয়ন ইউরোয় কিনে নেয় পিএসজি। বার্সার অনিচ্ছার পরও রিলিজ ক্লজ সক্রিয় থাকায় তাকে দলে নেয় ফরাসি জায়ান্টরা।
দলবদলের গুঞ্জনের কারণে গত শনিবার লরাঁর বিপক্ষে প্রথম লিগ ম্যাচে নেইমারকে স্কোয়াডে রাখেনি পিএসজি। নতুন কোচ লুই এনরিকের পরিকল্পনায় নেই নেইমার। এনরিকে বরং তরুণ খেলোয়াড়দের গড়ে তুলতে চান। এ কারণেই তাকে বিক্রি করে দিল পিএসজি।
পিএসজির হয়ে ১৭৩ ম্যাচ খেলে ১৩টি শিরোপা জিতেছেন নেইমার। এর মধ্যে রয়েছে পাঁচটি লিগ শিরোপা। ২০২০ সালে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে উঠেছিল পিএসজি। যদিও একাধিকবার ইনজুরিতে পড়ায় তার পিএসজি অধ্যায় বাধাগ্রস্ত হয়। চোটের কারণেই তিনি ২০১৯ সালের কোপা আমেরিকা আসর এবং ২০২২ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের শেষ দুটি ম্যাচ খেলতে পারেননি।
এ গ্রীষ্মেই নেইমারের সতীর্থ কিলিয়ান এমবাপ্পে ও সাবেক সতীর্থ মেসিকে কিনতে চেয়ে ব্যর্থ হয়েছে আল হিলাল। তাদের এমবাপ্পের সঙ্গে কথা বলার অনুমতিও দেয় পিএসজি। যদিও ২৪ বছর বয়সী এমবাপ্পে এখনই সৌদি আরবের মতো নিচু সারির লিগে যেতে চান না বলে সেই আলোচনা আর এগোয়নি। এমবাপ্পের জন্য পিএসজি ২৫৮ মিলিয়ন পাউন্ড ফি চেয়েছিল।
আর্জেন্টাইন সুপারস্টার মেসি নাম লিখিয়েছেন মেজর লিগ সকারের দল ইন্টার মিয়ামিতে। মেসি ও এমবাপ্পেকে না পেয়ে আল হিলাল পরে নেইমারের দিকে হাত বাড়ায়। তাতে সফলও হয় সৌদি পেশাদার লিগে রেকর্ড ১৮ বারের চ্যাম্পিয়নরা।
ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, করিম বেনজেমা, সাদিও মানে, রবার্তো ফিরমিনো, জর্ডান হেন্ডারসন ও রুবেন নেভেস এরই মধ্যে সৌদি লিগে নাম লিখিয়েছেন। এবার পেট্রোডলারের ঝলকানিতে মুগ্ধ হয়ে সৌদির বিমান ধরলেন নেইমারও।
ক্লাবের ওয়েবসাইটে দেয়া এক বিবৃতিতে নেইমার বলেন, ‘ইউরোপে আমি অনেক কিছু অর্জন করেছি এবং বিশেষ সময় উপভোগ করেছি। কিন্তু সবসময়ই আমি বৈশ্বিক খেলোয়াড় হতে চেয়েছি এবং নতুন জায়গায় নতুন চ্যালেঞ্জ নিতে চেয়েছি। আমি এখানে ইতিহাস গড়তে চাই। সৌদি আরবের ফুটবলে অবিশ্বাস্য প্রাণ রয়েছে এবং খেলোয়াড়দের দক্ষতাও উঁচুতে।’
নেইমারকে কিংবদন্তি অভিহিত করে পিএসজি প্রেসিডেন্ট নাসের আল খেলাইফি বলেছেন, ‘সে যেদিন পিএসজিতে হাজির হলো, সেই দিনটির কথা আমি কখনই ভুলব না। ছয় বছর ধরে সে আমাদের ক্লাব ও প্রকল্পে অবদান রেখেছে। আমাদের স্মরণীয় মুহূর্তের সাক্ষী ছিল। নেইমার এ ক্লাবের ইতিহাসে বড় একটি অংশ হয়ে থাকবে।’
নেইমার ব্রাজিলের ইতিহাসে অন্যতম সেরা খেলোয়াড় বিবেচিত। তিনি সেলেসাওদের হয়ে যুগ্মভাবে সবচেয়ে বেশি গোলের মালিক। ১২৪ ম্যাচে ৭৭ গোল করে তিনি ছুঁয়েছেন প্রয়াত কিংবদন্তি পেলেকে। ক্যারিয়ারে অসংখ্যবার চোটে না পড়লে হয়তো তার গোলসংখ্যা এখন একশ ছাড়িয়ে যেত।
পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডের (পিআইএফ) বিপুল অর্থ সহায়তা দেয়ার মধ্য দিয়ে সৌদি আরবের চারটি ক্লাবকে জাতীয়করণ করা হয়েছে, এর মধ্যে আল হিলাল একটি। পিআইএফের অন্তত ৭০০ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ রয়েছে।
প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার চুক্তিতে এদিকে নতুন মৌসুমে চেলসিতে নাম লেখালেন একুয়েডরের ময়েজেস কাইসেডো। এ ব্রাইটন মিডফিল্ডারকে ১০ কোটি পাউন্ডে কিনে নিয়েছে ব্লুজরা। পরে ফি বেড়ে হবে সাড়ে ১১ কোটি পাউন্ড (প্রায় ১ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা)। অবশ্য এর আগে বড় অংকের আরেকটি প্রস্তাব পান ২১ বছর বয়সী কাইসেডো। ১১ আগস্ট তাকে পেতে লিভারপুল ১১ কোটি ১০ লাখ পাউন্ডের প্রস্তাব দেয়। কিন্তু তিনি বেছে নিলেন চেলিসকে।
চুক্তিতে সই করার সময় কাইসেডো বলছিলেন, ‘চেলসি যখন আমাকে ডাকল তখন দ্বিতীয়বার ভাবিনি। আমি শুধু জানতাম, এ ক্লাবে সই করতে চলেছি। আমার একটা স্বপ্ন সত্যি হলো, এখন ক্লাবটির হয়ে মাঠে নামার অপেক্ষায় আমি।’
বড় অংকের চুক্তিতে চলতি বছরে দ্বিতীয়বারের মতো ব্রিটিশ রেকর্ড ভাঙতে চলেছে চেলসি, যারা গত মৌসুমে ৬০ কোটি পাউন্ড খরচ করে দল গুছিয়েও লিগে ব্যর্থ হয়েছে। গত জানুয়ারিতে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী মিডফিল্ডার এনজো ফার্নান্দেজকে ১০৭ মিলিয়ন পাউন্ডে কিনে রেকর্ড গড়ে ব্লুজরা। সেই রেকর্ড এবার ভাঙল কাইসেডোর চুক্তিতে।
কাইসেডো ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে লাতিন দেশ একুয়েডরের ইনডিপেনডেন্ট দেল ভাল্লে থেকে ৪০ লাখ পাউন্ডের চুক্তিতে ব্রাইটনে যোগ দেন। যদিও ২০২২ সালের এপ্রিল পর্যন্ত প্রিমিয়ার লিগে অভিষেক হয়নি তার।
ব্রাইটন এ গ্রীষ্মে কাইসেডোর জন্য ১০ কোটি পাউন্ডের বেশি ফি নির্ধারণ করেছিল। তাদের ধারণা ছিল, কেউই এই অংকটার পেছনে ছুটবে না। যদিও তাদের ধারণা ভুল প্রমাণ করে প্রথমে লিভারপুল ও পরে চেলসি রেসে নামে। অবশেষে ব্লুজরাই জয়ী হলো। চেলসি এর আগে ৮ কোটি পাউন্ডের প্রস্তাব দিয়েছিল।
চলতি গ্রীষ্মে চেলসির অষ্টম সাইনিং কাইসেডো। তার আগে চেলসি দলভুক্ত করেছে অ্যাক্সেল দিয়াসাই, ক্রিস্টোফার এনকুনকু, নিকোলাস জ্যাকসন, লেসলি উগোচুকবু, অ্যাঞ্জেলো গ্যাব্রিয়েল, রবার্ট সানচেজ ও দিয়েগো মোরেইরাকে। গত মৌসুমে ১২তম হওয়া চেলসিকে শীর্ষ চারে ফেরাতে মরিয়া ম্যানেজমেন্ট।
এদিকে আজ ওয়েস্ট হ্যামের মুখোমুখি হবে চেলসি। এই ম্যাচেই ব্লুজদের হয়ে লিগে অভিষেক ঘটতে পারে কাইসেডোর।
গ্রীষ্মে আরো যত দলবদল
কিপা আরিজাবালাহা (চেলসি থেকে রিয়াল, ধার চুক্তি)
ফ্রেড (ম্যানইউ থেকে ফেনারবাখ, অপ্রকাশিত ফি)
ওসমান দেম্বেলে (বার্সা থেকে পিএসজি, ৪৩.৫ মিলিয়ন পাউন্ড)
হ্যারি কেন (টটেনহাম থেকে বায়ার্ন, ৯৫ মিলিয়ন পাউন্ড)
ইউসেফ চেরমিতি (লিসবন থেকে এভারটন, ১৫ মিলিয়ন পাউন্ড)
গনসালো রামোস (বেনফিকা থেকে পিএসজি, ধার চুক্তি)
রবার্ট সানচেজ (ব্রাইটন থেকে চেলসি, ২৫ মিলিয়ন পাউন্ড)
ইয়াস্কো গার্দিওল (লিপজিগ থেকে ম্যানসিটি, ৭৭ মিলিয়ন পাউন্ড)
অ্যাক্সেল দিসাসি (মোনাকো থেকে চেলসি, ৩৮.৫ মিলিয়ন পাউন্ড)
সাদিও মানে (বায়ার্ন থেকে আল নাসর, অপ্রকাশিত ফি)










