বাংলাদেশ ও ভারতের ক্রিকেটের শক্তির তফাতটা সবারই জানা। ভারত ওয়ানডে ক্রিকেটে দুবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। টি-টোয়েন্টিতেও দুইবার বিশ্বকাপ জিতেছে তারা। সে সঙ্গে আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে রেকর্ড তিনবার শিরোপাজয়ী দলের নাম ভারত। সদ্যই তারা নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে শ্রেষ্ঠত্ব দেখিয়েছে। এ দলটি মাঠের পারফরম্যান্সে যেমন সেরা, তেমনি আয়ে সেরা তাদের ক্রিকেট বোর্ড, বিসিসিআই। বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ক্রিকেট বোর্ড। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) সব বৈশ্বিক আসর থেকে আয়ের সিংহভাগ পায় বিসিসিআই। এছাড়া আইপিএল কিংবা নানা টিভি ও কমার্শিয়াল চুক্তি থেকে কোটি কোটি ডলার আয় করে ভারত। এ বিশাল আয়ের সুফল ভোগ করেন তাদের ক্রিকেটাররা। বিরাট কোহলি, রোহিত শর্মাদের আয় তাই ঈর্ষণীয়।
রোহিত শর্মা ও নাজমুল হোসেন শান্তদের বেতনের তফাৎ আসলে কতটা হতে পারে? ভারতীয় ক্রিকেটাররা বার্ষিক চুক্তিতে বেতন পান। এর বাইরে ভারতীয় ক্রিকেটারদের উপার্জনের আরো অনেক উৎস রয়েছে। যেমন ব্র্যান্ড এনডোর্সমেন্ট, বিজ্ঞাপন ইত্যাদি। এ প্লাস, এ, বি, সি—এই চারটি ক্যাটাগরিতে ক্রিকেটারদের বেতন দেয় বিসিসিআই। এ প্লাস গ্রেডে থাকা ক্রিকেটার রোহিত শর্মা, বিরাট কোহলি, জশপ্রীত বুমরাহ ও রবীন্দ্র জাদেজা বার্ষিক বেতন পান ৭ কোটি রুপি (প্রায় ৯ কোটি ৭৭ লাখ টাকা)। তারপরের গ্রেডগুলোতে যথাক্রমে ৫ কোটি রুপি (প্রায় ৬ কোটি ৯৮ লাখ টাকা), ৩ কোটি রুপি (প্রায় ৪ কোটি ১৯ লাখ টাকা) ও এক কোটি রুপি (১ কোটি ৪০ লাখ টাকা) করে বেতন দেয় ভারতীয় বোর্ড। যদিও বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের সর্বোচ্চ বেতন ভারতের সর্বনিম্ন গ্রেডের চেয়েও কম!
ভারতীয় ক্রিকেটাররা এর বাইরে টেস্টের ম্যাচ ফি ১৫ লাখ রুপি, ওয়ানডের ম্যাচ ফি ৬ লাখ রুপি ও টি-টোয়েন্টির ম্যাচ ফি ৩ লাখ রুপি করে পেয়ে থাকেন।
ভারতীয় দলনায়ক রোহিত শর্মার বার্ষিক বেতন ৭ কোটি রুপি। এবার দেখা যাক, বাংলাদেশ অধিনায়ক শান্তকে কত টাকা বেতন দেয় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। সম্প্রতি প্রকাশিত নতুন চুক্তির হিসাবে শান্ত মাসে ৮ লাখ টাকা বেতন পাবেন। এ হিসাবে বছরে পাবেন ৯৬ লাখ টাকা। আর ভারতীয় দলনায়ক রোহিত কিংবা তাদের শীর্ষ গ্রেডের কোহলি পাচ্ছেন প্রায় ৯ কোটি ৭৭ লাখ টাকা করে! অর্থাৎ শান্তর ঠিক ১০ গুণ বেশি বেতন পান রোহিত।
অবশ্য সর্বশেষ চুক্তি অনুযায়ী শান্ত নন, বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেতন এখন তাসকিন আহমেদের। এ ডানহাতি পেস বোলার গত এক বছর ধরে সব ধরনের ফরম্যাটে ভালো পারফর্ম করে এসেছেন বলেই তাকে সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক দিয়ে সম্মানিত করেছে বোর্ড। ‘এ প্লাস’ ক্যাটাগরিতে আছেন শুধুই তাসকিন।
চলতি বছর ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিসিবির কেন্দ্রীয় চুক্তিতে জায়গা পান ২১ ক্রিকেটার। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা বেতন পাবেন পেসার তাসকিন। বর্তমান ওয়ানডে ও টেস্ট অধিনায়ক শান্ত, অলরাউন্ডার মেহেদী হাসান মিরাজ, লিটন কুমার দাস ও মুশফিকুর রহিম আছেন ‘এ’ গ্রেডে; যারা প্রত্যেকে মাসে পাবেন ৮ লাখ টাকা। ‘বি’ গ্রেডে বেতন মাসে ৬ লাখ টাকা। এ গ্রেডে আছেন মুমিনুল হক সৌরভ, তাইজুল ইসলাম, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, মুস্তাফিজুর রহমান, তাওহীদ হৃদয়, হাসান মাহমুদ ও নাহিদ রানা।
‘সি’ গ্রেডে থাকা সাদমান ইসলাম, সৌম্য সরকার, জাকের আলী অনিক, তানজিদ হাসান তামিম, শরিফুল ইসলাম, রিশাদ হোসেন, তানজিম হাসান সাকিব ও শেখ মেহেদী হাসান পাবেন মাসে ৪ লাখ টাকা করে এবং ‘ডি’ গ্রেডে থাকা নাসুম আহমেদ ও সৈয়দ খালেদ আহমেদ মাসে পাবেন ২ লাখ টাকা করে।
এদিকে, চুক্তিতে ‘বি’ গ্রেডে রাখা হলেও নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন মাহমুদউল্লাহ। ১০ মার্চ চুক্তির তালিকা প্রকাশ করার দুদিন পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকেই অবসর নিয়ে নেন তিনি। ফলে বিসিবির চুক্তিতে এখন আছেন ২১ জন। বিসিবি নতুন করে কাউকে এ চুক্তিতে রাখবে কিনা, সেটা জানা যায়নি। ক্রিকেটারদের বেতন গ্রেড বদলের পাশাপাশি ম্যাচ ফিও বাড়ছে এবার।
চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে মাহমুদউল্লাহর মতোই ব্যাট হাতে পারফর্ম করতে পারেননি দীর্ঘ দেড় দশক ধরে বাংলাদেশের অন্যতম সেরা ব্যাটার মুশফিকুর রহিম। এরপর থেকে দুজনকে নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়। এর মধ্যেই ৫ মার্চ ওয়ানডে থেকে অবসরের ঘোষণা দেন মুশফিক। তিনি এখন থেকে দেশের হয়ে খেলবেন শুধু টেস্ট। বিসিবির কেন্দ্রীয় চুক্তিতে তাকে রাখা হয়েছে। তবে ওয়ানডে থেকে অবসর নেয়ায় শুরুতে ‘এ’ ক্যাটাগরিতে থাকলেও মার্চ থেকে তিনি চলে যাবেন ‘বি’ ক্যাটাগরিতে।
২০২২ সাল থেকে সংস্করণ অনুযায়ী ক্রিকেটারদের সঙ্গে চুক্তি করে এলেও এবার তা বদলে ‘এ+’, ‘এ’, ‘বি’, ‘সি’ ও ‘ডি’—এ পাঁচটি ভিন্ন ক্যাটাগরি করেছে বিসিবি।
কেন্দ্রীয় চুক্তিতে প্রথমবারের মতো জায়গা করে নিয়েছেন পেসার নাহিদ রানা। গতির ঝড় তোলা এ পেসারকে রাখা হয়েছে ‘বি’ ক্যাটাগরিতে। নাহিদ ছাড়াও প্রথমবার বিসিবির কেন্দ্রীয় চুক্তিতে জায়গা পেয়েছেন উইকেটকিপার ও হার্ডহিটিং ব্যাটার জাকের আলী, স্পিনিং অলরাউন্ডার রিশাদ হোসেন ও ওপেনিং ব্যাটার তানজিদ হাসান তামিম। তিনজনকেই রাখা হয়েছে ‘সি’ ক্যাটাগরিতে। তারা মাসে ৪ লাখ টাকা (বছরে ৪৮ লাখ) করে বেতন পাবেন। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যাবে, তাদের ‘সি’ গ্রেডে থাকা ক্রিকেটাররা বছরে ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা বেতন পান (বাংলাদেশীদের প্রায় তিন গুণ)।
এবার বিসিবির চুক্তিতে নেই দেশের ইতিহাসে সেরা ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান ছাড়াও নুরুল হাসান সোহান, জাকির হাসান, মাহমুদুল হাসান ও নাঈম হাসান—যারা সর্বশেষ চুক্তিতে ছিলেন। এবার কেন্দ্রীয় চুক্তিতে ফিরেছেন সৌম্য সরকার ও সাদমান ইসলাম।
ভারত ও বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের আয়ের এ বিশাল ব্যবধান সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়েছিল সিনিয়র ক্রীড়া সাংবাদিক ও ক্রিকেট বিশ্লেষক শামীম চৌধুরীর কাছে। তিনি অবশ্য একে স্বাভাবিকভাবেই দেখছেন এবং বাংলাদেশের ক্রিকেটে খেলোয়াড়দের বেতন বৃদ্ধির গ্রাফটা ইতিবাচকভাবেই দেখছেন। তার কথায়, ‘দেখুন, ইতিহাস ঘাঁটাঘাঁটি করলে দেখতে পারেন, ভারতেরও আগে বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা বেতনের আওতায় এসেছে। ২০০১ সালের দিকে প্রথম বেতনের আওতায় আসেন ক্রিকেটাররা। তখন ‘এ’ গ্রেডে মাসে ৩৩ হাজার ও ‘বি’ গ্রেডে মাসে ২২ হাজার টাকা বেতন ছিল। অনেক দিন ধরে একটা জায়গায় স্থির ছিল। ২০১৩ সালে এসে বেতনটা একটু বেশি করে বাড়া শুরু হয় এবং গত দুই-তিন বছরে ক্রিকেটারদের বেতন জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। ২৫ বছরের ব্যবধানে আজ বেতন প্রায় ৩০০ গুণ বেড়ে সর্বোচ্চ গ্রেডে মাসে ১০ লাখ টাকা করা হয়েছে। এছাড়া আমাদের ক্রিকেটাররা টেস্ট খেলে ৮ লাখ, ওয়ানডে খেলে ৪ লাখ ও টি-টোয়েন্টি খেলে আড়াই লাখ টাকা ম্যাচ ফি পাচ্ছেন। বছরে ৬টা টেস্ট খেললেও প্রায় ৫০ লাখ টাকা পাবেন, সেই সঙ্গে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি তো আছেই। কাজেই সর্বোচ্চ গ্রেডে থাকা তাসকিন কিন্তু বছরে ২ কোটি টাকা আয় করতে পারছেন বোর্ডের কাছ থেকেই। অংকটি কিন্তু খারাপ নয়।’
তিনি বলেন, ‘লক্ষণীয় ব্যাপার হলো, ভারতের এ প্লাস গ্রেডে রোহিত, কোহলির সঙ্গে পেস বোলার হিসেবে বুমরাহ আছেন। বিসিবির এ প্লাস গ্রেডে রাখা হয়েছে পেস বোলার তাসকিনকে। এমনটা কিন্তু বিশ্বে খুব কম দেশেই দেখা যায়। এটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাপার। যেহেতু বেতন বছরে কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাচ্ছে, আমার মনে হয়, তারা জাতীয় দলের খেলায় আরো বেশি মনোনিবেশ করবে। এছাড়া বিপিএল, ডিপিএল আর ব্যক্তিগত স্পন্সর মিলিয়ে একজন শীর্ষ ক্রিকেটার কিন্তু বছরে ৫-৬ কোটি টাকা আয় করতে পারেন। পজিটিভ দিক হলো, টেস্টের ম্যাচ ফি ৮ লাখ টাকা করা। টেস্টের প্রতি জোর দেয়ার কারণেই কিন্তু ম্যাচ ফি বাড়ানো হয়েছে।’
এবার ভারতীয় বোর্ডের সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, ‘ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড টিভি রাইটস আর নানা কমার্শিয়াল চুক্তি থেকে হাজার হাজার কোটি রুপি আয় করে। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের আয় বিসিবির আয়ের প্রায় ৭০ গুণ! কাজেই তারা ক্রিকেটারদের বেশি বেতন দেবে, এটাই তো স্বাভাবিক। তবে ভারতীয় ক্রিকেটাররাই কিন্তু বিশ্বে সর্বোচ্চ বেতন পান না। সবচেয়ে বেশি বেতন পান ইংলিশ ক্রিকেটাররা। গত বছর জস বাটলারের বেতন ছিল ১১ লাখ পাউন্ডের মতো, যা ভারতীয়দের চেয়ে অনেক অনেক বেশি। অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটাররাও ভালো বেতন পান। নিউজিল্যান্ডের ক্রিকেটাররা আমাদের চেয়ে অনেক বেশি বেতন পেতেন, এখন কমে গেছে। পাকিস্তানের ক্রিকেটারদের বেতন আমাদের চেয়ে বেশি হলেও দক্ষিণ আফ্রিকা কিংবা ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেটারদের কম।’
গত বছর ক্রিকআই এক প্রতিবেদনে জানায়, অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক প্যাট কামিন্সের বার্ষিক বেতন ১০ লাখ অস্ট্রেলিয়ার ডলার (১২ কোটি ভারতীয় রুপি)। ১১ কোটি ৫০ লাখ রুপি নিয়ে এরপরেই স্টিভেন স্মিথ। তাই বলা যায়, ভারতের চেয়েও ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটারদের বেতন বেশি। কেবল ভারতীয় নয়, ইংলিশ ও অজিদের তুলনায়ও টাইগারদের বেতন কাঠামো অনেক কম। যদিও আশার কথা, তাদের বেতন বৃদ্ধির ধারায় রয়েছে।










