ক্যারিয়ারের প্রথম তিন ওয়ানডেতে করেছেন মাত্র ১ রান। ম্যাচপ্রতি রানগড় ছিল অদ্ভুতুড়ে ০.৫০! বাংলাদেশ টেস্ট দলে নিয়মিত হলেও ওয়ানডেটা তাই ইয়াসির আলীর জন্য চ্যালেঞ্জের হয়ে ওঠে। যদিও সাহস দিয়ে সব ভয়কে জয় করেছেন ২৬ বছর বয়সী এই ক্রিকেটার। শুক্রবার সেঞ্চুরিয়নে চার বাউন্ডারি ও দুই ছক্কায় ৪৪ বলে ৫০ রানের মোহনীয় ইনিংস খেলে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়ে রেখেছেন বড় ভূমিকা। এর মধ্য দিয়ে ওয়ানডে দলে জায়গা পাকা তো করেছেনই, পাশাপাশি সবার প্রশংসাও কুড়াচ্ছেন।

চতুর্থ উইকেটে সাকিব আল হাসানকে নিয়ে ৮২ বলে ১১৫ রানের জুটি গড়ে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন ইয়াসির। উইকেটে থাকার সময় জ্যেষ্ঠ সতীর্থ সাকিবের পরামর্শ কতটা সাহায্য করেছে তা-ও জানালেন ইয়াসির। চট্টগ্রামের এই ক্রিকেটার মনে করেন, আফগানিস্তান সিরিজে খারাপ করায় এই ইনিংসটা তার আত্মবিশ্বাস আনার জন্য অত্যাবশ্যক ছিল। তিনি বলেন, উইকেট নিয়ে সাকিব ভাইকে প্রশ্ন করলেই তিনি সোজাসাপ্টা জানান, এটা খুবই ভালো উইকেট। আপনিও ৫-১০টি বল খেললেই বুঝে যাবেন। এরপর আপনি শট খেলতে পারবেন।

এছাড়া প্রথম ওয়ানডের আগে বাংলাদেশের টিম হোটেলে প্রোটিয়া গ্রেট এবি ডি ভিলিয়ার্সের অতিথি হয়ে আসা ও ছোটখাটো টিপস দেয়াটাও ভীষণ কাজে লেগেছে ইয়াসিরের। তার কথায়, এবি ডি ভিলিয়ার্স আমাদের টিম হোটেলে এসেছিলেন। তিনি এমন কিছু কথা বলেছেন যা আমাকে সাহায্য করেছে। আফগানিস্তান সিরিজে আমি ভালো করিনি। কাজেই এই ইনিংসটা আমার আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেবে।

সুপারস্পোর্ট পার্কে দলগত পারফরম্যান্সে ভর করে জিতেছে বাংলাদেশ। লিটন দাস ও তামিম ইকবাল ভিত গড়ে দেয়ার পর চতুর্থ উইকেটে প্রোটিয়া বোলিং আক্রমণ তছনছ করে ১১৫ রান যোগ করেছেন সাকিব ও ইয়াসির। এরপর বোলিংয়ে গুরুত্বপূর্ণ উইকেট নিয়েছেন তাসকিন আহমেদ ও শরিফুল ইসলাম। শেষ ৯ ওভার করাতে পঞ্চম বোলারের ওপর খুব বেশি ভরসা করতে হচ্ছিল তামিমকে। তখনই ঘূর্ণি জাদুতে ০/৩৯ ফিগারটা ৪/৬১ করে ফেললেন মেহেদী হাসান মিরাজ।

নির্বাচক হাবিবুল বাশার বলছেন, আমরা পরিকল্পনা অনুযায়ী নিখুঁত ক্রিকেট খেলেছি। আর টিম ডিরেক্টর খালেদ মাহমুদ সুজন বললেন, এই ম্যাচের ‘ম্যান অব দ্য ম্যাচ’ আসলে কয়েজন।

কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকার মাঠে প্রথম এই জয়ের অন্যতম কাণ্ডারি হিসেবে ইয়াসিরকে প্রশংসায় ভাসাচ্ছেন সবাই। তামিম বলছিলেন, ইয়াসিরের ইনিংসটি খুবই স্পেশাল। আর সাকিব বললেন, ইয়াসির অনেক ভালো ব্যাট করেছে। তার ও আমার পার্টনারশিপটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তাকে অনেক কৃতিত্ব দেব।

ব্যাটিংয়েই দায়িত্ব শেষ করেননি ইয়াসির। ক্যারিয়ারের প্রথম হাফ সেঞ্চুরি তুলে নেয়ার পর ফিল্ডিংয়েও তাক লাগিয়েছেন তিনি। দক্ষিণ আফ্রিকাকে জয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছিলেন রাসি ফন ডার ডুসেন। ব্যক্তিগত ৮৬ রানে তাসকিনের বলে তিনি ছক্কা হাঁকাতে গেলে স্কয়ার লেগ অঞ্চলে ডান দিকে কয়েক গজ দৌড়ে অবিশ্বাস্য এক ক্যাচ নিয়ে তাকে সাজঘরে ফেরান ইয়াসির। এই ক্যাচটিই যেন ম্যাচের দৃশ্যপট পাল্টে দিল। কেননা তখনো ১২.৫ ওভারে ১২৩ রান প্রয়োজন ছিল প্রোটিয়াদের।

সেই ক্যাচ ধরার সময় কি একটু চাপ অনুভব করছিলেন ইয়াসির? তিনি বলেন, একটু উদ্বেগ তো ছিলই। আমরা সব সময় ওদের চাপে রাখতে চাচ্ছিলাম। বাউন্ডারি হচ্ছিল আবার ডটও হচ্ছিল। তবে ওদের জন্যই চাপ বেশি ছিল। কারণ, রান রেট বরাবরই বাড়ছিল। তখনই মাথায় কাজ করছিল, এই উইকেটের জন্য স্পেশাল কিছু করতে হবে। আমার কাছে যদি সুযোগ আসে, আমি সেই সুযোগটা কাজে লাগাব। এছাড়া আর কিছুই না, সবাই প্রশংসা করছিল।

ম্যাচ শেষে ইয়াসিরই জানান, গত জানুয়ারিতে নিউজিল্যান্ডের মাউন্ট মঙ্গানুই টেস্টে জয়ের পর দলের মধ্যে আলাপ হচ্ছিল, দক্ষিণ আফ্রিকায় একই রকম কিছু করা যায় কিনা। ইয়াসির বলেন, নিশ্চিতভাবেই এমন একটি জয় আমরা চাচ্ছিলাম। মাউন্ট মঙ্গানুইতে জয়ের পর আমাদের এই বিশ্বাস ছিল যে বিদেশে যেকোনো দলকেই আমরা হারাতে পারি। এখানে (দক্ষিণ আফ্রিকা) তো আলাদা কিছু নয়। নিউজিল্যান্ডে থাকাকালেই দক্ষিণ আফ্রিকায় জয়ের ব্যাপারে বিশ্বাস তৈরি হয় আমাদের মধ্যে।