মঞ্চ নাটকের কিংবদন্তি বাদল সরকার। আজ তার প্রয়াণ দিবস। ২০১১ সালের ১৩ মে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। নাট্যকার ও নাট্যতাত্ত্বিক বাদল সরকারের ১৩তম প্রয়াণবার্ষিকী স্মরণে ঢাকার মঞ্চে আসছে দুটি নাটক। নাট্যসংগঠন ও নাট্যপালা স্বপ্নদল বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটারে ১৩-১৪ মে যৌথভাবে আয়োজন করছে দুই দিনব্যাপী ‘নাট্যপালা স্বপ্নদল বাদল সরকার নাট্য-আয়োজন ২০২৪’। প্রথম দিন ১৩ মে সন্ধ্যা ৭টায় নাট্যপালার পরিবেশনায় তোসাদ্দেক হোসাইন মান্নার নির্দেশনায় বাদল সরকারের ‘বাঘ’ প্রযোজনার উদ্বোধনী মঞ্চায়ন অনুষ্ঠিত হবে। দ্বিতীয় দিন মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭টায় থাকছে বাদল সরকারের মূল রচনা অবলম্বনে জাহিদ রিপনের রূপান্তর ও নির্দেশনায় দেশ-বিদেশে প্রশংসিত যুদ্ধবিরোধী গবেষণাগার নাট্য ‘ত্রিংশ শতাব্দী’-র ১২২তম মঞ্চায়ন।
বাদল সরকার ১৯২৫ সালে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তার স্কুল ও কলেজ জীবনে তার নাম ছিল সুধীন্দ্রনাথ সরকার। স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে বিজ্ঞানে স্নাতক হয়ে ভর্তি হন শিবপুর বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে। সেখানেই তিনি নিজের নাম বাদল সরকার লিখিয়েছিলেন। নাটকে তার যাত্রা পঞ্চাশের দশকে। প্রথম জীবনে শৌখিন থিয়েটারে অভিনয় করেন তিনি এবং পরে ‘শতাব্দী’ নামে নতুন একটি নাট্যগোষ্ঠী তৈরি করেন। কলকাতার কার্জন পার্কে এ গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে বাদল সরকার নিয়মিত থার্ড থিয়েটারে অভিনয় করেছেন।
তার নাটকের নিজস্ব একটি ধারা আছে। নাটক রচনার ক্ষেত্রে তিনি অ্যাবসার্ড নাট্যদর্শন দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। বহুদিন ধরে বহু নাটক তিনি লিখেছেন। এর মধ্যে ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’ তার লেখা সর্বাধিক জনপ্রিয় নাটক। শুধু নাটক নয়, অনেক বিদেশী গল্প অনুসরণে তিনি বহু বাংলা গল্পও লিখেছেন। বাংলা থিয়েটারের ইতিহাসে অন্য ধারার শিল্পী হিসেবে তিনি আজও স্মরণীয়। তাকে সম্মান জানানো হবে আগামী দুদিনের নাটক মঞ্চস্থ করার মাধ্যমে।
১৩ই মে ‘বাঘ’ মঞ্চায়ন হবে। দুই দিনব্যাপী এ আয়োজনের উদ্বোধন করবেন বিশিষ্ট অভিনেতা ও নির্দেশক নাট্যজন আবুল হায়াত। আর শেষদিনে ত্রিংশ শতাব্দীর প্রদর্শনীর আগে প্রদর্শন করা হবে ডকুমেন্টারি ‘স্বপ্ন-উড়াল: সূর্যোদয়ের দেশে’। জাপানের বৃহত্তম নাট্যোৎসব ‘ফেস্টিভ্যাল/ টোকিও ২০১৮’-র আমন্ত্রণে বাদল সরকারের এ নাট্যপ্রযোজনাসহ স্বপ্নদলের জাপানে নাট্যসফর ও দুটি বিশেষ প্রদর্শনী নিয়ে এ তথ্যচিত্র নির্মিত ও প্রদর্শিত।
দুটি নাটকের গল্প কাছাকাছি তবে ভিন্ন। সামাজিক অবহেলা, বঞ্চনা, শিক্ষার অভাব প্রভৃতি মানুষকে পরিণত করতে পারে পশুতে। কিন্তু মানুষ তো এক অনন্ত সম্ভাবনার আধার, তাই মানবিকতার পরশে সে মানুষই হয়তো ফিরে আসতে পারে পতনের শেষবিন্দু থেকে। এমনই এক কাহিনী উঠে এসেছে নাট্যপালার বাঘ প্রযোজনায় দুজন নারী-পুরুষের জীবনের নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে। পাশাপাশি নানা তর্ক-বিতর্কে প্রকাশ হয় শিক্ষাব্যবস্থার হাল, যুদ্ধবিরোধিতা, অর্থনৈতিক সংকট আর বন্ধুত্বের চিরায়ত আবেদন।
অন্যদিকে স্বপ্নদলের ত্রিংশ শতাব্দীর মূলকাহিনী পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কজনক অধ্যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে জাপানের হিরোশিমা-নাগাসাকির আণবিক বোমা বিস্ফোরণের অপ্রত্যাশিত পরিণতি। এর সমান্তরালে গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থাপন হয়েছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, বসনিয়া, আফগানিস্তান, পাকিস্তান-ভারত, ইরাকে আগ্রাসন, কুয়েত-তিউনিসিয়া-ইয়ামেন-সিরিয়া-তুরস্ক-মিয়ানমার-গুলশানে বর্বর হামলা, ধর্মের নামে সংখ্যালঘু নির্যাতন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অমানবিকতা, ফিলিস্তিনে ইসরাইলের সাম্প্রতিক নিষ্ঠুরতা ও আরো নানা প্রসঙ্গ। সভ্যতা ধ্বংসকারী মানবসৃষ্ট যুদ্ধ-গণহত্যা-অনাচারের বিপরীতে মানুষ হিসেবে বর্তমান কর্তব্য অনুধাবন ও এক্ষেত্রে দর্শককে সিদ্ধান্ত গ্রহণের মুখোমুখি স্থাপনই ত্রিংশ শতাব্দী প্রযোজনার প্রত্যাশা। এরই মধ্যে এটি ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামার (এনএসডি) ‘ভারত রঙ্গ মহোৎসব ২০১৫’সহ ভারতের নানা উৎসব এবং জাপান ও ইংল্যান্ডের উৎসবে মঞ্চায়ন হয়েছে।
এ দুই নাটকের মাধ্যমে ইতিহাস ও সমাজের কিছু বিষয়ের প্রতি আঙুল তোলার পাশাপাশি দর্শকের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করা হবে বাস্তব পরিস্থিতি। সেই সঙ্গে বাদল সরকারকেও পরিচয় করিয়ে দেয়া হবে নতুন করে।










