১৯২০-এর দশক। যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমা অঙ্গরাজ্য। চলছে রেড ইন্ডিয়ানদের ওসেজ গোষ্ঠীর জাতিগত আচার। বয়োজ্যেষ্ঠরা হাহাকার করছেন, মাটিতে পুঁতে ফেলছেন একটি বস্তুকে। যা সূচিত করছে নিজস্ব জীবনপ্রণালি থেকে, নাড়ির টান থেকে তাদের সরে যাওয়া। অন্যদিকে বয়সে তরুণরা মেতেছে আনন্দ উল্লাসে। কারণ তাদের মালিকানাধীন জমির তলায় মিলেছে তেলের সন্ধান।৷ ধীরে ধীরে ওসেজরা আর রেড ইন্ডিয়ান থাকে না। আচার-আচরণে তারা হয়ে পড়ে পুরোদস্তুর সাদা চামড়ার লোকেদের মতো। বহু বছর ধরে তারা নানা কারণে চরে বেড়িয়েছে বুনো পশ্চিমের নানা অঞ্চল। অবশেষে থিতু হয়েছে ওকলাহোমায়। এত বছরের ত্যাগ-তিতিক্ষার দরুন হয়তো ঈশ্বর তাদের বর দিয়েছেন,৷ ধরিত্রীমাতা করে দিয়েছেন আরাম-আয়েসের ব্যবস্থা। তরুণরা হয়তো এটাই ভাবছিল।
কিন্তু আসলেই কি তাই? সময়ের সঙ্গে আমরা সাদা চামড়াধারীদের আসতে দেখি ওসেজদের এলাকায়। তারা আসে বন্ধুর বেশে। ওসেজদের তাদের প্রয়োজনও ছিল। কেননা তাদের সম্পত্তিতে প্রাপ্ত তেলের মালিকানা তাদের হলেও এসবের ভোগ সরাসরি তারা করতে পারত না। আইন অনুযায়ী নিয়োগ দিতে হতো সাদা চামড়ার লিগ্যাল গার্ডিয়ান। কারণ মার্কিন কর্তৃপক্ষ নিজেদের সহায়-সম্পত্তি রক্ষায় তাদের অনুপযুক্ত মনে করত।
এভাবেই পারস্পরিক প্রয়োজনে বুনো পশ্চিমে মিলেমিশে থাকছিল সাদা চামড়াধারী আর রেড ইন্ডিয়ানরা। এসব কারণেই উইলিয়াম ‘কিং’ হেল (রবার্ট ডি নিরো), আর্নেস্ট বার্কহার্টসহ (লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও) অন্যদের ওকলাহোমায় আসা, মলি কাইলের (লিলি গ্ল্যাডস্টোন) সঙ্গে পরিচয় হওয়া। কিন্তু আপাত দৃষ্টিতে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও ভেতরে ভেতরে আঁকা হচ্ছিল নীল নকশা। কারণ কিছুদিন পর পরই মৃত পাওয়া যাচ্ছিল ওসেজ সম্প্রদায়ের একের পর সদস্যকে। পুলিশ কিংবা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েও মিলছিল না কোনো প্রতিকার। কেন মরছিল তারা? কীসের জন্য বা কীভাবে তাদের হত্যা করা হচ্ছিল? এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে দেখতে হবে কিলারস অব দ্য ফ্লাওয়ার মুন। যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের কালোতম একটি অধ্যায়কে অনন্য নৈপুণ্যে ফুটিয়ে তুলেছেন কিংবদন্তি পরিচালক মার্টিন স্করসেজি। ডেভিড গ্রানের নন-ফিকশন বই অবলম্বনে রচিত এর চিত্রনাট্য লিখেছেন স্করসেজি নিজে ও এরিক রথ। আর বিষয়বস্তুর ট্রিটমেন্টে তারা বেছে নিয়েছেন মিস্ট্রি জনরাকে।
কুশীলবদের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাব রবার্ট ডি নিরো আর লিওনার্দো ডি ক্যাপ্রিওর মতো টাইটানদের। যারা পুরোটা সময় নিজেদের চরিত্র রূপায়ণের মাধ্যমে দর্শককে করে রেখেছেন মন্ত্রমুগ্ধ। তবে দর্শককে সবচেয়ে অভিভূত করেছেন বোধহয় মলি চরিত্রে লিলি গ্ল্যাডস্টোনের পারফরম্যান্স।
যেহেতু ঐতিহাসিক ঘটনাকে আশ্রয় করে সিনেমাটি নির্মাণ হয়েছে, সেহেতু ঐতিহাসিক নির্ভুলতার ব্যাপারটি নিখুঁত হতে হতো। আর হয়েছেও তাই। প্রডাকশন ডিজাইনে ডিটেইলিংয়ের প্রতি যে মনোযোগ দেয়া হয়েছে, সেটি প্রসংশনীয়। এটি দর্শককে বিশের দশকে নিয়ে গেছে অনায়াসে আর দেখার অনুভূতিকে করেছে অনিন্দ্য। ওসেজদের হত্যা ও এ-সংক্রান্ত তদন্ত পেয়েছে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব, যার মাধ্যমে সম্মান জানানো হয়েছে ওসেজ গোষ্ঠীর সহনশীলতা ও সংগ্রামকে। দক্ষতার সঙ্গে এখানে আলোকপাত করা হয়েছে আমেরিকার ইতিহাসের কালো দিক এবং এতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ঐকান্তিক গল্পের প্রতি।
পরিচালক হিসেবে স্করসেজির প্রতিভার পরিচয় ফুটে ওঠে সিনেমার প্রতিটি দৃশ্যে। এর আখ্যানের যে জটিলতা, তা তিনি সামলিয়েছেন সুনিপুণ নৈপুণ্যের সঙ্গে। তাকে এক্ষেত্রে সহায়তা করেছে রদ্রিগো প্রিয়েতোর অসাধারণ সিনেমাটোগ্রাফি।৷ প্রিয়েতো নিজের ক্যামেরায় একদিকে যেমন ওসেজ পরিবেশ ও দৈনন্দিন জীবনাচরণকে ফুটিয়ে তুলেছেন শৈল্পিক দক্ষতায়, একই সঙ্গে সিনেমার ভয় জাগানিয়া আবহকেও তিনি সমুন্নত রেখেছেন। এজন্য সংগীত পরিচালক রবি রবার্টসনকেও দিতে হবে প্রাপ্য কৃতিত্ব। তার রচিত সংগীত গল্পের আবেগপ্রবণতাকে দিয়েছে ভাষা। সোজা কথায় বলা যায়, গল্পের চরিত্রের মতো সিনেমার সংগীত আর সিনেমাটোগ্রাফিও দুটি চরিত্রের মতো প্রতীয়মান হয়েছে, যা সাসপেন্সকে নিয়ে গেছে সুউচ্চতায় আর লেয়ার যোগ করেছে স্টোরিটেলিংয়ে।৷
সিনেমা হিসেবে কিলারস অব দ্য ফ্লাওয়ার মুন অতিক্রম করেছে স্থান-কাল আর জনরার বাধাকে,৷ ক্রাইম বা মিস্ট্রির বিষয়গুলোকে অটুট রেখেই এটি মর্মভেদী এক সোশ্যাল কমেন্ট্রি। লোভ, দুর্নীতি এসবের পাশাপাশি এটি দুর্বল সম্প্রদায় শোষণের থিমকে দর্শকের সামনে ফুটিয়ে তোলে দ্ব্যর্থহীনভাবে। যেসব শোষণ আজ ১০০ বছর পরও আমাদের সমাজে সমভাবে উপস্থিত।৷
পরিশেষে বলতে হয়, কিলারস অব দ্য ফ্লাওয়ার মুন একটি সিনেমাটিক জেম। শক্তিশালী কাস্ট, অনবদ্য ডিরেকশন আর চিরসবুজ গল্প মিলে এটি এমন একটি অভিজ্ঞতা উপহার দেয়, যার রেশ সিনেমা শেষেও থেকে যায় বহুক্ষণ। নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে এটি কালোত্তীর্ণ মাস্টারপিস হিসেবে স্থান করে নেবে ইতিহাসে। আর যুগে যুগে অর্জন করবে সিনেমাপ্রেমীদের সম্মান।










