‘হিরোজ বা বীরপুরুষগণ’ এ কী শুধুই একটি শব্দ? নাকি বীরপুরুষ শব্দটির ভেতর আমরা খুঁজে পাই কোনো নিগূঢ় মর্মার্থ। আর যদিবা পাই, কী তার তাৎপর্য? প্রশ্নটির এক নান্দনিক উত্তর মেলে যদি শব্দটিকে এভাবে ভেঙে পড়ি, ‘হি-রোজ’ বা ‘সে, যে জেগে উঠেছে’, তার অস্তিত্বকে জানান দিয়ে। এ মূল সুরকে নিয়েই নাটক ‘হি-রোজ: ফ্রম ভগবৎ গীতা টু দ্য ইলিয়াড, দ্য এমব্রেস অব অর্জুন অ্যান্ড অ্যাকিলিস’। ঢাকার আলিয়ঁস ফ্রঁসেজের আয়োজনে এবং আদিশক্তি ল্যাবরেটরি ফর থিয়েটার আর্ট রিসার্চ ও ইকোল ন্যাশিওনাল সুপেরিওর দে আর্টস এ টিকনিক দ্যু থিয়েটার (এএনএসএটিটি) প্রযোজনায় অনুষ্ঠিত হয়েছে নাটকটি।

‘হি’ অর্থাৎ ‘সে’, যে আর দশটি সাধারণ মানুষেরই একজন, তার ‘জেগে ওঠা’, যাকে আমরা বলি অসাধারণ কর্ম, যে কর্ম তাকে করে তোলে একজন ‘বীরপুরুষ’। এ ধরনের সাহিত্যিক পাঠ একজন সাধারণের অসাধারণ হয়ে ওঠার বিবর্তনকে মূর্ত করে তোলে। বীরপুরুষদের আমরা দেখি প্রবল আত্মবিশ্বাসী রূপে। কিন্তু কেউ তার অন্তর্নিহিত দুর্বলতার কথাটি বলে না, বলে না তার ভঙ্গুর হৃদয়ের কথা, তার ব্যথা ভরা অনিশ্চয়তার অনুভূতি, তার শঙ্কা, তার সংশয়, সিদ্ধান্তহীন দোদুল্যমান দ্বিধার কথা, যার সবকিছুই রয়ে যায় অনুচ্চারিত, সবসময়। যার কাছ থেকে কখনো পালানো যায় না, সে অমোঘ মৃত্যুর ছায়ায় যখন প্রতিনিয়ত পথ চলা, কীভাবে তখন আমরা তাদের ভয়শূন্য ভেবে নিই? কীভাবে পারি ভাবতে?

নিম্মি রাফেলের রচনা ও বিনয় কুমারের নির্দেশনায় হি-রোজ তুলে ধরেছে দুই পৌরাণিক বীরপুরুষের করুণ গাথা—ভগবৎ গীতার অর্জুন ও হোমারের ইলিয়াড হতে অ্যাকিলিস। দুই ভিন্ন সংস্কৃতির দুজন পৃথক ব্যক্তিত্ব ও গৌরব আর ট্র্যাজেডির মধ্যবর্তী সূক্ষ্ম পর্দার যে সীমিত পরিসর, তার প্রকাশ ঘটেছে নাটকটিতে। বীরত্বের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নিরূপণের চেষ্টা হি-রোজ নাটকের প্রাণ ভোমরা। 

মহাভারতের অর্জুন আর ইলিয়াডের অ্যাকিলিসের মতো দুই আদর্শ চরিত্রকে পরস্পরের সমান্তরালে দাঁড় করিয়ে এ নাটক বীরত্বের চিরাচরিত প্রথাবদ্ধ ধারণাকে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়, শৌর্য আর শঙ্কার এ দোদুল্যমান দ্বন্দ্ব টেনে এনে দর্শককে গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করে। অর্জুন ও অ্যাকিলিস উভয়ের জীবনেই, নিয়তি পালন করে এক অমোঘ ভূমিকা এবং তাদের নিজ নিজ অত্যাবশ্যকীয় সিদ্ধান্ত তাতে রেখেছে দূরতম প্রভাব: কোন সে জীবন বেছে নেবেন তারা, এক মহাকাব্যিক নায়কের নাকি একজন সাধারণ মানুষের, ভালোবাসার অন্তরঙ্গ অভিলাষও যেখানে একটি সুপ্ত সম্ভাবনা? তাদের মহাকাব্যিক অভিযাত্রার সবচেয়ে তুঙ্গ মুহূর্তেই নিতে হয় এসব চরম সিদ্ধান্ত।