মহামারী কভিড-১৯-এর কারণে দেশের প্রতিটি ক্ষেত্র সংকটের মুখে পড়েছে। শিল্প-সংস্কৃতিতেও একটা বড়সড় ঝাঁকুনি দিয়েছে নভেল করোনাভাইরাস। প্যানডেমিকের কারণে থিয়েটারকর্মীরা পড়েছেন ঘোর সংকটে। মূলধারার থিয়েটার কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। থিয়েটার হলো জীবন্ত পারফরম্যান্স। এখানে থিয়েটারকর্মী ও দর্শকের শারীরিক উপস্থিতি জরুরি এবং বলা চলে আবশ্যিক। একজন পারফরমারের জন্য দর্শকের প্রতিক্রিয়া জানাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে আগের মতো থিয়েটার শুরু করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই মূলধারার থিয়েটার চর্চা নিয়ে আবারো নতুন করে ভাবতে হচ্ছে সাংস্কৃতিক কর্মীদের। আগামীর থিয়েটার চর্চা কেমন হতে পারে তা নিয়ে অনলাইনজুড়ে চলছে নানা ভাবনাচিন্তা।
৫ জুন দেশ নাটকের উদ্যোগে ‘থিয়েটার: আগামীর নির্দেশনা’ শীর্ষক একটি ফেসবুক লাইভ সেমিনারের আয়োজন করা হয়। এ অনুষ্ঠানে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিশিষ্টজনরা উপস্থিত ছিলেন। আগামীর থিয়েটার চর্চাসহ আনুষঙ্গিক নানা বিষয়ে কথা বলেছেন তারা। ৫ জুন রাত ৮টায় নাট্যকার মাসুম রেজার ফেসবুক পেজ থেকে সরাসরি সেমিনারটি সম্প্রচারিত হয়েছে। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী। সভাপতি ছিলেন দেশ নাটকের দলপ্রধান কামাল আহমেদ। আলোচক হিসেবে নাট্যজন মামুনুর রশীদ, নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু, কামাল বায়েজীদ, মাসুম রেজা ও সামিনা লুত্ফা নিত্রা ফেসবুক লাইভে উপস্থিত ছিলেন।
থিয়েটাকর্মী ফিরোজ আলম ও বন্যা মির্জার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে ‘কভিড-১৯ বাস্তবতায় থিয়েটারের ভবিষ্যৎ বা ভবিষ্যতের থিয়েটার’
শীর্ষক মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন নির্দেশক, নাট্যকার ও অভিনেতা আমিনুর রহমান মুকুল।
প্রবন্ধে ভবিষ্যতের থিয়েটার বলতে কী বোঝানো হচ্ছে, কেমন হবে এর চিত্রটা, থিয়েটারের স্থান পরিবর্তন হবে কিনা, দর্শকদের সতর্কতাসহ নানা বিষয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। বর্তমান প্যানডেমিকের কারণে থিয়েটার চর্চা বদলে যাবে উল্লেখ করে প্রবন্ধে বলা হয়, মূলধারার নাট্যচর্চায় বিরাট ধস নামার আশঙ্ক আছে। নাট্যকর্মীদের অবস্থা শোচনীয় হয়ে উঠবে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে থিয়েটার, পারফরমিং আর্টকে সচল রাখতে হবে।
কিন্তু কীভাবে চলতে পারে এ চর্চা? এক্ষেত্রে প্রবন্ধে কিছু দিকনির্দেশনা তুলে ধরা হয়। যেমন সারা দেশের শিল্পকলা একাডেমিগুলো চালু করা, প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা তৈরি ও বাস্তবায়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ, হলগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, জীবাণুমুক্তকরণে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, নির্দেশনা বাস্তবায়নে ধাপে ধাপে পদক্ষেপ নেয়া, তুলনামূলক কম আসনের হল চালু করা। এক্ষেত্রে শিল্পকলাসহ দেশের যেকোনো জেলার একটি বা দুটি শিল্পকলা একাডেমির হল খুলে প্রথম মাসে পরীক্ষামূলক থিয়েটারের সুবিধা প্রদানের প্রস্তাব করা হয়। একই সঙ্গে এসব নির্দেশনা বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতাগুলো কী তা পর্যবেক্ষণ করে সমস্যা ও সম্ভাবনা খুঁজে বের করা। ধাপে ধাপে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে দ্বিতীয় ধাপে আরো বেশকিছু জেলাকে অর্ন্তভুক্ত করা ও দর্শকদের মধ্যে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা। এভাবে থিয়েটার চর্চাকে অব্যাহত রাখা যাবে বলে প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়।
প্রবন্ধ উপস্থাপনের পর শুরু হয় মূল আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রথমে বক্তব্য রাখেন শিক্ষক, অভিনয়শিল্পী ও নাট্যকার সামিনা লুত্ফা নিত্রা। আগামীর মঞ্চ নির্দেশনা বিষয়ে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তিনি তিনটি ভাগে পরিকল্পনা গ্রহণের কথা বলেন। অবিলম্বে, স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা। তার মতে, আগামী এক মাসে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে যেসব নাট্যকর্মী অর্থ সংকটে আছেন, তাদের দ্রুত অর্থসহায়তা দেয়া দরকার।
স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কয়েকটি প্রস্তাব উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাংস্কৃতিক কর্মীদের প্রযুক্তি প্রণোদনার মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দেয়া প্রয়োজন। এতে তারা অন্যকে শেখানোর মধ্য দিয়ে অর্থ উপার্জন করতে সক্ষম হবেন। তার মতে, এ সময়ের মধ্যে কার্যক্রমটি শুরু করা উচিত।
মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা হিসেবে জানুয়ারি থেকে একাধিক দল একসঙ্গে মিলে শোর বিষয়টি ঠিক করা এবং নাটক শুরুর আগে ব্যবস্থাপনার যে খরচ তা সব দলের মধ্যে ভাগ করে নেয়ার প্রস্তাব দেন সামিনা লুত্ফা।
সরকারি বিধিনিষেধ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিতের কারণে থিয়েটার সচল রাখা কঠিন। তার পরও থিয়েটার চর্চা চালিয়ে যেতে হবে বলে মনে করছেন নাট্যজন নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু। তিনি বলেন, থিয়েটার চর্চা চালিয়ে যেতে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিল্পকলা একাডেমির মাঠ অথবা বাইরে থিয়েটার করতে দিতে হবে। এছাড়া তিনি লেটো, গম্ভীরা, মনসামঙ্গল থিয়েটারের আঙ্গিকের কথা বলে থিয়েটার চালিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দেন। মিউজিকের সঙ্গে একক বা দ্বৈত পারফরম্যান্সের মাধ্যমে এগুলো করা সম্ভব।
থিয়েটার নিয়ে রাষ্ট্রীয় কোনো উদ্বেগ নেই বলে মন্তব্য করেন বিশিষ্ট নাট্যজন মামুনুর রশীদ। তিনি বলেন, থিয়েটার হোক বা না হোক এ নিয়ে কখনই কোনো সরকারের উদ্বেগ ছিল না। থিয়েটার চর্চা চালিয়ে যেতে যে প্রস্তাবনাগুলোর কথা বলা হচ্ছে, সেগুলোর জন্য সরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। মামুনুর রশীদ বলেন, ‘৪৮ বছর ধরে যেভাবে থিয়েটার চলে এসেছে। এখনো চলবে। এর জন্য প্রয়োজন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার।’
এছাড়া আলোচনা অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন নাট্যনির্দেশক মাসুম রেজা, কামাল বায়েজীদ।
এ সময় বক্তাদের মধ্য থেকে অনেকেই আগামী ছয় মাস মঞ্চে না গিয়ে বরং আগামী বছর জানুয়ারি থেকে থিয়েটার কার্যক্রম শুরুর কথা বলেন। এর পাশাপাশি দর্শক ও থিয়েটারকর্মীদের নিরাপত্তার কথা ভেবে একটা প্রটোকল বা ব্যবস্থাপনা তৈরির প্রস্তাব জানান। সাংস্কৃতিক কর্মীদের সৃজনশীলতা ধরে রাখতে এ সময়টায় অনলাইন থিয়েটার করার পরামর্শও দেন অনেকে। অনলাইনে পাঠ, আবৃত্তি, পাচালি এগুলোর মধ্য দিয়েও সময়টাতে নিজেদের সৃজনশীল রাখা যেতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
আলোচনা চলাকালে ঢাকার বাইরে থেকে যুক্ত হন নাট্যজন মলয় ভৌমিক এবং নাট্য সংগঠন যশোর বিবর্তনের সভাপতি সানোয়ার আলম খান দুলু। এ সময় তারা তাদের নিজস্ব মতামত ব্যক্ত করেন।
আলোচনা শেষে সার্বিক বিষয় নিয়ে কথা বলেন শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকি। তিন বা ছয় মাসের মধ্যে যদি থিয়েটার চর্চা শুরু হয়, তাহলে শিল্পকলার পক্ষ থেকে সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দেন তিনি। এ সময় তিনি বিকল্প থিয়েটার কার্যক্রমের ক্ষেত্রেও সহযোগিতার কথা বলেন।










