পরিবর্তন শাশ্বত। সিনেমা শিল্পও এর ব্যতিক্রম নয়। প্রতিনিয়ত পরিবর্তন আসছে এ শিল্পে। আঙ্গিক, নির্মাণ কৌশল, গল্প বয়ান, উপস্থাপন, দৈর্ঘ্য ইত্যাদি বিভিন্ন দিক নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলমান। কভিড অতিমারীর সময় অনলাইন প্লাটফর্ম জনপ্রিয়তার তুঙ্গে পৌঁছে, যা এখনো বজায় আছে। পরিবর্তনের এ ধারাবাহিকতায় মনে করা হচ্ছে, স্বল্প দৈর্ঘ্য ও বাজেটের সিনেমার যুগ শেষ হতে চলেছে। থিয়েটারগুলোর ধারণা, বড় বাজেটের সিনেমাগুলো বেশি ব্যবসা করবে। আবার ওটিটি প্লাটফর্মগুলো বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য গল্পকে লম্বা করার প্রতি জোর দিচ্ছে। এ প্লাটফর্মগুলো এমন সব সিরিজে বিনিয়োগ করতে ইচ্ছুক, যেগুলো তাদের বেশি বেশি ভিউ এনে দেবে। দুই ঘণ্টার সিনেমার চেয়ে একটি সিরিজ নির্মাণ তাদের জন্য বেশি আকর্ষণীয়।
তবে এ থিয়েটার ও ওটিটির এসব ধারণার প্রতি বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন অনেক প্রযোজক। আগে যারা হিন্দি সিনেমায় জমজমাট ব্যবসা করেছেন, তারা বর্তমানে থিয়েটারের জন্য নির্মিত আঞ্চলিক ভাষার সিনেমাগুলোর দিকে ঝুঁকে পড়ছেন। তারা মালয়ালম সিনেমার ওপর বড় বাজি ধরছেন। আঞ্চলিক এসব ইন্ডাস্ট্রির নির্মাতারা স্বতন্ত্র। তাদের তারকাদের পেছনে যে অর্থ ব্যয় করতে হয়, তা বলিউডের একটি সিনেমার প্রমোশন করতে যে বাজেট দরকার, তার ভগ্নাংশ মাত্র। ইউডলি ফিল্মসের কর্ণধার প্রযোজক সিদ্ধার্থ আনন্দ কুমারের মতে, মুম্বাই সিনেমার বাজেট এখন এতটাই বড় হয়ে গেছে যে তা যুগের চাহিদার সঙ্গে বেমানান। আবার ওয়েব সিরিজের প্রতি ওটিটি প্লাটফর্মগুলোর দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন আসছে। তারা প্রযোজকদের কপিরাইট দেবে না। তারা আরো বেশি এপিসোড দাবি করবে এবং বাজেটকে আরো যৌক্তিক করবে। এমনকি তারা পরিচালকের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করতে পারে, যেমনটা টিভি শোয়ের ক্ষেত্রে কর্তাব্যক্তিরা করে থাকেন। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সিদ্ধার্থ কুমারের মত প্রযোজকরা নিজেদের নতুন ক্ষেত্র আবিষ্কার করে বেশ উৎফুল্ল। এ পালে হাওয়া দিয়েছেন দর্শক, যারা মৌলিক ও শেকড় সন্ধানী কাজে আগ্রহী।
প্রযোজকদের বিরক্তির আরো একটি কারণ হলো বলিউড তারকাদের দাবি করা বিপুল অংকের পারিশ্রমিক। সিনেমা মানবীয় আবেগ দ্বারা প্রভাবিত হয়। আর এক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন পুরুষ তারকারা। সিনেমার গল্প, পারিশ্রমিক, এমনকি নারী সহকর্মীও এ অভিনেতারা নির্ধারণ করেন। সাম্প্রতিক একটি সাক্ষাৎকারে হৃতিক রোশন এটি স্বীকার করেছেন যে, একজন তারকার জন্য কাজটি সুখকর নয়। অন্যান্য ইন্ডাস্ট্রিতে তাদের সমসাময়িক সিনিয়ররা যা করছেন, তা থেকে তাদের শিক্ষা নেয়ার আছে। যেমন মোহনলাল পৃথ্বীরাজের পরিচালনায় লুসিফার সিরিজে অভিনয় করেছেন অথবা লোকেশ কানাগারাজের বিক্রম সিনেমায় ফাহাদ ফাসিল ও সুরিয়ার সঙ্গে কমল হাসান পর্দা ভাগ করতে দ্বিধা করেননি। বলিউডেও এর লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। যশরাজ ফিল্মের স্পাই ইউনিভার্সের পাঠান সিনেমায় টাইগারের ক্যামিও ও টাইগার থ্রিতে পাঠানের ক্যামিও দেখা যাবে। এ ধরনের সমন্বয়ের ক্ষেত্রে এটি ভালো একটি সূচনা।
তবে তারকাদের পারিশ্রমিকের ক্ষেত্রে আরো যৌক্তিক হতে হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। একটি বড় বাজেটের বলিউড সিনেমার প্রচার করতেই ৪০ কোটি রুপির বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বিশাল বহরের খরচ। সব মিলিয়ে বাজেটটি এতটাই অযৌক্তিক হয় যে তা একটি সিনেমাকে ডোবাতে পারে। এমনকি করণ জোহর সম্প্রতি বলেছেন, এ নিয়ে একটি বিভ্রম কাজ করে। আর বিভ্রম হলো এমন একটি অসুখ, যার কোনো প্রতিষেধক নেই। তিনি বলেন, ‘‌এ কথা বলার জন্য আমাকে হত্যা করা হতে পারে, কিন্তু যদি বলি, আপনি ৫ কোটি টাকায় কাজ শেষ করতে পারেন অথচ আপনি আমার কাছে ২০ কোটি টাকা দাবি করেন, সেটা কি ঠিক?’ এর সমাধান হলো আরো বেশি তারকা তৈরি করতে হবে। সেক্ষেত্রে অনেক বেশি সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হবে। অথবা ভালো গল্প লিখতে হবে, যেখানে তারকার প্রয়োজন নেই।

সূত্র: ওপেন ম্যাগাজিন