বিশ্ব চলচ্চিত্রের যেকোনো আলোচনায় যে ক’জন পরিচালকের নাম শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হয়, তাদের ভেতর রিডলি স্কট অগ্রগণ্য। ইংরেজ এ পরিচালক স্বীয় মেধার বদৌলতে অর্জন করে নিয়েছেন চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট সবার সম্মান।৷ পরিচালনা করেছেন ব্লেড রানার (১৯৮২), কিংডম অব হ্যাভেন (২০০৫), আমেরিকান গ্যাংস্টার (২০০৭), বডি অব লাইজ (২০০৮) ও গ্ল্যাডিয়েটরের (২০০০) মতো সিনেমা। এমন কিংবদন্তির ফিল্মোগ্রাফিতে কয়েকটি সিনেমা লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে যাবে এটাই স্বাভাবিক। এমনই একটি সিনেমা হলো ২০০১ সালের ম্যাচস্টিক মেন। এরিক গার্সিয়া রচিত একই নামের উপন্যাসের ওপর ভিত্তি করে লেখা হয়েছে এর চিত্রনাট্য।
সিনেমার প্রারম্ভে আমরা দেখতে পাই রয় ওয়ালারকে (নিকোলাস কেইজ)। যে একই সঙ্গে টরেট সিন্ড্রোম ও ওসিডিতে আক্রান্ত। শারীরিক আর মানসিক সমস্যা তার কাজের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। রয়ের দিন কাটে তার সঙ্গী, শিক্ষানবিশ ফ্র্যাঙ্ক মার্সারের (স্যাম রকওয়েল) সঙ্গে। দুজনে মিলে ছোটখাটো জালিয়াতি করে তারা জীবিকা নির্বাহ করে। বাকিরা রয়ের কাজকে স্রেফ জালিয়াতি মনে করলেও সে নিজেকে ভাবে একজন শিল্পী। গর্বের সঙ্গে এও বলে যে সে কারো কাছ থেকে জোর করে টাকা আদায় করেনি। বরং সবাই সানন্দে তার হাতে টাকা তুলে দিয়েছে।
একদিন সকালে ভুল করে রয় তার ওষুধ রান্নাঘরের বেসিনে ফেলে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে আতঙ্কের স্রোত এসে গ্রাস করে তাকে। আতঙ্কের প্রবলতা আরো বেড়ে যায় যখন সে জানতে পারে তার ডাক্তার শহর ছেড়ে চলে গেছে। এমতবস্থায় তার অসুখের প্রকোপ আরো বাড়ে এবং ফ্র্যাঙ্ক বারবার ফোন করেও তাকে পায় না। এ নিয়ে জটিলতা চলতে থাকে।
এক পর্যায়ে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ক্লাইন রয়কে জানায় যে অ্যাঞ্জেলা (অ্যালিসন লোহম্যান) নামে তার ১৪ বছর বয়সী একটি মেয়ে আছে। অনেকক্ষণ দোটানায় ভুগলেও রয় শেষ পর্যন্ত অ্যাঞ্জেলার সঙ্গে দেখা করতে রাজি হয়। মেয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ রয়ের প্রাণ ভরিয়ে দেয়, জীবনের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়। জীবনকে সে উপভোগ করতে আরম্ভ করে।
ফ্র্যাঙ্ক তাকে অনেকদিন ধরে একটি বড়সড় দান মারার কথা বলছিল। এজন্য চাক ফ্রেশেট (ব্রুস ম্যাকগিল) নামে একজন টার্গেটও ঠিক করে রেখেছিল সে। কিন্তু রয় কিছুতেই রাজি হচ্ছিল না। মেয়েকে কাছে পেয়ে ফ্র্যাঙ্কের প্রস্তাবে সে সানন্দে রাজি হয়ে যায়।
কিন্তু মানুষ ভাবে এক আর বাস্তবে ঘটে তার ঠিক পুরোপুরি উল্টো। মেয়ের আগমন, বড় দান মারার প্ল্যান আর নিজের অসুস্থতা মিলে রয়ের জীবনে কী হয়, সেটি জানতে হলে দেখতে হবে ম্যাচস্টিক মেন।
সিনেমা হিসেবে ম্যাচস্টিক মেনের সফলতার জন্য প্রথমত কৃতিত্ব যাবে এর কুশীলবদের কাছে। রয় চরিত্রটি নিকোলাস কেইজ অভিনীত সেসব সেরা চরিত্রগুলোর একটি, যেটি নিয়ে খুব একটা আলাপ-আলোচনা হয় না। টরেট সিন্ড্রোমের ফলে হওয়া শারীরিক সমস্যা ও ওসিডির ফলে সৃষ্ট মানসিক জটিলতা প্রকাশে তিনি সমানভাবে সাবলীল। দায়িত্ব ছেড়ে পালাতে চাওয়া একজন ব্যক্তির যত্নশীল বাবায় রূপান্তর হওয়া, পিতৃত্বকে উপভোগ করার ব্যাপারেও তার অভিনয় নজর কাড়বে দর্শকের। আবার নিজের জীবনবোধ আর অভিজ্ঞতালব্ধ শিক্ষার প্রতিফলনও দেখা যায় তার চরিত্রের অভিব্যক্তিতে।
বয়ঃসন্ধিকালীন দস্যিপনা, বিদ্রোহী মনোভাব বা বিচ্ছেদ হয়ে যাওয়া বাবা-মায়ের সন্তান হওয়ার যাতনা প্রকাশে অ্যালিসন লোহম্যানের অভিনয়শৈলীর দক্ষতা অনন্য। স্যাম রকওয়েল, ব্রুস অল্টম্যান বা ব্রুস ম্যাকগিলকে পর্দায় তুলনামূলকভাবে কম দেখা গেলেও বরাবরের মতোই নিজেদের চরিত্র রূপায়ণে তারা অসাধারণ। রকওয়েলের ফ্র্যাঙ্ক যেন আপনার বন্ধু বা অনুজ আর অল্টম্যানের ক্লাইন যেন আপনার অগ্রজ বা পিতা।
সিনেমাটোগ্রাফি জন ম্যাথিসনের। রিডলির সঙ্গে আগেও কাজ করেছেন। এবারো তার কাজ বরাবরের মতোই ভালো। অন্যদিকে সংগীতায়োজনে ছিলেন হ্যান্স জিমার। তাকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেয়ার কিছু নেই।
১১৬ মিনিট দৈর্ঘ্যের ম্যাচস্টিক মেনকে ডার্ক কমেডি, ক্রাইম এমনকি থ্রিলার বলা চলে। এ বিষয়ক সিনেমার চেনা পরিচিত সব উপাদান এখানে উপস্থিত। তবে এমন খটখটে বা নিদারুণ প্রেক্ষাপটে রিডলি স্কট মানবীয় বিষয়গুলো তুলে আনলেন। পিতা-কন্যার চিরসবুজ সম্পর্ককে পর্দায় তুলে ধরেছেন। নিকোলাস কেইজ ও অ্যালিসন লোহম্যানের সম্পর্কের রসায়নকে সজীবতার সঙ্গে ক্যামেরাবন্দি করেছেন। এসবের জন্য তিনি আলাদা বাহ্বা পেতেই পারেন। একই সঙ্গে সিনেমাটি তার বহুমুখী প্রতিভাকে আরো একবার দর্শকের সামনে ফুটিয়ে তোলে। এখানে এমন একটি নিকষ পরিবেশে এ ধরনের সম্পর্কের কথা সিনেমার শুরুতে কেউই ভাবেনি।










