সিনেমার দর্শকের সবসময়ই আগ্রহ গানের প্রতি। বিশেষত উপমহাদেশের সিনেমা ও তার দর্শকের ক্ষেত্রে এ কথা সত্য। অনেক সিনেমার ক্ষেত্রেই গল্প ও অভিনয়কে ছাপিয়ে যায় এর গান। আর গানের কারণেই কিছু সিনেমা এগিয়ে থাকে। সে ধারায় ভারতীয় সিনেমায় অনেক এগিয়ে থাকেন মণি রত্নম। তবে তার সিনেমায় কেবল গান নয় গল্প, অভিনয় ও পরিচালনাও অসাধারণ। তার সিনেমার গানগুলো হয় অন্য মাত্রার। সংগীত হিসেবে তা উঁচু মানের। এক্ষেত্রে তিনি সঙ্গে পেয়েছেন বা নিজের সিনেমায় রাখতে পেরেছেন তার সময়ের সেরা সংগীতকারদের। তামিল সিনেমার গান তাই গুঞ্জরিত হয়েছে উপমহাদেশের অন্যান্য দেশেও।
শেষ থেকেই শুরু করা যাক। মণি রত্নম পরিচালিত সর্বশেষ মুক্তি পাওয়া সিনেমা ‘পোনিয়িন সেলভান’। দুই পর্বে তিনি নির্মাণ করেছেন মহাকাব্যিক এ সিনেমা। সংগীত পরিচালনা করেছেন এআর রহমান। তুলনামূলক কমই আলোচিত হয়েছে সিনেমাটি। এ নিয়ে নানা কথাও হয়েছে। তার মধ্যেও ‘আগা নাগা’ গানটি প্রশংসিত। মণি পরিচালিত বহু সিনেমায়ই সংগীত করেছেন এআর রহমান। গান গেয়েছেন সময়ের জনপ্রিয় ও গুণী শিল্পীরা।
সেটা তো অনেক সিনেমায়ই নির্মাতারা করেছেন। মণির একটি বিশেষত্ব, তিনি গানের মধ্যেই গল্পকে এগিয়ে নেন। পোনিয়িন সেলভান সিনেমারই গান ‘রাতচাসা মামানে’। গানটি সিনেমার গল্প এগিয়ে নেয়। কেমন করে সে কাজটি করা যায়, রাতচাসা মামানে তার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এ গানের মাধ্যমে পালায়ারিকে পরিচয় করানোর পাশাপাশি কুন্দ ও ভানিদিয়াদেবের মধ্যে সম্পর্কের রসায়নও তৈরি হয়। এতে লাভ কী? বলা হয়ে থাকে, বলিউড ও ভারতীয় সিনেমায় গানের কারণে সিনেমার রানটাইম বেড়ে যায়। কিন্তু মণি তার সিনেমায় এ গানকে এমনভাবে ব্যবহার করেছেন, যেখানে গানের মধ্যে দিয়ে কল্কি কৃষ্ণমূর্তির বইয়ের ১০০ পৃষ্ঠার গল্প ৫ মিনিটে বলা সম্ভব হয়েছে।
সিনেমার গানের সংযুক্তি নিয়ে পিটার ওয়েবারের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে মণি বলেন, ‘আপনি যখন নাচ ও গানকে সিনেমারই একটা অংশ হিসেবে বিবেচনা করেন, তখন কাজটা সহজ হয়ে যায়। আর ভারতীয় সিনেমাকে বিশেষ করে তোলে নাচ ও গান। কেননা গানের মাধ্যমে আনন্দ বা দুঃখ যতটা সহজ ও সুন্দর করে প্রকাশ করা যায়, তা একটি সাধারণ দৃশ্যের মাধ্যমে হয় না।’
মণি রত্নম আরো মনে করেন, গান আসলে একজন পরিচালককে মুক্তভাবে চিন্তা করার পাশাপাশি তা কাজে পরিণত করারও সুযোগ দেয়। তিনি কোনো নিয়ম মানতে তখন আর বাধ্য থাকেন না। এছাড়া ভারতের সংস্কৃতির সঙ্গেও বিষয়টি একটা মেলবন্ধন তৈরি করে। এ নিয়ে মণি বলেন, ‘আমার মনে হয় ভারতের সংস্কৃতির সঙ্গেও এর যোগ আছে। এখানে সংস্কৃতির একটা মৌখিক রীতি ছিল। যেকোনো মহাকাব্য, এমনকি গল্পও প্রচার হয়েছে মুখে মুখে, সুরে সুরে। এসব শুনেই আমরা বড় হয়েছি।’
মণি তার সিনেমার সিচুয়েশনের সঙ্গে গানের মিল রাখেন খুব সুন্দরভাবে। ‘আলাইপায়োথি’র ‘এভানো অরুভা’র উদাহরণ দেয়া যায়। এ গানে শক্তিকে খুঁজতে বের হয় কার্তিক। এ গানের সংগীতে একাকিত্ব, বৃষ্টি ও সমুদ্রের স্বর যেভাবে আসে তাতে মূর্ত হয় প্রেমিক-প্রেমিকার বিরহ। একমাত্র মেঘদূতেই সম্ভবত এমনভাবে মূর্ত হয়েছিল বিরহ। সিনেমার সে দৃশ্যকে আরো রিয়ালিস্টিক করে তুলেছে তার গান।
‘রাবণ’ সিনেমায়ও আছে এ রকম বেশ কয়েকটি গান। বিরহ নয় কেবল, বিদ্রোহ ও উদযাপনকে প্রকাশ করে গানগুলো। মণির কম আলোচিত সিনেমা ‘কাদাল’। এ সিনেমার ‘মুঙ্গিল টোত্তো’য় প্রেমের উদযাপন যেমন দর্শককে থমাস ও বিয়াত্রিসের প্রেমের কাছে নিয়ে যায় তেমনি ‘আনবিন ভাসালে’র মধ্য দিয়ে প্রকাশ হয় প্রতিবাদ ও দ্রোহ।
মণি রত্নম তার সিনেমা নির্মাণের শুরু থেকেই গানের প্রতি মনোযোগ দিয়েছেন। তাই ‘রোজা’, ‘বম্বে’, ‘দিল সে’ সিনেমার গান এখনো জনপ্রিয়। কিন্তু জনপ্রিয়তার বাইরে গিয়ে সিনেমায় গানের ব্যবহারেও তিনি অনবদ্য।
দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে মাহমুদুর রহমান










