বাংলা চলচ্চিত্র ও সংগীতের কিংবদন্তি খান আতাউর রহমান। খান আতা নামেই বেশি পরিচিত তিনি। স্বাধীন বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির গোড়াপত্তনে অবদান রেখেছেন কিছু গুণী মানুষ। এদের মধ্যে খান আতা একজন। একসঙ্গে অনেক গুণের অধিকারী ছিলেন তিনি। চলচ্চিত্র অভিনেতা, গীতিকার, সুরকার, সংগীত পরিচালক, গায়ক, চলচ্চিত্র নির্মাতা, চিত্রনাট্যকার, কাহিনীকার, বেতার ও টিভির জনপ্রিয় উপস্থাপক ও প্রযোজক ছিলেন খান আতা। এছাড়া একসময় কবিতা, ছোটগল্প, প্রবন্ধ রচনা ও সাংবাদিকতাও করেছেন তিনি। আজ এই গুণী মানুষটির জন্মদিন। খান আতা ১৯২৮ সালের ১১ ডিসেম্বর মানিকগঞ্জ জেলার সিঙ্গাইর উপজেলার রামকান্তপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন গায়ক ও গীতিকার। তার রচিত ও সুরারোপিত পাঁচ শতাধিক আধুনিক, দেশাত্মবোধক, শিশু সংগীত ও বিষয়ভিত্তিক গান আজও সমান জনপ্রিয়। বাংলা গানের আধুনিকতায় তার গান অবদান রেখেছিল। একই সঙ্গে বাংলা সিনেমার উত্তরণেও খান আতার অবদান অনেক।

১৯৬৩ সালে মুক্তি পায় পরিচালক খান আতার প্রথম ছবি ‘অনেক দিনের চেনা’। ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’, ‘সাত ভাই চম্পা’, ‘অরুণ বরুণ কিরণমালা’, ‘জোয়ার ভাটা’, ‘আবার তোরা মানুষ হ’, ‘হিসাব নিকাশ’ ও ‘পরশপাথর’ তার উল্লেখযোগ্য ছবি। ১৯৭৫ সালে ‘সুজন সখী’ সিনেমাটি প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের তিনটি শাখায় পুরস্কৃত হয়। শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকার হিসেবে পুরস্কৃত হন খান আতা। তার সর্বশেষ সিনেমা ছিল ‘এখনো অনেক রাত’।

আতাউর রহমানের ছেলে সংগীতশিল্পী আগুনের সঙ্গে কথা হয় তার বাবা প্রসঙ্গে। খান আতা অভিনীত কোন সিনেমাটি আপনার কাছে সবসময় আলাদা মনে হয়—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‌বাবা অভিনীত প্রথম সিনেমা ‘জাগো হুয়া সাভেরা’। এ সিনেমায় বাবার অভিনয় অনবদ্য ছিল। সিনেমাটা দেখে আমার এটাই মনে আসে যে পঞ্চাশের দশকে এমন সিনেমা নির্মাণ সম্ভব কীভাবে। এছাড়া ‘মনের মত বউ’, ‘এ দেশ তোমার আমার’, ‘কখনো আসেনি’, ‘আবার তোরা মানুষ হ’ সিনেমাগুলোয় বাবার অভিনয় আমাকে মুগ্ধ করেছে।’

১৯৫৮ সালে পাকিস্তানি পরিচালক আখতার জং কারদারের পরিচালনায় ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ অবলম্বনে নির্মিত ছবি ‘জাগো হুয়া সাভেরা’তে মূল ভূমিকায় অভিনয় করেন। এ সিনেমা দিয়েই রুপালি জগতে অভিষেক খান আতার। এ সিনেমায় বিপরীতে ছিলেন তৃপ্তি মিত্র। সিনেমাটির সহকারী পরিচালক ছিলেন জহির রায়হান।

অন্যদিকে খান আতার জন্মদিনকে কেন্দ্র করে পারিবারিকভাবে কোনো আয়োজন করা হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে আগুন বলেন, ‘বাবার জন্মদিন আমরা নিজেদের মতো করে পালন করি। এবারও করব। দুস্থ ও এতিম শিশুদের খাওয়ানো হবে।’

বাবার সঙ্গে সব সন্তানের থাকে হাজারো মধুর স্মৃতি। এর ব্যতিক্রম নয় খান আতাপুত্র আগুন। তাই তো বাবার জন্মদিনে তার সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো নিয়ে নিজেই বললেন, ‘‌আব্বার সঙ্গে আমার হাজারো মধুর স্মৃতি আছে। তিনি একজন অসাধারণ মানুষ ছিলেন। আব্বার সঙ্গে কত সুন্দর সময় কাটিয়েছি, সেসব ভাবলেই মনে হয়, এই তো সেদিনের ঘটনা। আমি ছোটবেলায় খুব দুষ্ট ছিলাম। যে সময়টার কথা বলছি, তখন আমার বয়স পাঁচ থেকে ছয় বছর হবে। ওই সময় আমরা মোহাম্মদপুরের বাসায় থাকতাম। আমি বাসার ইলেকট্রিক সকেটের মধ্যে তারের দুই মাথা ঠুকিয়ে দিয়েছিলাম। এতে করে শর্ট সার্কিট হয়ে পুরো বাসার ইলেকট্রিসিটি চলে গিয়েছিল। ওই সময় হঠাৎ আব্বার ঘর থেকে চিৎকার করে বলে ওঠেন ‘‌‘‌নীলা আগুন কই’’। আব্বা বুঝতে পেরেছিলেন এ কাণ্ড যদি কেউ করে সেটা আগুন। আব্বা যখন দেখলেন যে কাণ্ডটা আমিই করেছি তখন আম্মার দিকে অদ্ভুত এক দৃষ্টি দিয়ে বলেছিলেন, ‘‌‘নীলা, আগুন তো আমাদের ধারণার চাইতেও বেশি দুষ্ট।’’’

১৯৯৭ সালের ১ ডিসেম্বর মারা যান খান আতাউর রহমান। চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে অবদানের জন্য খান আতা বিভিন্ন পুরস্কার পেয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য পাকিস্তান চলচ্চিত্র উৎসব পুরস্কার, নিগার পুরস্কার, মস্কো ও তাসখন্দ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব পুরস্কার, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি পুরস্কার ও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার।