আবার প্রশিক্ষণের সুযোগ সীমিত থাকায় এ আত্মকর্মসংস্থানকারীদের বড় অংশই থেকে গেছে অদক্ষ বা স্বল্প দক্ষ হিসেবে। বিশ্বব্যাংকের এক পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে মোট কর্মসংস্থানের মধ্যে মজুরি বা বেতনের ভিত্তিতে কাজ করছে অর্ধেকেরও কম—৪৭ শতাংশ। বাকি ৫৩ শতাংশের কর্মসংস্থান হয়েছে নিজ বা স্ব-উদ্যোগে। এ আত্মকর্মসংস্থানকারীদের মধ্যে আবার ৯৪ শতাংশই স্বল্প দক্ষতানির্ভর পেশায় নিয়োজিত আছে। উচ্চ দক্ষতাভিত্তিক পেশায় নিয়োজিত আছে মাত্র ৬ শতাংশ। ‘বিল্ডিং হিউম্যান ক্যাপিটাল হয়্যার ইট ম্যাটার্স: হোমস, নেবারস অ্যান্ড ওয়ার্কপ্লেস’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এ পরিসংখ্যান তুলে ধরেছে বিশ্বব্যাংক।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের শ্রমবাজারে আত্মকর্মসংস্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও অধিকাংশ মানুষ ক্ষুদ্র ব্যবসা, কৃষিনির্ভর কাজ, ছোট দোকান, পরিবহন কিংবা অপ্রাতিষ্ঠানিক সেবা খাতে সীমাবদ্ধ রয়েছে। এসব কাজে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, প্রশিক্ষণ এবং পেশাগত দক্ষতার ঘাটতি থাকায় আয় ও উৎপাদনশীলতাও তুলনামূলক কম। কর্মসংস্থানের অভাবে বাধ্য হয়ে স্বল্প মূলধনের অনানুষ্ঠানিক খাতে যুক্ত হচ্ছে তরুণ জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল শিক্ষা এবং আধুনিক কারিগরি সহায়তার অভাব পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। এতে আত্মকর্মসংস্থান বাড়লেও কাঙ্ক্ষিত মানের কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না।
পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকার এখন মানসম্মত কর্মসংস্থানকে প্রাধান্য দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘কর্মসংস্থানকে আমরা সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছি। একই সঙ্গে দক্ষতা উন্নয়ন, টেকনিক্যাল ও ভোকেশনাল এডুকেশন ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছি। সিএসএমই খাতকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি। সরকার বন্ধ থাকা কলকারখানা পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিচ্ছে। একই সঙ্গে অর্থনীতিকে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থাননির্ভর করে তোলার চেষ্টা চলছে। এগুলো আমাদের নির্বাচনী ইশতাহারেই স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল এবং আমরা সে লক্ষ্য বাস্তবায়নে কাজ করছি। আমরা বাংলাদেশের বাস্তবতা থেকেই নীতিনির্ধারণ করছি।’
তিনি আরো বলেন, ‘একই সঙ্গে আমরা কারিগরি দক্ষতার ঘাটতি দূর করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি, যাতে তরুণরা কর্মমুখী দক্ষতা অর্জন করতে পারে। পাশাপাশি বিদেশে দক্ষ শ্রমশক্তি পাঠানোর বিষয়েও আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি। সব মিলিয়ে একটি সমন্বিত ও বিস্তৃত কর্মপরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু কর্মসংস্থান তৈরি করতে হলে আগে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠন জরুরি। কারণ অর্থনীতির চাকা সচল হলেই নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। আর এজন্য বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। সে লক্ষ্যেই আমরা বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছি, বন্ধ শিল্প-কারখানা চালুর উদ্যোগ নিচ্ছি এবং বিভিন্ন ধরনের অর্থায়ন প্যাকেজ নিয়ে কাজ করছি। পাশাপাশি আর্থিক নীতির মাধ্যমে অর্থনীতিকে সহায়তা দেয়ার উদ্যোগও নেয়া হচ্ছে।’
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে উঠে আসে, বাংলাদেশে বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিতদের মধ্যে কাজ করতে করতে শেখার সুযোগ অনেক কম। এখানে মোট কর্মীর ৭০ শতাংশেরই কর্মস্থলে শেখার সুযোগ খুবই সীমিত। অথচ নিম্ন আয়ের অর্থনীতিকে উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারায় টেকসইভাবে নিয়ে যেতে হলে শ্রমশক্তিকে দক্ষ করে তোলার বিকল্প নেই। এজন্য কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার সম্প্রসারণ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ ঋণ সুবিধা, প্রযুক্তিভিত্তিক প্রশিক্ষণ এবং নারীদের দক্ষতা উন্নয়নে বিশেষ উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও আত্মকর্মসংস্থানে নিম্ন দক্ষতার আধিক্য দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের প্রতিযোগী সক্ষমতাকে কমিয়ে দিতে পারে। দেশের বর্তমান বাস্তবতায় প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে না পারলে দক্ষতানির্ভর আত্মকর্মসংস্থান বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিতে হবে। উদীয়মান অর্থনীতিকে এগিয়ে নেয়ার পাশাপাশি টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিতে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। শিল্পায়ন ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শ্রমবাজার সংস্কার না হলে তরুণদের বড় অংশ নিম্ন আয়ের কাজেই আটকে থাকবে। দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকার, বেসরকারি খাত এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। একই সঙ্গে প্রশিক্ষণ ও উদ্ভাবনী উদ্যোক্তা সহায়তা বাড়ানো গেলে আত্মকর্মসংস্থানের মান ও আয় দুটোই বাড়বে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশে কাজের সুযোগের অভাবই অনেক মানুষকে আত্মকর্মসংস্থান বা অনানুষ্ঠানিক পেশায় যেতে বাধ্য করছে। জীবিকার তাগিদে অদক্ষ কিংবা স্বল্পদক্ষ শ্রমিকরা নানা ধরনের ছোটখাটো কাজে যুক্ত হচ্ছেন। এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি বড় দুর্বলতা। কারণ পর্যাপ্ত মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়ায় মানুষ বাধ্য হয়ে টিকে থাকার জন্য যেকোনো কাজ বেছে নিচ্ছে। এমনকি উচ্চশিক্ষিত অনেক মানুষও রিকশা চালানো, পিয়নের কাজ বা ব্যাংক টেলারের মতো তুলনামূলক কম দক্ষতার পেশায় যুক্ত হচ্ছেন। দেশের শ্রমবাজারে দীর্ঘদিন ধরেই অপ্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের আধিপত্য রয়েছে। কভিড-১৯ মহামারীর পর এ প্রবণতা আরো বেড়েছে, বিশেষ করে কৃষি খাতে। এরপর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট, মূল্যস্ফীতি ও নানা আন্তর্জাতিক অস্থিরতার কারণে ২০২২ সালের পর থেকে অর্থনীতি কার্যত ধীরগতিতে চলছে। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান সংকটের পেছনে চাহিদা ও সরবরাহ—দুই দিকেই সমস্যা রয়েছে। একদিকে শিল্প ও উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ স্থবির হয়ে আছে। ফলে যোগ্যতা অনুযায়ী ভালো ও স্থিতিশীল চাকরির চাহিদা তৈরি হচ্ছে না। অন্যদিকে দক্ষ শ্রমিক তৈরির ক্ষেত্রেও বড় ঘাটতি রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং শ্রমবাজারের বাস্তব চাহিদার মধ্যে বড় ধরনের দূরত্ব রয়েছে। টেকনিক্যাল ও ভোকেশনাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনবল সরবরাহ করতে পারছে না। এ ব্যবধান কমাতে না পারলে দক্ষ কর্মসংস্থান বাড়ানো কঠিন হবে। আর দক্ষতা বাড়াতে হলে প্রয়োজন কাঠামোগত সমস্যা সমাধান, যা অর্থনীতি, উৎপাদনশীলতা ও টেকসই কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজন।’
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৮৪ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ মানুষ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করছেন। বিগত এক দশকে আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রয়াস থাকলেও তা এগিয়েছে অত্যন্ত ধীরগতিতে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে অপ্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের হার ৯২ শতাংশের ওপরে, যেখানে কৃষিনির্ভর কর্মকাণ্ডই মূল চালিকাশক্তি।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) চলতি মাসে প্রকাশিত ‘লাইফলং লার্নিং অ্যান্ড স্কিলস ফর দ্য ফিউচার’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিতদের ওপর জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে, এর আওতাধীন কর্মীদের ৯৩ দশমিক ৪ শতাংশই গত তিন বছরে একদিনের জন্যও কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ পাননি। যদিও কর্মভিত্তিক প্রশিক্ষণের প্রয়োজন ও চাহিদা অনুধাবন করতে পেরেছেন ৫০ শতাংশ। কর্মভিত্তিক প্রশিক্ষণের অভাবেই কাজের পর্যাপ্ত সুযোগ পাচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন তারা। আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক—সব ধরনের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেই এ সমস্যা প্রকট।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) অধ্যাপক মোহাম্মদ মনিনুর রশিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের দেশে উচ্চশিক্ষা শেষে যখন কেউ কাঙ্ক্ষিত চাকরি পায় না, তখন নিজ উদ্যোগে কর্মসংস্থান বেছে নিচ্ছে। আবার দেখা যায়, একজন কৃষি না পড়ে কৃষি কাজ করছে। আবার আরেকজন কৃষিতে হাতেকলমে শিক্ষা নিয়ে অন্য কাজ করছে। সেখানে তো দক্ষতার ঘাটতি অবশ্যই হবে। এ অবস্থায় প্রয়োজন একটি শ্রমশক্তি পরিকল্পনা। সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত দেশের সামগ্রিক শ্রমশক্তির একটি পূর্ণাঙ্গ মানচিত্র তৈরি করা। কোন খাতে কত মানুষ কাজ করছে, কতজন দক্ষ, অদক্ষ ও মধ্যম দক্ষ শ্রমিক রয়েছে, আগামী ১০-২০-৩০ বছরে কোন খাতে কত জনবল প্রয়োজন হবে—এসব নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে কোন নতুন খাত তৈরি হতে পারে, বর্তমান খাতে কত মানুষ অবসরে যাবে এবং নতুন কত মানুষ যুক্ত হবে—সেটিও প্রক্ষেপণ করতে হবে। ডাক্তার, নার্স, শিক্ষক, প্রকৌশলী কিংবা জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ার—কোন খাতে কত জনবল লাগবে, তার বৈজ্ঞানিক পূর্বাভাস ছাড়া আধুনিক অর্থনীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোনো সম্ভব নয়।’
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, আত্মকর্মসংস্থানের প্রবণতা উচ্চ আয়ের তুলনায় নিম্ন ও নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশগুলোয় বেশি। ভারতে মোট কর্মীর ৭৪ শতাংশ আত্মকর্মসংস্থানে যুক্ত। ভুটান, শ্রীলংকা ও পাকিস্তানে এ হার যথাক্রমে ৮৫, ৮৮ ও ৯৫ শতাংশ। নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোর মধ্যে এ হার সবচেয়ে কম আফ্রিকার নাইজেরিয়ায়—৬৬ শতাংশ।










