সে জলাধারটি এখন প্লাস্টিক, গৃহস্থালি বর্জ্য ও নর্দমার পানিতে মৃতপ্রায়। কোথাও কোথাও পানির রঙ কালচে হয়ে গেছে, ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধও। দিন দিন বাড়তে থাকা দূষণে সংকটাপন্ন হয়ে উঠছে বনানী লেকের পুরো জলজ বাস্তুতন্ত্র।

গুলশান সোসাইটি মসজিদের বিপরীত পাশে বনানী লেকের এক প্রান্ত। সেখানে দাঁড়াতেই দেখা যায় বিশাল বড় পাইপ দিয়ে অনবরত নোংরা পানি আসছে। এখান থেকে শুরু হয়ে পুরো বনানী লেকেই বেশকিছু বড় বড় পাইপ দেখা যায়, যেগুলো দিয়ে বর্জ্য আসার দৃশ্য চোখে পড়ে। আর লেকের পানির ভেতরে দেয়া হয়েছে আবাসিক এলাকার সুয়ারেজ বর্জ্যের লাইন। বছরের পর বছর এভাবেই বর্জ্যে সংকটাপন্ন হয়ে উঠেছে বনানী লেক।

২০০১ সালে পরিবেশ অধিদপ্তর বনানী লেকটিকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) হিসেবে ঘোষণা করে। কোনো এলাকার প্রাণবৈচিত্র্য যখন চরম হুমকির মুখে পড়ে, তখনই সেটিকে ইসিএ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। এ ধরনের এলাকা এতটাই সংবেদনশীল যে অন্যান্য পরিবেশগত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার চেয়ে আলাদা করে গুরুত্ব দিতে হয়। কিন্তু আড়াই দশকে বনানী লেক ধ্বংস হয়েছে আরো বেশি। এটি এখন আর লেক কিংবা নগর জলাশয় নয়, বরং বনানী, মহাখালীসংলগ্ন এলাকার সুয়ারেজ বর্জ্যের ডাম্পিং জোনে পরিণত হয়েছে। এটি পরিবেশ আইনে অপরাধ বলে মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. জিয়াউল হক বলেন, ‘‌প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা সাধারণ এলাকার মতো নয়। গুলশান-বনানী লেকের শ্রেণী পরিবর্তন করা যাবে না। এটা ভরাট করার সুযোগ নেই। এখানে নতুন করে কোনো বর্জ্য ফেলাও যাবে না। বাণিজ্যিকভাবে পরিবেশ নষ্ট করে মাছ চাষ করার ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ আছে। এ লেকে যে সোর্স থেকেই সুয়ারেজ বর্জ্য আসুক না কেন, সেটা অন্যায়। পরিবেশ আইনে অপরাধ।’ গতকাল সরজমিনে ঘুরে দেখা যায়, বনানী লেকের পুরো অংশই সুয়ারেজ বর্জ্যের ডাম্পিং জোনে পরিণত হয়েছে। যে কারণে লেকের পানির স্বাভাবিক রঙ নষ্ট হয়ে গেছে। শুধু তা-ই নয়, লেকে কোনো মাছ কিংবা প্রাণীর চিহ্নও দেখা যায়নি। এছাড়া লেকের দুই পাশ থেকেই বড় বড় পাইপের মাধ্যমে ময়লা ও নোংরা পানি আসতে দেখা যায়। লেকের বাস্তুতন্ত্র ফেরানোর কোনো উদ্যোগ নেই কর্তৃপক্ষের।

Banani_Lake_MAS_08052026_-(3)

গত তিন বছর গুলশান-বনানী লেকপাড়ে বৃক্ষরোপণ করে সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ করছে স্থানীয় কমিউনিটি উদ্যাগ ‘৫৫ কদমতলা’ দল। তাদের একজন পরিবেশ ও জলবায়ু ন্যায়বিচারকর্মী নয়ন সরকার। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আমরা গুলশান-বনানী লেকের দুই পাশে বর্জ্য পরিষ্কার করে পরবর্তী সময়ে বনায়ন করছি। সেখানে ছোট-বড় দেশীয় বৃক্ষরোপণ করছি। গাছগুলো বড় হলেই দেখা যায় সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে লেক পরিষ্কারের নামে আবার তা নষ্ট করে ফেলা হয়। সর্বশেষ গত সপ্তাহে সিটি করপোরেশনের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ভেকু (এক্সক্যাভেটর) এসে লেক থেকে ময়লা তুলে সেটি লেকপাড়েই গাছের ওপরে রাখে। এতে করে আমাদের বনায়নের ৪০০ মিটার স্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শুধু তা-ই নয়, বড় কিছু গাছও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ নিয়ে তিনবার হলো খোদ সিটি করপোরেশন লেক পরিষ্কারের নামে আমাদের গাছ ও বনায়ন কার্যক্রম নষ্ট করেছে।’ গুলশান-বনানী লেক দূষণের বিষয়ে নয়ন সরকার বলেন, ‘এখানে প্লাস্টিক দূষণ ছাড়াও লেকপাড়ের বাড়িগুলোর সুয়ারেজ লাইন সরাসরি লেকে সংযোগ দেয়া। তবে সে লাইনের পাইপগুলো খালি চোখে দেখার সুযোগ নেই, কারণ তা পানির ভেতর দিয়ে দেয়া। এ লেকে ডিওএইচএস, নেভি হেডকোয়ার্টার, ক্যান্টনমেন্টসহ আশপাশ এলাকার তরল বর্জ্যও আসে। ফলে লেকপাড়ে কোনো শিল্প-কারখানা না থাকলেও লেকটি দূষণে জর্জরিত। বিদ্যমান বনায়ন সংরক্ষণ এবং পানিদূষণের উৎস বন্ধে সরকারের অগ্রাধিকার দেয়া উচিত বলে মনে করছি।’

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) এক জরিপে দেখা গেছে, গুলশান, বনানী, বারিধারা ও নিকেতন এলাকার প্রায় ৮৫ শতাংশ বাড়িরই নিজস্ব কোনো পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা নেই। জরিপ করা ৩ হাজার ৮৩০টি বাড়ির মধ্যে ২ হাজার ২৬৫টি বাড়ির পয়ঃবর্জ্য সরাসরি উন্মুক্ত নালা বা লেকে গিয়ে পড়ছে। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি বাড়িতে সেপটিক ট্যাংক থাকার কথা থাকলেও অধিকাংশ মালিক আইন অমান্য করে সংযোগ দিয়েছেন সিটি করপোরেশনের ড্রেনে। এতে বিলাসবহুল এসব এলাকার বাসিন্দারা এখন নিজেদের বারান্দায় বসতে পারেন না। তীব্র গন্ধে সবসময় জানালা বন্ধ রাখতে হয় তাদের।

স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যে লেকটি হতে পারত প্রশান্তির উৎস, সেটি এখন ভাগাড়। লেকপাড় দিয়ে নাক চেপে হাঁটতে হয়। শুধু অভিজাত এলাকা নয়, এ দূষণের প্রভাব পড়ছে পার্শ্ববর্তী বাড্ডা, শাহজাদপুর ও মহাখালী এলাকাতেও।

Banani_Lake_MAS_08052026_-(38)

বনানী সোসাইটির সভাপতি শওকত আলী ভূইয়া (দিলন) বলেন, ‘‌বনানী ও গুলশান লেক হওয়ার কথা ছিল ঢাকা শহরের সবচেয়ে সুন্দর লেক। কিন্তু সেটা না হয়ে এখন লেক হয়ে গেছে দুর্গন্ধ ও মশা উৎপাদনের কারখানা। আমাদের এখানে দুটো লেকপাড় রয়েছে। এর একটি ১৮ নম্বর সড়ক থেকে শুরু হয়ে একেবারে কামাল আতাতুর্ক সড়ক পর্যন্ত। এটা পুরোপুরি অসামাজিক কাজের স্থান ছিল, ছিল অনিরাপদ। আমরা বনানী সোসাইটি গত দেড় বছর পুরো লেকপাড় বাঁশের বেড়া দিয়ে বাগান করেছি। লেকপাড়ের পরিবেশ ঠিক করার চেষ্টা করেছি। এ ব্যাপারে বারবার রাজউক, সিটি করপোরেশনের সঙ্গে কথা বলেছি। সর্বশেষ গত পরশু তারা একটি চিঠি দিয়ে অনুমতি দিয়েছে যে আমরা লেকপাড়ে বাগান করতে পারব। খুব ভালো কথা। আরেকটা জায়গা হলো ন্যাম ভবনের পেছনে। সেখানেও আমরা বড় একটা বাগান করছি।’

তিনি আরো বলেন, ‘‌সম্প্রতি মন্ত্রণালয়ে একটি সভা হয় লেক উন্নয়নের ব্যাপারে। প্রথমবারের মতো সরকার বনানী, গুলশান, বারিধারার সোসাইটিকে লেক উন্নয়ন ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এর আগে লেক নিয়ে কী হতো আমাদের জানার সুযোগ ছিল না। এখন আমাদের সঙ্গে রাজউক একটা চুক্তি সই করবে। তারপর দেখা যাবে কী হয়। এখন এ পর্যন্তই এগিয়েছে।’

বনানী লেকে শুধু গৃহস্থালি বর্জ্য কিংবা সুয়ারেজ বর্জ্যই পড়ে না। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে নির্মাণ বর্জ্যও এ লেকেই ফেলা হয়। গতকাল কয়েকটি পয়েন্টে দেখা যায়, ইট-সুরকি ফেলে লেকপাড় অনেকটাই ভরাটের মতো হয়ে গেছে। স্থানীয় পরিবেশকর্মীরা বলছেন, নতুন বিল্ডিং হলে তার বর্জ্য এ লেকে ফেলা হয়। কারো বাড়ি সংস্কার করবে, টয়লেট সংস্কার করবে, বারান্দা সংস্কার করবে—এক কথায় যা-ই করুক না কেন, সব বর্জ্য এ লেকেই ফেলা হয়। যে কারণে এটি এখন আর লেকের বৈশিষ্ট্য নিয়ে টিকে নেই।’

বনানী লেক নিয়ে সরকার নতুন উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানিয়েছেন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘বনানী লেকে সব জায়গা থেকেই বর্জ্য আসে। নেভি সদর দফতর থেকে আসে। ক্যান্টনমেন্ট থেকে আসে। মহাখালী থেকে আসে। কড়াইল বস্তি থেকে আসে। বনানীবাসীরও বর্জ্য আসে। আলাদা সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট নির্মাণ করা পর্যন্ত আসলে এর কোনো সুষ্ঠু সমাধান হবে না। পাশাপাশি বনানী লেকের পানি প্রবহমান থাকতে হবে। নয়তো কিছুই সম্ভব হবে না। এখন সরকার উদ্যোগ নিয়েছে আলাদা একটি লাইন করে এসব বর্জ্য সরাসরি দাশেরকান্দি ট্রিটমেন্ট প্লান্টে নিয়ে যাওয়া হবে। এটা করতে দুই বছর লাগবে। দাশেরকান্দিতে যদি এসব এলাকার বর্জ্য যায়, তাহলে বনানী লেকের পানি আর নষ্ট হবে না, আবার প্রবাহ ঠিক থাকবে।বাস্তুতন্ত্রও ফিরে আসবে।’

তবে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের বাইরেও স্বল্পমেয়াদি সমাধানের কথাও বলছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।

নগর পরিকল্পনাবিদদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌বনানী লেকের অবস্থা খুবই খারাপ। এখানে সুয়ারেজ বর্জ্যের সঙ্গে গৃহস্থালি বর্জ্যও ফেলা হয়। সুয়ারেজ লাইন না হলে লেকে বর্জ্য ফেলা বন্ধ হবে না এটা যেমন ঠিক, একই সঙ্গে বছরের পর বছর লেকটিকে এভাবে বর্জ্যের ভাগাড় হিসেবে ফেলে রাখারও কোনো মানে হয় না। বিকল্প সমাধান আছে। প্রতিটি বাড়িতে অন সাইট সেপটিক ট্যাংক বা সোকওয়েল নির্মাণ করতে হবে। এটা খুব খরচের ব্যাপার না। আবার জায়গাও লাগে না। কিন্তু এটা করলে পয়ঃবর্জ্যটা সরাসরি লেকে যাবে না। ট্রিটমেন্ট হয়ে যাবে। তাহলে লেকের অবস্থা ভালো হবে। সাবেক একজন মেয়র উদ্যোগ নিয়েছিলেন, কিন্তু সে উদ্যোগ পরবর্তী সময়ে থেমে যায়।’