গতকাল রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (এনইসি) ভবনে আয়োজিত এডিপি বিষয়ে বর্ধিত সভায় এটি চূড়ান্ত করা হয়। প্রস্তাবিত উন্নয়ন বাজেটে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে। এ দুই খাতে গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বিপরীতে কমেছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বরাদ্দের হার।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা যায়, বর্ধিত সভায় সভাপতিত্ব করেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সভায় প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকিসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে আগামীতে প্রকল্প নেয়ার ক্ষেত্রে সরকারের নির্বাচনী ইশতাহারের ভিত্তিতে পরিকল্পনার নির্দেশ দিয়েছেন মন্ত্রী ও উপদেষ্টা।

সভায় অংশ নেয়া শীর্ষ এক কর্মকর্তা বলেন, ‘২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত এডিপিতে মোট ৩ লাখ ৮ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। থাকছে ১ হাজার ১২১টি প্রকল্প। এসব প্রকল্পে সরকারের নির্বাচনী ইশতাহারে থাকা প্রতিশ্রুতিকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। তবে কয়েকটি প্রকল্পে ইশতাহারের প্রতিফলন না থাকায় অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা সমালোচনা করেন। আগামীতে প্রকল্প প্রণয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেয়ার পরামর্শ দেন।’

পরিকল্পনা কমিশনের সচিব এসএম শাকিল আখতার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আসন্ন এনইসি সভায় কী কী উপস্থাপন করব, সেটা বর্ধিত সভায় পর্যালোচনা করা হয়েছে। সেখানে অর্থমন্ত্রী কিছু স্লাইড সংশোধন ও পরিবর্তন করতে বলেছেন। এ কাজগুলো আমরা সাত-আটদিনের মধ্যে শেষ করব। আগামী ১৮ মে এনইসি সভা অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে প্রধানমন্ত্রী আমাদের এ উন্নয়ন বাজেট অনুমোদন দেবেন।’

পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রস্তুত করা কার্যপত্র অনুযায়ী, মোট ৩ লাখ ৮ হাজার ৯২৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকার প্রস্তাবিত খসড়া এডিপিতে বিনিয়োগ ও সমীক্ষা বাবদ ১ লাখ ৭৮ হাজার ৯১৪ কোটি, কারিগরি সহায়তা ২ হাজার ৭৯৬ কোটি, উন্নয়ন সহায়তা ৩ হাজার ৯৮৫ কোটি, মন্ত্রণালয় ও বিভাগের থোক ৫৯ হাজার ২৭৬ কোটি, কার্যক্রম বিভাগের থোক ৩৮ হাজার ২৭ কোটি এবং সামাজিক উন্নয়ন সহায়তা বাবদ ১৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এছাড়া নিজস্ব অর্থায়ন ৮ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। মোট বরাদ্দের মধ্যে ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা সরকারি অর্থায়ন ও ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণ ও সহায়তা থেকে সংস্থান হবে।

এদিকে প্রস্তাবিত এডিপিতে ১৫টি খাতে বরাদ্দসহ মোট প্রকল্প রাখা হয়েছে ১ হাজার ১২১টি। এর মধ্যে সরকারের বিনিয়োগ প্রকল্প ৯৪৯টি, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রকল্প ২২টি, কারিগরি সহায়তা প্রকল্প ১০৭টি এবং স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা বা করপোরেশনের নিজস্ব অর্থায়নের প্রকল্প থাকবে ৪৩টি। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এডিপিতে বিনিয়োগ, কারিগরি সহায়তা এবং সমীক্ষা মিলিয়ে মোট প্রকল্প ছিল ১ হাজার ১১৩টি। এছাড়া স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা বা করপোরেশনের নিজস্ব তহবিলের ৬০টিসহ মোট প্রকল্প ১ হাজার ১৭৩টি। এবার সরকার বাজেটকে যুগোপযোগী করতে প্রকল্প কমিয়ে এনে খাতওয়ারি বরাদ্দ বাড়িয়েছে।

এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের শীর্ষ এক কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রতিবার প্রকল্প বাড়ানোর প্রতি মনোযোগ থাকলেও এবার সরকার উল্টো পথে হাঁটছে। তবে প্রকল্পের সংখ্যা কমলেও বাড়ছে বরাদ্দ। প্রকল্প যাচাই-বাছাই করেই বিএনপির নির্বাচনী ইশতাহার এবং ৩১ দফার ভিত্তিতে প্রকল্পগুলো যুক্ত করা হয়েছে। বর্তমান সরকার প্রকল্প অনুমোদন ও বরাদ্দ রাখার ক্ষেত্রে কঠোর হয়েছে। কয়েকবার পর্যালোচনা করেই প্রকল্প অনুমোদন দিচ্ছে।’

এদিকে প্রস্তাবিত এডিপিতে গত কয়েক বছরের তুলনায় বাড়ানো হয়েছে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের বরাদ্দ। দেশের অতি গুরুত্বপূর্ণ এ খাত দুটি সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাওয়া পাঁচ খাতের মধ্যে অন্যতম। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে দ্বিগুণ বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। এর মধ্যে শিক্ষায় চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তুলনায় ১৯ হাজার ৩৪ কোটি টাকা বেশি বরাদ্দ রাখা হয়। এ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ রাখা হয় ২৮ হাজার ৫৫৭ কোটি টাকা বা ১২ দশমিক ৪২ শতাংশ। আগামী বাজেটে বরাদ্দ বেড়ে হচ্ছে ৪৭ হাজার ৫৯১ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ১৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ। পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে ১৭ হাজার ৩৮৭ কোটি টাকা। চলতি বছরে বাজেট ছিল ১৮ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা বা ৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ। আগামী অর্থবছরে বরাদ্দ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫ হাজার ৫৩৬ কোটি টাকায়, যা মোট বাজেটের ১১ দশমিক ৮৪ শতাংশ।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বরাদ্দ বাড়ানো হলেও ব্যয়ে পিছিয়ে রয়েছে দুটি খাত। আইএমইডির তথ্যমতে, গত আট মাসে (জুলাই-মার্চ) শিক্ষা খাতে ৩০ থেকে ৩৩ শতাংশ বরাদ্দ বাস্তবায়ন হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতের বাস্তবায়ন ২২ শতাংশেরও কম। ফলে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি সক্ষমতা ও গুণগত মান বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন শিক্ষাবিদরা।

গণস্বাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকারের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বেশি বরাদ্দ দেয়ার ক্ষেত্রে সদিচ্ছা রয়েছে। তবে শুধু বরাদ্দ বাড়ালে হবে না, দেখতে হবে সে বরাদ্দ কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় হচ্ছে। একই সঙ্গে বরাদ্দ বাস্তবায়নের সক্ষমতা আছে কিনা তাও দেখতে হবে। কারণ অতীত অভিজ্ঞতা তিক্ত। আগের অভিজ্ঞতা না পেতে চাইলে পরিকল্পনা করতে হবে সমতাভিত্তিক, মানসম্পন্ন এবং অংশীজনদের অংশগ্রহণের ব্যবস্থা রেখে। আমাদের শিখন পদ্ধতি পরিবর্তনের প্রয়োজন আছে। যারা শিখছেন ও যারা শেখাচ্ছেন (শিক্ষক) উভয়েরই মানোন্নয়ন জরুরি। আমাদের অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রয়োজন আছে কিন্তু তার চেয়ে বেশি প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা। তার জন্য শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যক্রমে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।’

এদিকে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দ্বিগুণ হলেও বিদ্যুৎ ও জ্বালানি এবং পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে বরাদ্দের হার কমেছে। চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে উন্নয়ন বাজেটের ১৪ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ বরাদ্দ থাকলেও আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত এডিপিতে তা ১০ দশমিক ৯০ শতাংশ রাখা হয়েছে। খসড়ায় এ খাতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৩২ হাজার ৬৯২ কোটি টাকা। অন্যদিকে পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে বরাদ্দের হার কমেছে। চলতি অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৫৮ হাজার ৯৭৩ কোটি টাকা, যা মোট উন্নয়ন বাজেটের ২৫ দশমিক ৬৪ শতাংশ। আগামী বাজেটে সে হার নেমে এসেছে ১৬ দশমিক ৭০ শতাংশে। প্রস্তাবিত এডিপিতে খাতটির জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৫০ হাজার ৯৩ কোটি টাকা। এছাড়া গৃহায়ন ও কমিউনিটি সুবিধাবলি খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২০ হাজার ৩৬২ কোটি টাকা।

এদিকে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটে দেশে বেড়েছে তেল ও গ্যাসের দাম। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ আটকে পড়ায় এ দুই পণ্যের দাম বাড়িয়েছে সরকার। ভবিষ্যতে এমন সংকট মোকাবেলায় দেশীয় উৎপাদনে নজর দেয়া হচ্ছে। সম্প্রতি দেশের অন্যতম প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে জ্বালানি লোডিং শুরু হয়েছে। আসন্ন এডিপিতে রূপপুর, মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পসহ কয়েকটি প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বরাদ্দের হার কমার বিষয়ে জানতে চাইলে পরিকল্পনা কমিশনের সচিব এসএম শাকিল আখতার বলেন, ‘বিদ্যুতে ক্যাপাসিটি চার্জসহ অন্যান্য চার্জ কমানো হচ্ছে। দেশে উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে। আমাদের তেল ও গ্যাস—দুটোই দরকার। গ্যাসের জন্য আমরা আগে অনেক অগভীর কূপ খনন করতাম, এখন গভীর কূপ খননের নির্দেশ দেয়া হচ্ছে, যেন গ্যাসের চাহিদা আমরা স্থানীয় উৎস থেকে পূরণ করতে পারি। এ বিষয়ে কয়েকটি জায়গায় সিগন্যালও পাওয়া গেছে। বিদেশ থেকে গ্যাস কিনতে গিয়ে অনেক ডলার বাইরে চলে যায়। এবার নিজস্ব গ্যাস দিয়ে বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়াব। দেশীয় প্রকৌশলী ও দেশীয় উপকরণ দিয়ে উৎপাদন হবে। তখন বিদেশের চেয়ে খরচ কম হবে। সে কথা মাথায় রেখে এবার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বাজেট কম রাখা হয়েছে।’

প্রস্তাবিত এডিপিতে স্বাধীনতার পর এবারই রেকর্ড সর্বোচ্চ ৩ লাখ কোটি টাকা বা তার বেশি বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। এছাড়া প্রথমবারের মতো শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে এত বড় বাজেট রাখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের উন্নয়ন ব্যয়ের বড় অংশ ব্যয় হয়েছে রাস্তা, সেতু, ফ্লাইওভার ও বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে। কিন্তু কর্মসংস্থান, দক্ষতা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে সেই বিনিয়োগের তুলনায় ফল কম এসেছে। ফলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানো ইতিবাচক। তবে এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে বাস্তবায়ন সক্ষমতা ও ব্যয়ের গুণগত মানের ওপর।

বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, ‘শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বাজেট বাড়িয়ে বিদ্যুৎ-জ্বালানিতে কমানোকে যৌক্তিক বলেই দেখছি। তবে এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গুণগত বাস্তবায়নের হার বাড়ানো। পরিচালন ব্যয়ের চেয়ে উন্নয়ন ব্যয় বাড়াতে হবে। টেকসই উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি বাজেটের গুণগত বাস্তবায়ন।’

প্রস্তাবিত এডিপির খসড়ায় ১০ মন্ত্রণালয় ও বিভাগে সর্বোচ্চ বরাদ্দ রেখেছে সরকার। নথি অনুসারে সর্বোচ্চ ৩৩ হাজার ৭৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগের জন্য। এছাড়া সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের জন্য ৩০ হাজার ৭৪১ কোটি, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ ২৬ হাজার ৮০৬, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ ২০ হাজার ৮৩৫, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ১৯ হাজার ৪৪০, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ১৭ হাজার ৪০৪, বিদ্যুৎ বিভাগ ১৪ হাজার ৯৩৯, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ ৮ হাজার ২২০, নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় ৮ হাজার ২০৭ এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জন্য ৯ হাজার ৮৩৩ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।