হঠাৎ করে যশোর অশান্ত হয়ে উঠেছে। গত মে মাসে জেলায় আটজন হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। ঘটেছে ছুরিকাঘাতে হত্যাচেষ্টা, ছিনতাই ও চুরি। গত মাসে এক পৌর কাউন্সিলরকেও হত্যার চেষ্টা হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির এমন অবনতিতে আতঙ্কিত জেলাবাসী।
সুশীল সমাজের নেতারা বলছেন, কিছুদিন ধরে যশোর সদর অনিরাপদ হয়ে পড়েছে। আতঙ্ক বিরাজ করছে শহরজুড়ে। কয়েকদিন ধরে মানুষ রাত ৯টার মধ্যে বাড়িতে প্রবেশ করছে অজানা ভয় নিয়ে। শহরের পাড়া-মহল্লায় গড়ে উঠেছে একাধিক অপরাধী চক্র। যাদের নামে রয়েছে হত্যাসহ একাধিক মামলা। এসব অপরাধী প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের তত্পরতা তেমন দৃশ্যমান নয়। ফলে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে এসব অপরাধী।
বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরে দেখা গিয়েছে, গত মে মাসে জেলায় আটটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। গত ৩ মে কেশবপুরের রামচন্দ্রপুর গ্রামের রিপন হোসেন তার স্ত্রী মেরিনাকে (২২) ছুরিকাঘাতে হত্যা করেন। রিপন যশোর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ছাত্র। তুচ্ছ ঘটনায় কথাকাটাকাটি হলে স্ত্রীকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেন তিনি। ১৬ মে ঝিকরগাছার সোনাকুড় গ্রামের আবদুস সাত্তারের মাল্টার বাগান থেকে সখিনা বেগমের (৪২) মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তার শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন ছিল। তিনি ওই গ্রামের নিয়াম উদ্দিনের স্ত্রী। ওই ঘটনায় একই গ্রামের মিজানকে আটক করে পুলিশ। পরের দিন ১৭ মে সদরের চাঁনপাড়া গ্রামে নূরুল ইসলামের হাতে খুন হন তারই ছেলে রুহুল আমিন (১৫)। জমি নিয়ে বিরোধের জেরে ছেলেকে হত্যার কথা স্বীকার করেন নূরুল। পুলিশ তাকে আটক করে জেলাহাজতে পাঠিয়েছে। ২১ মে সদর উপজেলার সুজলপুর গ্রামের ইরয়ান গাজী (২৫) প্রতিপক্ষের ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত হন। পরের দিন সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। একই এলাকার গোলাম শরিফ, জাকারিয়া, বুদো, নাহিদের সঙ্গে তার বিরোধ ছিল। এরই জেরে সন্ত্রাসীরা তাকে কৃষ্ণবাটি গ্রামে বোন শাহানার
বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে হত্যা করে। ২২ মে সদরের কৃষ্ণবাটি গ্রামের পশ্চিমপাড়ার রাসেল হোসেনের (২৪) গলিত মরদেহ নিজ বাড়ি থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। সর্বশেষ ২৯ মে শহরের নাজির শংকরপুর চাতালের মোড়ে আফজাল হোসেনকে (২৮) কুপিয়ে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। পূর্ব আক্রোশের জের ধরে সন্ত্রাসী ট্যারা সুজনের নেতৃত্বে হামলা চালিয়ে তাকে খুন করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ। এ ঘটনার প্রতিশোধ নিতে ৩০ মে ৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আসাদুজ্জামান বাবলুকে কুড়াল দিয়ে মাথায় কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা করে আফজালের লোকজন। তার অবস্থাও আশঙ্কাজনক।
বাঘারপাড়ার পাইকপাড়ায় চোখ উপড়ে, শ্বাসরোধ ও পুরুষাঙ্গ কেটে নকিম উদ্দিন (৬০) নামে এক শ্রমিককে হত্যা করা হয়েছে। ২৬ মে উপজেলার ছাতিয়ানতলা বাজার থেকে ধান কাটার জন্য নকিম উদ্দিনসহ তিন শ্রমিক ভাড়া করে নিয়ে আসেন বেনজির আহম্মেদ। এর মধ্যে একজন চলে যান। বাকি দুজন শ্রমিক রাতে খাওয়া-দাওয়া শেষ করে কৃষক বেনজিরের বাড়ির এক কক্ষে ঘুমিয়ে পড়েন। সকাল ৬টায় ওই দুই কৃষককে ঘুম থেকে ডেকে তুলতে মালিক (বেনজির) ঘরের দরজায় গিয়ে নকিম উদ্দিনের মরদেহ দেখতে পান। ৩০ মে শহরের কাজীপাড়ায় পাইলিং করতে গিয়ে মাটির নিচে একটি ড্রামের মধ্য থেকে কঙ্কাল উদ্ধার হয়। যশোর কোতোয়ালি থানার অফিসার ইনচার্জ তাজুল ইসলাম জানান, ধারণা করা হচ্ছে বেশ কয়েক বছর আগে মরদেহ ড্রামভর্তি করে জমিতে পুঁতে রাখা হয়েছিল।
যশোর আইনজীবী সমিতির সভাপতি শরিফ নূর মোহাম্মদ আলী রেজা বলেন, আমাদের আইনজীবী আসাদুজ্জামান বাবুলকে হত্যার চেষ্টা হয়েছে। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক। শহরের মানুষ আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে। মাদক ব্যবসায়ী উঠতি সন্ত্রাসীরা বেপরোয়া হয়ে পড়েছে। রাজনৈতিক প্রশ্রয় না পেলে এবং পুলিশ তত্পর হলে এসব সন্ত্রাসী দমন সহজ হবে।
যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শহিদুল ইসলাম মিলন বলেন, উঠতি সন্ত্রাসীরা পরিবেশ বিষিয়ে তুলছে। এদের নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে সামনে আরো খারাপ পরিস্থিতি আসবে। যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফিরোজ কবীর বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়নি। কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে, পুলিশ অপরাধীদের আটকে কাজ করছে। পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।










