কিন্তু শিল্পায়নের গতি ও নগরায়ণের চাপের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গত কয়েক দশকে এখানে গড়ে উঠেছে আরেক বাস্তবতা—পাহাড় কর্তন, নদী-খাল ও সমুদ্র উপকূল দখলের নিরবচ্ছিন্ন প্রতিযোগিতা। একসময় যে পাহাড় ছিল বৃষ্টির পানি ধরে রাখার প্রাকৃতিক বাঁধ, যে খাল-নদী শহরের জলাবদ্ধতা কমাত, আর যে উপকূল ছিল জীববৈচিত্র্যের আশ্রয়; আজ তার বড় অংশই হারিয়ে যাচ্ছে অবকাঠামো আর বাণিজ্যিক প্রকল্পের নিচে। বেসরকারি পর্যায়ের পাশাপাশি চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশ ধ্বংসে নেতৃত্ব দিচ্ছে সরকারি প্রতিষ্ঠানও।

পরিবেশবাদীরা বলছেন, দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মহানগরী হিসেবে চট্টগ্রামে অবকাঠামো উন্নয়নের প্রয়োজনকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে সে উন্নয়ন পরিকল্পনায় পরিবেশকে বরাবরই উপেক্ষা করা হয়েছে। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি বাংলাদেশ রেলওয়ে এবং সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর—এ সংস্থাগুলোর প্রায় সবক’টিই বিভিন্ন সময়ে ছোট-বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। আর এসব প্রকল্পের বড় একটি অংশেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পাহাড় কাটা, প্রাকৃতিক টিলা সমতল করা, খাল ভরাট কিংবা উপকূলীয় এলাকার ভূমি পরিবর্তনের অভিযোগ রয়েছে। একটি পাহাড় গড়ে উঠতে লাগে শতাব্দী, একটি খালের স্বাভাবিক বাস্তুতন্ত্র তৈরি হয় বহু বছরের ধারাবাহিকতায়। অথচ কয়েক মাসের একটি প্রকল্পেই সে ভারসাম্য ভেঙে যায়।

পাহাড় কাটা বা খাল দখলের ছবি গণমাধ্যমে প্রকাশিত কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা হলে নড়েচড়ে বসে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো। অনেক সময় অভিযান চালায় পরিবেশ অধিদপ্তর। ভ্রাম্যমাণ আদালত, জরিমানা কিংবা কাজ বন্ধের নির্দেশ—এসব উদ্যোগ নেয়া হলেও ধ্বংস হয়ে যাওয়া পরিবেশ আর আগের অবস্থায় ফিরে আসে না।

চট্টগ্রাম নগরের প্রধান সড়কের ওপর পণ্যবাহী ও ভারী যানবাহনের চাপ কমাতে সিডিএ নির্মাণ করে বায়েজিদ-ফৌজদারহাট লিংক রোড (সিডিএ অ্যাকসেস রোড)। এ পথ নির্মাণে পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন ছিল ২ লাখ ৫০ হাজার ঘনফুট পাহাড় কাটার। কিন্তু সিডিএ ওই সময়ে প্রায় ১৮টি পাহাড় কেটে ১০ লাখ ৩০ হাজার ঘনফুট মাটি অপসারণ করেছিল। অবৈধ পাহাড় কাটার দায়ে তখন সরকারের এ সংস্থাকে ১০ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছিল।

প্রায় ৯০ ডিগ্রি কোণে পাহাড় কেটে তৈরি সড়কটি এখন চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। উদ্বোধনের পর থেকে প্রতি বর্ষায় কাটা পাহাড়গুলোর বিভিন্ন অংশ ভেঙে পড়ছে সড়কে। নির্দেশনা ছিল সিডিএ নিজ খরচে পাহাড়গুলো ধসে পড়া রোধে পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু পাঁচ বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি।

চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত নির্মিত নতুন রেলপথের এমব্যাংকমেন্টের জন্য লোহাগাড়া, চন্দনাইশ এলাকায় বিপুল পরিমাণ পাহাড় কাটা হয়। ওই সময়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে জরিমানা করা হলেও পাহাড় কেটে মাটি সরিয়ে নেয়া রোধ করা যায়নি। চট্টগ্রাম শহরের অভ্যন্তরে কয়েক বছর আগে রেলের মালিকানাধীন পাহাড় কেটে এক্সপ্রেসওয়ের র‍্যাম্প তৈরির উদ্যোগ নেয়া হলেও পরিবেশবাদীদের সোচ্চার আন্দোলনের মুখে সেটি ভেস্তে যায়। আবার সিআরবি পাহাড়ে বেসরকারি হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগও থেমে যায় শুধু পরিবেশবিদদের আন্দোলনের মুখে। তবে পাহাড় কর্তনসহ বিভিন্ন সময়ে অনুমোদনহীনভাবে শতবর্ষী গাছ কাটার মতো পরিবেশবিধ্বংসী কাজের অভিযোগ রয়েছে রেলওয়ের বিরুদ্ধে।

সম্প্রতি নিজস্ব ভবন নির্মাণের সময় জয় পাহাড়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) বিরুদ্ধে পাহাড় কাটার অভিযোগ ওঠে। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সরজমিন তদন্ত করে পরিবেশ অধিদপ্তর। জয় পাহাড় এস্টেটের ৯ হাজার ৬০০ ঘনফুট কাটার দায়ে গত মঙ্গলবার এক শুনানিতে সরকারি এ সংস্থাকে জরিমানা করা হয়। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন (সংশোধিত ২০১০) অনুযায়ী, প্রতি ঘনফুট ১০০ টাকা হারে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ হয় মোট ৯ লাখ ৬০ হাজার টাকা।

পরিবেশবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চট্টগ্রামের মতো প্রাকৃতিকভাবে সমৃদ্ধ অঞ্চলটির পরিবেশ সুরক্ষায় বড় বাধা হয়ে উঠেছে সরকারি সংস্থাগুলো। এসব সংস্থার কাঠামোতে দক্ষ পরিকল্পনাবিদ না থাকায় শুধু প্রতিষ্ঠানপ্রধানের ইচ্ছায় পরিবেশবিরোধী প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়। তাছাড়া নামমাত্র পরিকল্পনাবিদ নিয়োগ দেয়া থাকলেও তারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন না। আর সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো পরিবেশ ধ্বংসের মতো কাজ বাস্তবায়ন করায় সাধারণ ও প্রভাবশালীরাও এতে উৎসাহিত হয়।

এ বিষয়ে পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের সহসভাপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী সুভাষ চন্দ্র বড়ুয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চট্টগ্রামের সরকারি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাগুলো পাহাড় ধ্বংসসহ পরিবেশ বিনষ্টে অগ্রণী ভূমিকা নিচ্ছে। অথচ সরকারি সংস্থাগুলোই পরিবেশ সুরক্ষায় ওয়াচডগ হওয়ার কথা ছিল। কোনো ধরনের পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (ইআইএ) ছাড়াই শত শত প্রকল্প বাস্তবায়ন করে চট্টগ্রামের মতো অর্থনৈতিক, ভৌগোলিক ও কৌশলগত শহরটিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সরকার কঠোর না হলে, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সামনে থেকে নেতৃত্ব না দিলে পরিবেশের দিক থেকে সমৃদ্ধ চট্টগ্রামকে আর বাঁচানো যাবে না।’

চট্টগ্রামের নগর উন্নয়নে সরকারি প্রতিষ্ঠান সিডিএর নেয়া একাধিক প্রকল্প নিয়ে রয়েছে নানা অভিযোগ। পাহাড় কর্তন, কৃষিজমি ও জলাধার ভরাট করে সংস্থাটি গড়েছে যত্রতত্র আবাসন প্রকল্প। কোনো ধরনের পরিবেশগত মূল্যায়ন ও যথেষ্ট সম্ভাব্যতা যাচাই না করায় সিডিএর নেয়া বিভিন্ন আবাসন প্রকল্প এখনো খালি পড়ে আছে। এমনকি বায়েজিদ সংযোগ সড়ক নির্মাণের সময় পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্দেশনা অমান্য করে ১৮টি পাহাড় কর্তন করায় ওই এলাকার পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই সড়ক নির্মাণে কাটা পাহাড়গুলোর সুরক্ষা ও যথাসম্ভব আগের অবস্থানে ফিরিয়ে আনতে নির্দেশনা থাকলেও সেটি এখনো বাস্তবায়ন করেনি সিডিএ।

জানতে চাইলে সিডিএর চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. নুরুল করিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বায়েজিদ অ্যাকসেস রোড নির্মাণের প্রকল্পটি নেয়া হয়েছে অনেক আগে। প্রকল্প বাস্তবায়নের পর পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে কাটা পাহাড়গুলো সুরক্ষা ও সড়কসংলগ্ন পাহাড়গুলোর পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে আমরা একটি প্রকল্পও হাতে নিয়েছি। এ বিষয়ে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ে সাত-আট মাস আগে একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। সিডিএর নিজস্ব অর্থায়নে নেয়া এ উদ্যোগ অজানা কারণে এখনো অনুমোদন হয়নি। আমরা এখন পরিবেশকে সুরক্ষা দিয়েই অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে চট্টগ্রামের উন্নয়নে কাজ করতে চেষ্টা করছি।’

শুধু উন্নয়ন ও সেবাদানকারী সংস্থাই নয়, চট্টগ্রামে বিনিয়োগের নামে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক), বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ (বিডা) বিভিন্ন শিল্প করপোরেশনও পরিবেশ দূষণের সঙ্গে যুক্ত। মধ্যম হালিশহর ও দক্ষিণ কাট্টলী মৌজায় ২৬৭ দশমিক শূন্য ৮৫ একর সংরক্ষিত বনাঞ্চলে বে-টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পের জন্য ডিজাইন করেছে চট্টগ্রাম বন্দর।

এদিকে চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলায় নির্মিত জাতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল (আগের মিরসরাই ইকোনমিক অঞ্চল) বঙ্গোপসাগরের সন্দ্বীপ চ্যানেল উপকূলবর্তী চরের ৩৩ হাজার ৮০৫ একর জমির মধ্যে বনের জমিই রয়েছে ২২ হাজার ৩৩৫ একর। দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির স্বার্থে বন বিভাগ সৃজিত ও প্রাকৃতিক বনসমৃদ্ধ বিপুল এ জমি বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা, বর্তমানে বিডা) কাছে হস্তান্তর করে। এ বনে উপকূল রক্ষার বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ ছাড়াও ছিল নানা প্রাণবৈচিত্র্য। অবকাঠামো উন্নয়নের স্বার্থে এরই মধ্যে এ বনের সাড়ে ১৩ লাখ গাছ কাটা হয়েছে। বিলুপ্ত হয়েছে কিংবা অন্যত্র সরে গেছে বনের প্রাণিকুল। শিল্পাঞ্চলে অবকাঠামো নির্মাণের পর ১৯ হাজার ৯৪৫ একর জমি বনায়ন, খোলা স্থানসহ শিল্প-বহির্ভূত কাজে ব্যবহারের কথা ছিল। কিন্তু প্রতিশ্রুতির দৃশ্যমান বাস্তবায়ন না হওয়ায় দেশের গুরুত্বপূর্ণ সীমান্তবর্তী অঞ্চলের এ উপকূলীয় বন উজাড়ের মাধ্যমে অরক্ষিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। বন বিভাগ উপকূলীয় বনটির সুরক্ষায় ৪ হাজার ১০৪ একর ফেরত চাইলেও সেটি দিচ্ছে না বিডা কর্তৃপক্ষ।

যোগাযোগ করা হলে পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের (মেট্রো) পরিচালক সোনিয়া সুলতানা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চট্টগ্রামের সরকারি সংস্থাগুলোর পাহাড় কাটাসহ পরিবেশ ধ্বংসের মূল কারণ হচ্ছে উন্নয়ন প্রকল্পের আগে ইআইএ না করা। প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে যথাযথ অনুমোদন নেয়ার বাধ্যবাধকতা মেনে না চলার কারণে এরই মধ্যে চট্টগ্রামের অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। বর্তমানে সরকারি সব সংস্থার সমন্বয়ে চট্টগ্রাম শহরকে পাঁচটি জোনে ভাগ করে পাহাড়সহ পরিবেশগত সুরক্ষায় কাজ শুরু হয়েছে।’ তবে সরকারি সংস্থাগুলো আইন মেনে না চললে পাহাড়, নদী ও সমুদ্রবেষ্টিত চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক সম্পদ সুরক্ষা কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করেন তিনি।