জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়েছে সাগরের পানির উচ্চতা। ফলে প্রতিনিয়ত বঙ্গোপসাগরের বিশাল ঢেউ আঘাত হানছে মেরিন ড্রাইভ সড়কের ওপর। সাগরে বাড়তে থাকা পানির উচ্চতা এবং পাড়ের অব্যাহত ভাঙনে বিভিন্ন সময় তলিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ এলাকা। সম্প্রতি কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের আড়াই কিলোমিটার অংশে আবারো প্রবল বেগে উঁচু ঢেউ আছড়ে পড়তে শুরু করেছে। ঢেউয়ের আঘাতে নতুন করে ভাঙনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ঝুঁকিতে পড়েছে আশপাশের ঘরবাড়ি।

সরজমিনে দেখা গেছে, টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়নের বাহারছড়া ঘাট থেকে জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত মেরিন ড্রাইভে স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে উঁচু ঢেউ আছড়ে পড়ছে।

স্থানীয় ইউপি সদস্য মোহাম্মদ সেলিম জানান, ২০২৩ সালের আগস্টে পূর্ণিমার জোয়ারে সড়কের একটি অংশে ভাঙন দেখা দিয়েছিল। সে সময় সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোর একটি বিশেষ ইউনিট দিয়ে জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধের চেষ্টা করে। তবে দুই বছর না যেতেই আবারো জোয়ারের পানির উচ্চতা বেড়েছে এবং ঢেউয়ের ধাক্কা শুরু হয়েছে। ফলে আগের মতো বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

জোয়ারের পানির উচ্চতা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে কক্সবাজার আঞ্চলিক আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ আব্দুল হান্নান বলেন, ‘আবহাওয়া পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক থাকলেও অমাবস্যার কারণে সোমবার থেকে সাগরের পানি কিছুটা বেশি। স্বাভাবিক সময়ে সাগরে ঢেউয়ের উচ্চতা যেখানে প্রায় তিন মিটার, সেখানে বুধবার তা চার মিটার ছাড়িয়ে গেছে।’ তবে পানি কমে আসবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।

সমুদ্রসৈকত ধরে সড়কটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয় ১৯৮৯ সালে। ১৯৯৩ সালে তৎকালীন সরকার ৪৮ কিলোমিটার দীর্ঘ মেরিন ড্রাইভ প্রকল্প হাতে নেয়। সে সময় মাত্র দুই কিলোমিটার সড়ক নির্মাণের পর তা সাগরের স্রোতে বিলীন হয়ে যায়। সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্যাটালিয়নের (ইসিবি) তত্ত্বাবধানে নির্মাণকাজ শুরু হলেও ১৯৯৪ সালে প্রকল্পটি সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে প্রকল্পটি পুনরায় সেনাবাহিনীর ইসিবির কাছে আসে। এর পরই প্রায় নিরবচ্ছিন্নভাবে সম্পন্ন হয় প্রকল্পটির নির্মাণকাজ। তিন ধাপে এ সড়কটির প্রথম পর্যায়ে কলাতলী থেকে ইনানি পর্যন্ত ২৪ কিলোমিটারের নির্মাণকাজ শেষ হয় ২০০৮ সালে। দ্বিতীয় পর্যায়ে ইনানি থেকে শিলখালী পর্যন্ত আরো ২৪ কিলোমিটারের কাজ সম্পন্ন হয় ২০১৬ সালের জুনে। আর তৃতীয় পর্যায়ে শিলখালী থেকে টেকনাফের সাবরাং পর্যন্ত ৩২ কিলোমিটারের কাজ ওই বছরের এপ্রিলে শেষ হয়। ২০১৭ সালের ৬ মে কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত মোহনীয় সৌন্দর্যের মেরিন ড্রাইভ সড়ক উদ্বোধন করেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

পর্যটকদের কাছে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ এখন বেশ জনপ্রিয় স্থান। সড়কের একদিকে বঙ্গোপসাগর আর অন্য পাশে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়। এ দুটির সম্মিলন যেন দেশের একমাত্র মেরিন ড্রাইভকে করেছে অনন্য। সড়কটির সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিনই হাজারো পর্যটক এ পথ পাড়ি দেন। তবে কক্সবাজারের পর্যটন খাতকে সমৃদ্ধ করা সড়কটির কিছু অংশ এখন হুমকির মুখে। সমুদ্রসৈকত থেকে অবৈধভাবে বালি উত্তোলনের কারণে সৃষ্টি হয়েছে ভাঙন। তার ওপর যুক্ত হয়েছে অতিরিক্ত পরিবহনের চাপ, মেরিন ড্রাইভের পাশে গড়ে ওঠা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ঘরবাড়ি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, মেরিন ড্রাইভ সড়কের পূর্ব পাশে প্রভাবশালী অনেকে জমি কিনে তা ভরাট করতে সড়কের পাশের সমুদ্রসৈকত থেকে বালি তুলছেন। এতে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে এবং সড়ক আরো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ছে। তাছাড়া আগে স্থাপন করা জিও ব্যাগগুলোও ধসে যাচ্ছে।

এ ব্যাপারে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ এহসান উদ্দিন বলেন, ‘মেরিন ড্রাইভ সড়কটি সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোর রক্ষণাবেক্ষণ করে। ঢেউয়ের ধাক্কায় বিভিন্ন অংশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে বিষয়টি জেলা প্রশাসককে জানিয়েছি। সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের সঙ্গে যোগাযোগ করে ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’