ঢাকা-৯ আসনের আলোচিত প্রার্থী তাসনিম জারা। ফুটবল মার্কা নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন তিনি। নিজ নির্বাচনী এলাকার দীর্ঘদিনের সমস্যা, শিক্ষা ব্যবস্থা ও শ্রমজীবী মানুষের অধিকার নিয়ে নিজের পরিকল্পনা সম্পর্কে কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ফাতেমা-তুজ-জিনিয়া
নির্বাচনী প্রচারণা কেমন চলছে? সাধারণ মানুষের কেমন সাড়া পাচ্ছেন?
প্রচারণায় আমরা জনগণের খুব ভালো সাড়া পাচ্ছি। আমরা সচেতনভাবেই একটি ‘ক্লিন ক্যাম্পেইন’ করছি, যাতে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কোনো বিঘ্ন না ঘটে। আমি শুরু থেকেই বলেছিলাম, নির্বাচনের আগে কোটি কোটি টাকা খরচ করব না। লাখ লাখ পোস্টার দিয়ে আমি আমার শহর দূষিত করব না। শোডাউন করে যে ক্ষমতার প্রদর্শনী করা হয়, সে পথে হাঁটব না। লাখ লাখ পোস্টার বা ভাড়া করা মানুষ দিয়ে যে শোডাউন, সেগুলো আসলে জনসেবার জন্য করা হয় না। এগুলো করা হয় সাধারণ জনগণকে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে ভোট আদায়ের উদ্দেশ্যে। আর নির্বাচনের আগে কোটি টাকা খরচ করে নির্বাচনের পরে সেই টাকা তুলতে জনগণের ওপরই দুর্নীতির বোঝা চাপানো হয়। আমরা বিশ্বাস করি যে লাখ লাখ পোস্টার, মাইকিং বা ভাড়া করা মানুষ দিয়ে শোডাউনের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, আস্থা ও বিশ্বাস। আমরা এর ভিত্তিতেই আমাদের প্রচারণা চালাচ্ছি। আমরা মানুষের দোরগোড়ায়, বাজারে, পাড়া-মহল্লায় গিয়ে সরাসরি কথা বলছি। নারী-পুরুষ এবং সব বয়সের মানুষের কাছ থেকে অভাবনীয় সাড়া পাচ্ছি। দেশ-বিদেশ থেকেও অনেকে ফোন করে তাদের পরিচিতদের ফুটবল মার্কায় ভোট দিতে বলছেন। মানুষের এ ভালোবাসা প্রমাণ করে, তারা অর্থ ও পেশিশক্তির বাইরে জনসেবার রাজনীতি দেখতে উন্মুখ।
স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বাড়তি কোনো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে?
চ্যালেঞ্জ তো আছেই। প্রথম চ্যালেঞ্জ ছিল স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার জন্য মাত্র দেড় দিনে পাঁচ হাজার ভোটারের স্বাক্ষর সংগ্রহ করা। অনেকে বলেছিলেন, এটা অসম্ভব। কিন্তু সাধারণ মানুষ এক হয়ে সেটা সম্ভব করে দেখিয়েছেন। বর্তমানে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অল্প সময়ের মধ্যে আমার প্রতীক ফুটবল মার্কাটি সবার কাছে চেনানো। তবে সবার ভালোবাসা পাচ্ছি। অনেক শুভকামনা পাচ্ছি। অনেকে বলছেন যে তোমাকে দেখার আগেই আমি তোমার প্রচারণার কাজ শুরু করেছি। মানুষকে বলছি, তারা যাতে ফুটবল মার্কায় ভোটটা দেয়। দেশ-বিদেশ থেকে অনেকে জানাচ্ছেন, তারা ঢাকা-৯ আসনে তাদের পরিচিত কারা কারা ভোটার আছেন, তাদের খুঁজছেন। খুঁজে বের করে ফোন দিয়ে বলছেন যে এবার কিন্তু ভোটটা ফুটবল মার্কায় দিতে হবে। আর স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার কিছু সুবিধাও আছে। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সহজেই সরাসরি জনগণের সঙ্গে একটি সংযোগ তৈরি করা যায়। আমি সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হেঁটে হেঁটে মানুষের কাছে যাচ্ছি, যা এক দারুণ অভিজ্ঞতা। আমার বিশ্বাস, আমরা ঢাকা-৯ থেকেই দেখাতে পারব যে অর্থ ও পেশিশক্তির বাইরে গিয়েও নির্বাচনে জয়লাভ করা সম্ভব।
ঢাকা-৯ আসনের সার্বিক উন্নয়নে আপনি কোন বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিতে চান?
আমার ইশতাহার তৈরি হয়েছে মানুষের সরাসরি অভাব-অভিযোগ থেকে। আমার প্রধান অগ্রাধিকারগুলো হলো সবার জন্য আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা, মানসম্মত চিকিৎসা, মৌলিক সেবা ও শ্রমজীবী মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা। আমি বিশ্বমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ার ও শিক্ষকতা করার সুযোগ পেয়েছি। আমি চাই আমাদের এলাকার শিশুরাও যেন মানসম্মত শিক্ষাগ্রহণের সুযোগ পায়। আমাদের ছেলেমেয়েরা যাতে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করতে পারে, সেজন্য প্রতিটি স্কুলে ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাব, সায়েন্স ল্যাব ও কোডিং ক্লাব স্থাপনের পরিকল্পনা আছে। এ এলাকার মানুষ অন্যান্য এলাকার মতো ভ্যাট-ট্যাক্স দিয়েও রাস্তাঘাটের নিয়মিত সংস্কার ও পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহের মতো মৌলিক সেবা থেকে বঞ্চিত। এ অবস্থার নিরসন করতে চাই আমি। আরেকটি সমস্যা হলো মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার অভাব। মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে মুগদা হাসপাতালের সেবার মান উন্নয়ন, চিকিৎসক–সংকট ও অব্যবস্থাপনা দূর করতে কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহির আওতায় আনতে চাই। পাশাপাশি নারী স্বাস্থ্যসেবার অংশ হিসেবে হাসপাতাল ও সরকারি স্থাপনায় গর্ভবতী মায়েদের জন্য নিয়মিত ও সাশ্রয়ী চিকিৎসা, ব্রেস্টফিডিং স্পেস ও নারীবান্ধব টয়লেট নিশ্চিত করা এবং পাড়ার ক্লিনিকগুলোকে আধুনিক সরঞ্জাম দিয়ে ‘মিনি হাসপাতালে’ রূপান্তরের পরিকল্পনা আছে। এছাড়া প্রচারণাকালে প্রতিদিন অসংখ্য শ্রমজীবীর সঙ্গে কথা হয়। তারা কাজ করে উপার্জিত অর্থ দিয়ে ভালোভাবে বেঁচে থাকতে চান। আমাদের এলাকার এ অনানুষ্ঠানিক শ্রমজীবী বা মুটে, মজুর ও রিকশাচালকদের জন্য ন্যায্য মজুরি ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আমি সংসদে কথা বলব। আমার ইশতাহারে বিষয়গুলোর বিস্তারিত উল্লেখ আছে।
সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে কোনো শঙ্কা আছে কি?
মানুষ ভোট দেয়ার জন্য খুব উৎসাহী। প্রায় প্রতিটি ঘরেই আলোচনা চলছে তারা কাকে ভোট দেবেন। তবে ভোটারদের মনে একটি শঙ্কা কাজ করছে যে তারা নিরাপদে ভোট কেন্দ্রে যেতে পারবেন কিনা বা তাদের ভোট অন্য কেউ দিয়ে দেবে কিনা। আবার অনেকে এমনও বলছেন সকাল সকাল যেতে হবে, যাতে আমার ভোটটা আমি দিতে পারি। এ শঙ্কাগুলো কাটাতে হবে।
জুলাই আন্দোলনে নারীরা সামনের সারিতে থাকলেও নির্বাচনে নারী প্রার্থীর সংখ্যা খুব কম। এর কারণ কী বলে মনে করেন?
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরে আমরা দেখেছিলাম, যারা আগে রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না এমন অনেক তরুণী-নারী; এমনকি প্রবাসে থেকেও অনেকেই চিন্তা করছিলেন যে রাজনীতির জায়গাটা উন্মুক্ত হয়েছে। অনেক মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি হয়েছিল এবং অনেকে নতুনভাবে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন। কিন্তু দিন দিন আবার সেই জায়গাটা সংকুচিত হতে দেখছি। যে পরিবর্তনের জন্য অভ্যুত্থানটা হলো, যে পরিবর্তনের জন্য মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তায় নেমেছিল, সেই সংস্কারটা যেমন প্রয়োজন; তেমনি সেই পরিবর্তনটা ধরে রাখার জন্য উপযুক্ত পরিবেশও তৈরি করা প্রয়োজন। যারা আসলেই অর্থ ও পেশিশক্তির বাইরে গিয়ে রাজনীতি করতে চায়, যারা জনসেবার জন্য রাজনীতি করতে চায়; তারা যেন রাজনীতিতে থাকতে পারে। এ পরিবেশটা তৈরি করা সব রাজনৈতিক দল ও সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্ব। সবাই মিলে এ পরিবেশটা তৈরি করা প্রয়োজন।









