কম্বোডিয়ার বিভিন্ন সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ড থেকে উদ্ধার আরো ৭৮ বাংলাদেশী দেশে ফিরেছেন। গতকাল দিবাগত রাতে থাই এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে তারা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। এ নিয়ে গত চার দিনে সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ড থেকে ২২১ জন বাংলাদেশী দেশে ফিরলেন।

এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি থেকে জানা যাচ্ছে, আগের তিনদিনের মতো সর্বশেষ আগতদের বিমানবন্দরে সিভিল অ্যাভিয়েশন সিকিউরিটির সঙ্গে যৌথভাবে জরুরি সহায়তা ও বাড়িতে পৌঁছানোর জন্য অর্থ সহায়তা করেছে ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম।

ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্লাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান জানান, সাইবার স্ক্যাম নিয়ে সবার সচেতনতা জরুরি। এটি মানবপাচারের ভয়াবহ এক ধরন। ভালো চাকরির কথা বলে বিদেশে নিয়ে সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ডে ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক অনলাইন প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে বাধ্য করা হতো। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন উন্নত দেশের নাগরিকদের লক্ষ্য করে পরিচালিত সাইবার স্কাম কার্যক্রমে অংশ নিতে তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হতো। নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হলে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হতো।

শরিফুল হাসান জানান, কম্বোডিয়ার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের ফলে কয়েকটি স্ক্যাম কম্পাউন্ড থেকে এসব বাংলাদেশীকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়। তিনদিন মিলে ২২১ জন ফেরত আসা প্রমাণ করে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশী এভাবে প্রতারণা ও নির্যাতনের শিকার। ফেরত আসা বেশ কয়েকজন বাংলাদেশী মামলা করেছেন। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পুরো ঘটনার যথাযথ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া উচিত।

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী, গত দেড় বছরে ১৫ হাজার ৯২১ বিদেশী চাকরি নিয়ে কম্বোডিয়া গিয়েছেন। ফেরত আসা ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, হাজার হাজার কর্মী চাকরি না পেয়ে সেখানে মানবেতর জীবনযাপন করছে।

ভুক্তভোগীদের একজন জানান, দালাল বলেছিলেন কম্বোডিয়ায় সরাসরি কোম্পানিতে চাকরি হবে। সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে জনশক্তি ব্যুরোর ছাড়পত্র দিয়ে কম্বোডিয়া পাঠানো হয় তাকে। কিন্তু দেশটির বিমানবন্দরে এক মাসের ভিজিট ভিসায় প্রবেশের অনুমতি পাওয়া যায়। এরপর আর ভিসা দেয়নি দালালরা। সেখানে থাকা রিক্রুটিং এজেন্সির প্রতিনিধিরা অর্থের বিনিময়ে তাকে স্ক্যাম কম্পাউন্ডে বিক্রি করে দেন।

আরেক ভূক্তভোগী জানান, শারীরিক নির্যাতন করে স্ক্যাম সেন্টারে কাজ করতে বাধ্য করা হতো। কাজ করতে না চাইলে তাদের টর্চার সেলে নিয়ে শারীরিক নির্যাতনসহ বৈদ্যুতিক শক দেয়া হতো। কম্বোডিয়ার আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সম্প্রতি স্ক্যাম সেন্টার বিরোধী অভিযান পরিচালনা করলে সংশ্লিষ্ট চীনা নাগরিকরা পালিয়ে যায়। এরপর সেখান থেকে তারা মুক্তি পান।

এর আগে গত ১২ জুন কম্বোডিয়া থেকে ৩৭, ১৩ জুন ৫৪ ও ১৭ জুন ৭৮ ভুক্তভোগী শূন্য হাতে দেশে ফেরত আসেন। এর আগে গত ২২ জানুয়ারি মিয়ানমারের একটি সাইবার স্ক্যাম সেন্টার থেকে আট এবং ২০২৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ১৮ বাংলাদেশী নাগরিক দেশে ফিরেন। তাদেরও ভালো কাজের প্রলোভন দেখিয়ে থাইল্যান্ডের সীমান্ত এলাকা মায়েসট হয়ে জোরপূর্বক মিয়ানমারে প্রবেশ করানো হয়। সেখানে পৌঁছানোর পরই তাদের পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়। ভয়াবহ নির্যাতন করে নানা ধরনের সাইবার জালিয়াতির কাজ করানো হতো।

ব্র্যাক বলছে, কম্পিউটার, কলসেন্টার অপারেটরসহ বিভিন্ন পদে আকর্ষণীয় বেতনের প্রলোভন দিয়ে নিয়োগের লক্ষ্যে বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমে (ভুয়া ওয়েবসাইট, ইমেইল, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম ইত্যাদি) প্রচার চলে। এরপর তাদের অস্ত্রের মুখে জোরপূর্বক জিম্মি করে স্ক্যামের কাজে নিয়োজিত করা হয়। কাজেই থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, লাওস, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ায় যাওয়ার বিষয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে‌‌।