মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডুতে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে দেশটির সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির সংঘাত চলছে। ওপারের গোলার বিকট শব্দে আতঙ্কে আছেন এপারের কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তের মানুষ। স্থানীয়রা জানান, শনিবার রাত ১১টা থেকে গতকাল ভোর পর্যন্ত বিকট শব্দ শোনা গেছে।
সীমান্তের লোকজন জানান, মিয়ানমারের মংডু টাউনশিপের বিপরীতে টেকনাফ পৌরসভার জালিয়াপাড়া থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এবং সাবরাংয়ের পূর্বে নাফ নদীর ওপারে মংডু শহরের অবস্থান। মংডু শহরের নাফ নদী দিয়ে প্রবেশপথ খায়েনখালী খালটি। ওই খালের মোহনায় রোহিঙ্গাদের জড়ো হতে দেখা গেছে। ওই সীমান্ত এলাকায় প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাচ্ছে। মিয়ানমারের জান্তা বাহিনী বিদ্রোহী আরাকান আর্মির দখলে থাকা এলাকা চৌকি উদ্ধারের চেষ্টা করায় এমন গোলাগুলি বলে সীমান্ত এলাকার লোকজন মনে করছেন।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানান, মিয়ানমারে এখনো সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছে। বর্তমানে মংডুতে হামলা হচ্ছে। সেখানে অধিকাংশ রোহিঙ্গা নাগরিকের বসবাস। তাদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ নাফ নদী অতিক্রম করে বাংলাদেশের টেকনাফে পালিয়ে আসার চেষ্টা চালাচ্ছেন। এর মাঝে টাকার বিনিময়ে দালালরা টেকনাফের দমদমিয়া, জাদিমোরা, নাজিরপাড়া, উনছিপ্রাং পয়েন্ট থেকে অনেক রোহিঙ্গাকে অনুপ্রবেশে সহযোগিতা করছে। অনেকে সীমান্ত পেরিয়ে উখিয়া-টেকনাফের বিভিন্ন ক্যাম্পে ঢুকে গেছে।
তবে সীমান্তে আগের তুলনায় রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশের চেষ্টা অনেকটা কমেছে বলে জানিয়েছেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) টেকনাফ-২ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. মহিউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ‘সীমান্তে অনুপ্রবেশের চেষ্টাকারী রোহিঙ্গাদের আমরা প্রতিহত করছি। একটি বড় সংখ্যা রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের যে খবর বলা হচ্ছে, সেটি মনগড়া। আমরা সীমান্ত অনুপ্রবেশ ঠেকানোর পাশাপাশি যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রস্তুত রয়েছি। এছাড়া সীমান্ত পেরিয়ে যাতে কোনো অপরাধী পালিয়ে যেতে না পারে সেজন্যও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।’
এদিকে খারাংখালী, পৌরসভা, হ্নীলা, জাদিমোড়া, দমদমিয়া, নাইট্যংপাড়া, পৌরসভার জালিয়াপাড়া, নাজিরপাড়া, সাবরাং, শাহপরীর দ্বীপ, নাফ নদীর মোহনা ও নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্ত থেকে ভেসে আসছে বিস্ফোরণের বড় বড় শব্দ। সীমান্তের লোকজন বলছে, দীর্ঘদিন বন্ধের পর আবার বড় ধরনের মর্টারশেল বিস্ফোরণের বিকট শব্দে কাঁপছে টেকনাফ।
টেকনাফ পৌরসভার চৌধুরীপাড়ার মুহাম্মদ আয়ুব বলেন, ‘রাতভর ওপারের গোলার বিকট শব্দে নির্ঘুম রাত কেটেছে। শনিবার থেকে একটু বেশি শোনা যাচ্ছে। তাই আমরা রাত জেগে বসে ছিলাম। বিশেষ করে নারী ও শিশুরা ভয়ে থাকে সবসময়।’
সীমান্তের বাসিন্দা মোহাম্মদ শাহিন বলেন, ‘রাতভর মংডুতে তুমুল যুদ্ধে আমরা সীমান্তের মানুষ ঘুমাতে পারি না। অনেকের ঘরের বাইরে রাত কেটেছে। একটু পর পরই বিকট গুলির শব্দে সীমান্ত কেঁপে ওঠে। এর ভয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ি। রাতের মতো এমন গুলির শব্দ আগে কখনো শুনিনি। এ পরিস্থিতিতে যেকোনো মুহূর্তে সীমান্তে আবারো অনুপ্রবেশ ঘটতে পারে।’
রোহিঙ্গা হাকিম আলী জানান, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বুচিডংয়ের একটি গ্রামের বাসিন্দা তিনি। তিন মাস আগে তার গ্রামে আরাকান আর্মি ও জান্তা বাহিনীর সংঘাতে স্ত্রী ও সাত সন্তানকে হারিয়ে ফেলেন তিনি। সেখান থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে চলে আসার পথে মংডু টাউনশিপে আটক হন আরাকান আর্মির হাতে। এরপর থেকে শুরু হয় তার ওপর নির্যাতন, যার চিহ্ন তার শরীরে রয়েছে। কয়েক দিন আগে মংডুর টাউনশিপের আরাকান আর্মির সেই ঘাঁটিতে হামলা হলে ছাড়া পান তিনি।
আরাকান রোহিঙ্গা ইয়ুথ কোয়ালিশনের সভাপতি মুজিবুর রহমান বলেন, ‘বর্তমানে গণহত্যার দ্বিতীয় পর্ব চলছে। এবারের গণহত্যা ২০১৭ সালের চেয়ে ভয়াবহ।’
আরাকান সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান ডা. জুবায়ের বলেন, ‘জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রোহিঙ্গা সংকটকে গুরুত্ব না দেয়ার কারণে আজ এ চিত্র দেখতে হচ্ছে।’
পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘সীমান্ত সুরক্ষায় নিয়োজিতদের অবহেলার কারণে নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের সুযোগ পাচ্ছে।’ টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আদনান চৌধুরী বলেন, ‘মিয়ানমারে অভ্যন্তরীণ সংঘাতে আবারো বিস্ফোরণের বিকট শব্দ ও অনুপ্রবেশের কথা শোনা যাচ্ছে। কিন্তু সীমান্তে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বিজিবি ও কোস্টগার্ডের টহল জোরদার রয়েছে।’










