দেশের অর্থনীতিকে গুটিকয়েক প্রভাবশালী ব্যক্তির (অলিগার্ক) নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে ব্যাপক সংস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বুধবার (৩ জুন) ঢাকা ফোরাম ইনিশিয়েটিভের (ডিএফআই) আয়োজনে “প্রি-বাজেট রাউন্ডটেবিল ২০২৬” অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি একথা বলেন। রাজধানীর বনানীর একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত এ আলোচনায় দেশের উদীয়মান ব্যবসায়িক নেতা, উদ্যোক্তা, নীতিনির্ধারক ও বিনিয়োগকারীরা অংশ নেন।
দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তনের ওপর জোর দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ একটি ‘ওভার-রেগুলেটেড’ দেশ হয়ে গিয়েছিল কেবল কিছু অলিগার্ক বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেয়ার জন্য। আমরা এ প্রথা ভেঙে অর্থনীতিকে ‘ডেমোক্রাটাইজ’ বা গণতন্ত্রীকরণ করতে চাই, যাতে প্রতিটি মানুষ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারে এবং এর সুফল ভোগ করতে পারে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, অর্থনীতি হবে সবার জন্য, গুটিকয়েক অলিগার্কের জন্য নয়।
ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নত করতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসনের ঘোষণা দিয়ে মন্ত্রী বলেন, আগে ১৯টি লাইসেন্স নিতে ৬ মাস থেকে এক বছর সময় লাগত। এখন আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি কোম্পানি রেজিস্ট্রেশনসহ সব অনুমতি ওয়ান পয়েন্ট সার্ভিসের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ৭২ ঘণ্টা থেকে এক সপ্তাহের মধ্যে দেয়া হবে।
বিনিয়োগের পথে যেকোনো বাধা অপসারণের কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, ব্যবসার পথে যা বাধা হয়ে দাঁড়াবে, আমরা তা বুলডোজার দিয়ে সরিয়ে দেব।
দেশের লোকজ শিল্প ও সৃজনশীল খাতকে মূলধারার অর্থনীতিতে যুক্ত করার পরিকল্পনা তুলে ধরে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আমাদের কামার, কুমার বা তাতিরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম কাজ করলেও তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হচ্ছে না। আমরা থিয়েটার, মিউজিক এবং স্পোর্টসকে মনিটাইজ করে জিডিপিতে যুক্ত করতে চাই। তিনি আরো জানান, ঢাকার কাছে ১৬০ একর জমিতে একটি ‘থিয়েটার ডিস্ট্রিক্ট’ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে যেখানে শিল্পী ও ডিজাইনাররা সরাসরি তাদের কাজ তুলে ধরতে পারবেন।
রাজস্ব খাতে স্বচ্ছতা আনতে শতভাগ ডিজিটালাইজেশনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ট্যাক্সেশন ও কাস্টমস সিস্টেমে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি হয়। আমরা অনলাইন ও ক্যাশলেস সিস্টেম চালু করছি যাতে কর্মকর্তাদের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের সরাসরি দেখা করতে না হয়। ফিজিক্যাল কন্টাক্ট না থাকলে দুর্নীতি ও ব্যবসার খরচ—উভয়ই কমবে। তিনি আরো জানান, কিউআর কোড ভিত্তিক লেনদেনের মাধ্যমে দেশ দ্রুত ‘ক্যাশলেস সোসাইটি’র দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
বিদেশে দক্ষ কর্মী পাঠানোর গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, সার্টিফিকেশন ছাড়া ট্রেনিংয়ের কোনো মূল্য নেই। আমরা মানসম্মত কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে এমন জনশক্তি তৈরি করতে চাই যাদের আয় বর্তমানের চেয়ে ৫-৬ গুণ বেশি হবে। এছাড়া অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প বাদ দেয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা ১৩০০ প্রকল্পের তালিকা পেয়েছি যেগুলোর অনেকের কোনো রিটার্ন নেই। আমরা এ ‘ব্যালেন্স শিট’ পরিষ্কার করার কাজ শুরু করেছি।
আলোচনা অনুষ্ঠান প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজার বিষয়ক বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) তানভীর শাহরিয়ার গনি, দেশের উদীয়মান ব্যবসায়িক নেতা, উদ্যোক্তা, নীতিনির্ধারক, বিনিয়োগকারী এবং অথৈনিতক অংশীজনরা অংশ নেন।










