ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে রাজধানী এখন অনেকটাই ফাঁকা। অধিকাংশ মানুষ পরিবারের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে গ্রামের বাড়িতে চলে যাওয়ায় সড়কে যানবাহনের চাপ কমেছে। তবে এ স্বস্তির মধ্যেও নগরবাসীর জন্য নতুন ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বাড়তি ভাড়া। ‘ঈদের বকশিস’, ‘ঈদের দিন’, কিংবা ‘আজ গাড়ি কম’ এমন নানা অজুহাতে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে বাস, সিএনজি বা রিকশাচালকদের বিরুদ্ধে।
বৃহস্পতিবার (২৮ মে) রাজধানীর মিরপুর-১, মিরপুর-১০, শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, কালশী, কুড়িল, কুর্মিটোলা, ইসিবি চত্বর, নতুন বাজার ও নর্দা এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অনেক রিকশাচালক স্বাভাবিক ভাড়ার চেয়ে ২০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেশি দাবি করছেন। কোথাও কোথাও যাত্রীদের সঙ্গে ভাড়া নিয়ে তর্কাতর্কিও হচ্ছে। বিশেষ করে নারী, শিশু ও বৃদ্ধ যাত্রীদের কাছ থেকে বেশি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে।
মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর এলাকায় কথা হয় বেসরকারি চাকরিজীবী আবু নাঈম মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াহেদ সঙ্গে। তিনি বলেন, সাধারণ দিনে মিরপুর-১০ থেকে কাজীপাড়া যেতে ৪০ থেকে ৫০ টাকা লাগে। কিন্তু আজ ৮০ টাকার নিচে কোনো রিকশা যেতে রাজি হয়নি। একজন চালক সরাসরি বলেছেন, ঈদের বকশিস ধরেই ভাড়া দিতে হবে।
ইসিবি চত্তরে চাকরিজীবী আসিফ রহমান জানান, তিনি কারওয়ান বাজার যাবেন। ৫০০ টাকা নিচে কোনো সিএনজি যাবে না। আর মোটরসাইকেল চায় ৩০০ টাকা। বাড়তি বাড়ার কারণ হিসেবে তারা জানান, এটা বাড়তি ভাড়া না, এটা হলো ঈদের বকশিস।
শেওড়াপাড়ায় পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বের হয়েছিলেন গৃহিণী সুমি আক্তার। তিনি বলেন, ঈদের দিন বাচ্চাদের নিয়ে আত্মীয়ের বাসায় যাচ্ছি। রিকশাও কম, আবার যে কয়েকটা আছে তারা অনেক বেশি ভাড়া চাইছে। ছোট দূরত্বের জন্যও ১০০ টাকা পর্যন্ত চাওয়া হচ্ছে। বাধ্য হয়েই দিতে হচ্ছে।
একই অভিযোগ করেন কলেজ শিক্ষার্থী আরিফ হোসেন। তিনি বলেন, ফাঁকা রাস্তায় দ্রুত যাওয়া গেলেও ভাড়া নিয়ে এক ধরনের অরাজকতা চলছে। মিরপুর-১ থেকে কালশী যেতে সাধারণ দিনে ৬০ টাকা লাগে, আজ ১২০ টাকা চেয়েছে। দরাদরি করলে চালকরা যেতে চাচ্ছেন না।
মিরপুর থেকে নতুন বাজার আসছিলেন বাসযাত্রী শরিফুল ইসলাম। তিনি জানান, সাধারণ দিনে মিরপুর-১০ নম্বর থেকে নতুন বাজার পর্যন্ত বাস ভাড়া ৩০ টাকা হলেও ঈদের দিন সেটি বাড়িয়ে ৫০ টাকা দাবি করা হচ্ছে। ঈদের দিন পরিবার নিয়ে বের হয়েছি। কিন্তু বাসে উঠলেই অতিরিক্ত ভাড়া চাওয়া হচ্ছে। ৪০ টাকা দেওয়ার পরও চালক ও হেলপার সন্তুষ্ট হচ্ছেন না। যাত্রীদের সঙ্গে তর্কাতর্কিও করছেন।
তবে রিকশাচালকদের দাবি, ঈদের দিনে তারা পরিবার ছেড়ে কাজ করছেন বলেই বাড়তি টাকা চাইছেন। মিরপুর এলাকায় রিকশা চালানো আব্দুল কাদের বলেন, সারা বছর কষ্ট করে চালাই। ঈদের দিন সবাই পরিবার নিয়ে সময় কাটায়, আর আমরা রাস্তায় থাকি। তাই একটু বেশি ভাড়া চাইলে দোষের কিছু দেখি না। অনেক যাত্রী আবার খুশি হয়েই বকশিস দেন।
মিরপুর-১০ এলাকায় সিএনজি চালক মো. হানিফ বলেন, ঈদের দিনে রাস্তায় গাড়ি কম থাকলেও যাত্রীও কম। অনেক সময় দীর্ঘক্ষণ বসে থাকতে হয়। তেলের খরচ, গ্যারেজ ভাড়া আর পরিবারের জন্য ঈদের খরচ মিলিয়ে একটু বেশি ভাড়া চাইতে হয়। তবে কাউকে জোর করে ভাড়া নেয়া হচ্ছে না, যাত্রী রাজি হলেই যাচ্ছি।
গাবতলী থেকে ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টারগামী বাস অছিম পরিবহনের বাসচালক করিম জানান, ঈদের দিনে সড়কে যাত্রী তুলনামূলক কম থাকায় কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। আমরাও ইচ্ছা করে বেশি ভাড়া নিই না। গ্যারেজ খরচ, স্টাফদের অতিরিক্ত বেতন ও ঈদের বাড়তি চাপের কারণে ভাড়া কিছুটা বাড়াতে হয়।
এদিকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বাস ও সিএনজির সংখ্যাও কম দেখা গেছে। ফলে অনেকে বাধ্য হয়ে রিকশার ওপর নির্ভর করছেন। আর সেই সুযোগেই কিছু চালক বাড়তি ভাড়া আদায় করছেন বলে অভিযোগ যাত্রীদের।
রাজধানীর ব্যস্ত নগরজীবনে ঈদের দিন কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও রিকশাভাড়ার এ বাড়তি চাপ নগরবাসীর আনন্দে ভাটা ফেলছে। যাত্রীরা বলছেন, ঈদের খুশি ভাগাভাগি হোক সহমর্মিতায়, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ে নয়।










