রাজনৈতিক অচলাবস্থা, ভঙ্গুর অর্থনীতি ও ব্যাংকিং ব্যবস্থা, দুর্বল আইন-শৃঙ্খলার মতো নানা সংকটের মধ্যে চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি দেশের দায়িত্ব নেয় বিএনপি। শুরুতেই মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের জেরে জ্বালানি ও সার সংকটের পাশাপাশি হাম ও হামের উপসর্গে পাঁচ শতাধিক শিশুমৃত্যুর মতো কঠিন চাপ নিতে হয়েছে এ সরকারকে।

দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই নির্বাচনী ইশতাহার পূরণে বেশকিছু পদক্ষেপেও সরকারের ইতিবাচক প্রশংসা এসেছে। তবে বেশকিছু সিদ্ধান্তে সমালোচনাও ছিল। বিশ্লেষকরা বলছেন, দায়িত্ব নেয়ার পর সরকারের ১০ হাজার টাকা ‍কৃষি ঋণ মওকুফ, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ড প্রচলন, খাল খনন কর্মসূচির মতো বেশকিছু কার্যক্রম ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরেছে। অন্যদিকে সরকারের ১০০ দিন উপলক্ষে গতকাল ই-বুক প্রকাশ করেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। এতে তাদের উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম তুলে ধরা হয়েছে।

তবে ধর্ষণ, খুনের মতো নিয়মিত ঘটনায় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে মানুষের। এছাড়া প্রশাসনে পদায়নে আগের ধারা বজায় রাখার মতো নানা বিষয় সরকারকে নিয়ে সমালোচনার জায়গাও তৈরি করেছে। যদিও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নানা উদ্যোগ দেশজুড়ে প্রশংসায় ভাসিয়েছে।

সরকারের প্রথম ১০০ দিনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ছিল দেশের অর্থনীতি। ব্যাংক খাতের সংস্কার, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখাই ছিল আলোচনায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় জ্বালানি সংকট ও দাম সহনীয় রাখা। সামাজিক নিরাপত্তা খাতে নেয়া কিছু পদক্ষেপে সরকার যেমন ইতিবাচক বার্তা দিতে পেরেছে, তেমনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নিয়োগসহ বেশকিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনাও ছিল। ব্যাংক খাতের সংকটের পাশাপাশি দেশের বেসরকারি খাতে বিনিয়োগে বড় ধরনের সংকোচন দেখা গেছে, যা দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য চ্যালেঞ্জ বলেই মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।

দেশের বন্ধ কলকারখানা চালু করাসহ স্থবির অর্থনীতি চাঙ্গা করতে অবশ্য সম্প্রতি ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন হলে ২৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। কিন্তু তারা বলছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এখনো সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে বড় চাপ তৈরি করছে। বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো কঠিন চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। ব্যাংক খাতে অস্থিতিশীলতা এবং খেলাপি ঋণ, কর-জিডিপি অনুপাত সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যাওয়ার মতো বড় চ্যালেঞ্জ আর্থিক খাতে এখনো রয়ে গেছে। এ খাতেও বড় ধরনের কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

সরকারের ১০০ দিনের কাজের মূল্যায়ন সম্পর্কে জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির যে স্বাভাবিক গতিশীলতা বা চাঞ্চল্য, তা এখনো দৃশ্যমান হচ্ছে না। অবশ্য নতুন বাজেট পেশ এবং এর বাস্তবায়ন শুরু হলে হয়তো এ পরিস্থিতির কিছুটা আভাস পাওয়া যাবে। তবে সরকারকে এখনই চূড়ান্তভাবে মূল্যায়ন করার সময় আসেনি; তাদের সবেমাত্র ১০০ দিন পার হলো। পাঁচ বছরের মেয়াদে তারা যেসব সংকট সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা এ অল্প সময়ে সম্ভব নয়। সরকার আর্থিক খাত কীভাবে সামাল দেয়, ঘোষিত প্রণোদনাগুলো সুনির্দিষ্ট অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে প্রকৃত অংশীজনদের মাঝে কীভাবে বিতরণ করে এবং নতুন প্রকল্পগুলো সুশাসন নিশ্চিত করে কতটা সাশ্রয়ীভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে—তা আগামী দিনে নিবিড়ভাবে দেখার বিষয়।’

বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে মন্তব্য করে এ অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘‌সিঙ্গেল উইন্ডো সেবা চালু হলেও তা কার্যকর করতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি ও গ্যাস সরবরাহ এবং শক্তিশালী লজিস্টিকস পলিসির দ্রুত বাস্তবায়ন প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রথম দিন থেকেই প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর আরো জোরালো তাগিদ দেয়া উচিত ছিল। এনবিআরের (জাতীয় রাজস্ব বোর্ড) সংস্কারসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়াতে না পারলে বাজেট বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই সামনের দিনগুলোর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আর্থিক খাত সংস্কার ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা জোরদার করার মতো প্রধান জায়গাগুলোয় আরো ব্যাপক উদ্যোগ ও উদ্যম প্রয়োজন।’

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই দেশের আইন-শৃঙ্খলা নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সেটির তেমন উন্নয়ন হয়নি। ফলে রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নিলে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন হবে আশা করা হলেও পরিস্থিতি খুব একটা বদলায়নি বলেই মনে করেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, ধর্ষণ, হত্যা ও ছিনতাইয়ের মতো ঘটনাগুলো এখনো সাধারণ মানুষের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পাশাপাশি মানুষের আয় না বাড়লেও নিত্যদিন ব্যয় বাড়ছে, যা মানুষের জীবনযাত্রায় মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। এসব চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি হামে আক্রান্ত হয়ে পাঁচশর বেশি মানুষের মৃত্যু সরকারকে আরো বড় চ্যালেঞ্জে ফেলেছে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তারা শতভাগ শিশুকে হামের টিকা দিতে সক্ষম হয়েছে। নতুন ক্যাম্পেইনের আওতায় দুই কোটির বেশি শিশু হামের টিকা পেয়েছে।

সরকারের ১০০ দিনের কাজের মূল্যায়ন সম্পর্কে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের নির্বাচনী ইশতাহারের আলোকে প্রথম ১০০ দিনে আমরা প্রত্যাশার চেয়েও বেশি অর্জন করতে পেরেছি। আমাদের ফ্ল্যাগশিপ কর্মসূচিগুলোর সাফল্য এককথায় প্রমাণ করে যে—‘সকাল দেখেই যেমন বোঝা যায় পুরো দিনটি কেমন যাবে’, তেমনই আমাদের প্রথম ১০০ দিনের পারফরম্যান্সই বলে দিচ্ছে সরকারের আগামী দিনগুলো অনেক পজিটিভ ও সফল হবে। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আমরা আমাদের প্রতিটি প্রতিশ্রুতি আন্তরিকতার সঙ্গে পূরণ করতে সম্পূর্ণভাবে বদ্ধপরিকর এবং সে লক্ষ্যেই দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যাচ্ছি।’

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীও সরকারের ১০০ দিনের কার্যক্রমকে শতভাগ সফল হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌এখন পর্যন্ত আমরা শতভাগ সফল এবং এ সফলতার মাধ্যমে জনগণের মধ্যে যে অভূতপূর্ব উৎসাহ-উদ্দীপনা ও জাগরণের সৃষ্টি হয়েছে, তা দীর্ঘ সময় ধরে বজায় থাকবে।’