নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বর্জ্য অপসারণ নিশ্চিত করতে দুই সিটি করপোরেশনে প্রায় ৩০ হাজার ৫০০ কর্মী প্রস্তুত রাখা হয়েছে। তবে বৃষ্টির কারণে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যাহত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম নির্বিঘ্ন করতে দুই সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঈদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। পাশাপাশি নগরবাসীর সুবিধার্থে খোলা হচ্ছে বিশেষ হটলাইন। বর্জ্য সংরক্ষণ ও অপসারণে দুই সিটি করপোরেশন থেকে প্রায় ১৭ লাখ ৭০ হাজার প্লাস্টিক, পলিব্যাগ ও বায়োডিগ্রেডেবল ব্যাগ বিতরণ করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঈদের দিন দুপুরের পর থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম শুরু হবে। রাজধানীতে এবার প্রায় সাত লাখ পশু কোরবানি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যেখান থেকে প্রায় ৫৫ হাজার টন বর্জ্য সৃষ্টি হতে পারে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক আবদুস সালাম জানান, কোরবানির পশুর হাট ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা তদারকিতে উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে বিশেষ তদারকি পরিষদ গঠন করা হয়েছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবহন ও যান্ত্রিক বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করে মাঠপর্যায়ে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘ঈদের দিন দুপুর ১২টা থেকে বর্জ্য অপসারণের মূল কার্যক্রম শুরু হবে এবং পরবর্তী ৮ ঘণ্টার মধ্যেই প্রথম দিনের কোরবানির বর্জ্য সম্পূর্ণ অপসারণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।’ ডিএসসিসি প্রশাসক নগরবাসীকে সতর্ক করে বলেন, ‘কোরবানির বর্জ্য কোনোভাবেই ড্রেন বা নর্দমায় ফেলা যাবে না। এতে রোগজীবাণু ছড়ানোর পাশাপাশি বৃষ্টির সময় ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হতে পারে।’

এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, ঈদুল আজহার দিন বৃহস্পতিবার দেশের অন্তত চার বিভাগের বেশির ভাগ স্থানে বৃষ্টি হতে পারে। এর মধ্যে আছে রংপুর, ময়মনসিংহ, সিলেট ও রাজশাহী বিভাগ। বৃষ্টি হতে পারে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগেও। তবে এ দুই বিভাগে হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি হতে পারে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়া অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশীদ।

তিনি বলেন, ‘ঈদের দিন অপেক্ষাকৃত শুকনো থাকতে পারে খুলনা ও বরিশাল বিভাগ। রাজধানী ঢাকায় ঈদের দিন হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টির সম্ভাবনা আছে। তবে বৃষ্টিটা সকাল বা বিকাল, ঠিক কখন হতে পারে, তা সুনির্দিষ্টভাবে বলার ক্ষেত্রে সমস্যা হলো, এ সময়ের প্রকৃতি। এবার পশ্চিমা লঘুচাপ অনেক বেশি শক্তিশালী। কিন্তু গত বছরের নভেম্বর থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত এ লঘুচাপের প্রভাব প্রায় ছিলই না। তাই তেমন কোনো বৃষ্টিও হয়নি। এটা অনেকটাই অস্বাভাবিক। আবার দেখা যাচ্ছে, মার্চের পর থেকে এ পশ্চিমা লঘুচাপের বিরামহীন প্রভাব চলছে। সেটাও অনেক সময় ঘটে না। এবার হচ্ছে।’

ঈদের দিন বৃষ্টি হলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। বিশেষ করে পশুর রক্ত-মলমূত্র ড্রেনে ও রাস্তায় ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। যদিও দুই সিটি করপোরেশন দাবি করছে বৃষ্টির মধ্যেও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার প্রস্তুতি তাদের রয়েছে।

ডিএসসিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা রাসেল রহমান জানান, মাতুয়াইল স্যানিটারি ল্যান্ডফিলে বর্জ্য স্থানান্তর ও অপসারণে ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। আগামী ২৮, ২৯ ও ৩০ মে মোট ৩৩ হাজার ৯৪২ টন বর্জ্য অপসারণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম দিনে ১৫ হাজার ৯৩৫ টন, দ্বিতীয় দিনে ১১ হাজার ৭৭৬ টন এবং তৃতীয় দিনে ৬ হাজার ২৩১ টন বর্জ্য অপসারণ করা হবে। এছাড়া পশুর হাটের বাঁশ, খড়কুটো ও অন্যান্য ময়লা ধাপে ধাপে অপসারণ করা হবে। প্রথম দিনে ৬০ শতাংশ, দ্বিতীয় দিনে ৩০ শতাংশ এবং তৃতীয় দিনে অবশিষ্ট ১০ শতাংশ বর্জ্য পরিষ্কার করা হবে। চলতি বছর দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রায় ১ লাখ ৭৪ হাজার পশু কোরবানি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এসব বর্জ্য অপসারণে মোট ২ হাজার ১১৭টি যান ও যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে কম্পেক্টর, ডাম্প ট্রাক, কনটেইনার ক্যারিয়ার, পে-লোডার, এক্সক্যাভেটর, ব্যাকহো লোডার, বুলডোজার ও পানির গাড়ি। পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে সহায়তার জন্য ৪৬ টন ব্লিচিং পাউডার, ২১০ গ্যালন স্যাভলন এবং ১ লাখ ৪০ হাজার বায়োডিগ্রেডেবল ব্যাগ বিতরণ করা হবে। নগর ভবনে স্থাপিত কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে পুরো কার্যক্রম সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা হবে। এছাড়া প্রতিটি পশুর হাটে পৃথক নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থাকবে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং পশুর স্বাস্থ্যসেবায় মেডিকেল টিম মোতায়েন থাকবে। নাগরিক অভিযোগ গ্রহণ ও দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য দুটি হটলাইন নম্বর (০১৭০৯৯০০৮৮৮ ও ০২২২৩৩৮৬০১৪) চালু রাখা হয়েছে।

অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান জানান, কোরবানির বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় জনসচেতনতা বাড়াতে প্রতিটি ওয়ার্ডে মাইকিং করা হচ্ছে। এছাড়া মসজিদের ইমামদের মাধ্যমে নামাজের পর ও জুমার খুতবায় পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে মুসল্লিদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘গত বছর ঈদুল আজহায় ডিএনসিসি এলাকায় মোট ২০ হাজার ৮৮৯ টন বর্জ্য অপসারণ করা হয়েছিল। এবারো একই পরিমাণ বর্জ্য অপসারণের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।’ ডিএনসিসির উপপ্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মফিজুর রহমান ভূঁইয়া জানান, সংস্থার নিজস্ব সাড়ে ৬ হাজার পরিচ্ছন্নতা কর্মীর পাশাপাশি আরো সাড়ে ৪ হাজার বর্জ্য সংগ্রহকর্মী মাঠে কাজ করবেন। এছাড়া প্রতিটি ওয়ার্ডে ১০০ জন করে মোট সাড়ে ৫ হাজার স্বেচ্ছাসেবক পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম তদারকি করবেন। সব মিলিয়ে প্রায় ১৬ হাজার কর্মী মাঠে থাকবেন। বর্জ্য অপসারণে ডিএনসিসি ১৬ লাখ ৩০ হাজার পলিব্যাগ বিতরণ করেছে। এছাড়া জীবাণুনাশক হিসেবে ৩ হাজার ৬০০ বস্তা ব্লিচিং পাউডার বিতরণ করা হয়েছে। ব্যবহারের জন্য মোট ৭৫২টি যানবাহন ও যন্ত্রপাতি প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ট্রাক, ডাম্পার, পে-লোডার, পানির গাড়ি, কম্পেক্টর ট্রাক ও রোড সুইপার। ডিএনসিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. জোবায়ের হোসেন জানান, ৫৪টি ওয়ার্ডে প্রায় এক হাজার গোশত প্রস্তুতকারককে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে, যাতে সঠিকভাবে পশু জবাই ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা যায়। তিনি আরো জানান, কোরবানির তিনদিন আগে থেকেই ১০টি জোনে মনিটরিং টিম কাজ শুরু করেছে। পশু জবাইয়ের স্থান প্রস্তুত ও বর্জ্য চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য ল্যান্ডফিল প্রস্তুত রাখার নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে।

নগরবাসীর সহযোগিতা পেলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই রাজধানীকে বর্জ্যমুক্ত করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন দুই সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা।