যশোরের আট উপজেলার মধ্যে ছয় উপজেলায় বোরো ধানের খেতে বিভিন্ন ধরনের পোকার আক্রমণ দেখা দিয়েছে। কীটনাশক ব্যবহার করেও কোনো সুফল মিলছে না। এতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন চাষীরা। তাদের মনে এখন লোকসানের আশঙ্কা।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ধানের ছড়া থেকে মাত্র শীষ বের হতে শুরু করেছে। এরই মধ্যে সাদা লম্বা লেদা পোকা শীষগুলো ছিদ্র করে ফেলছে। ফলে ওই ছড়াতে আর ধান না হয়ে শুকিয়ে সাদা (চিটা) হয়ে যাচ্ছে। ওই পোকার আক্রমণ থেকে বোরো ধান রক্ষায় কৃষকদের বিভিন্ন কীটনাশক ব্যবহার করতে দেখা গেছে। পোকার আক্রমণে ক্ষতির মুখে পড়ছেন অধিকাংশ কৃষক। এতে প্রতি বিঘা জমিতে পাঁচ থেকে ছয় মণ করে ধান কম পাওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষক।
অভয়নগর উপজেলার বগুড়াতলা গ্রামের কৃষক শেখ নূর আলম বলেন, বোরো মৌসুমে এবার আমি সাড়ে তিন বিঘা (৪২ শতকে বিঘা) জমিতে ব্রি-২৮ ধান লাগিয়েছিলাম। ব্লাস্টের লক্ষণ দেখার শুরু থেকেই কয়েকবার ওষুধ ছিটিয়েছি। কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয়নি। ওই জমিতে আমার কোনো ধান হবে না।
উপজেলার শ্রীধরপুর গ্রামের কৃষক আনোয়ার মল্লিক জানান, আমি ৭৯ শতক জমিতে হিরা-২ হাইব্রিড ধান লাগিয়েছি। ব্লাস্টে অর্ধেকের বেশি জমির ধান নষ্ট হয়েছে। কয়েকবার ব্লক সুপারভাইজারের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনি আসতে চেয়েও আসেননি। সর্বশেষ তিনি ধান কেটে ফেলার পরামর্শ দিয়েছেন।
বাঘারপাড়া উপজেলার ধলগ্রামের কৃষক রফিকুল বিশ্বাস বলেন, বোরো রোপণের পর ২০ থেকে ২৫ দিন পর্যন্ত কোনো পোকা আক্রমণ করেনি। হঠাৎ করে খেতে পোকার আক্রমণ বেড়েছে। রক্ষা পেতে বিভিন্ন কীটনাশক ব্যবহার করেছি। এর পরও প্রতিকার মিলছে না।
মণিরামপুর উপজেলার হানোয়ার গ্রামের আনসার আলী বলেন, এ বছর এক বিঘা জমিতে আবাদ করেছিলাম। বোরো ধানের বীজ খুবই ভালো ছিল। কিন্তু পোকা সব শেষ করে দিচ্ছে। ধানের শীষ কেটে দিয়েছে। একই গ্রামের মোমেনা বেগম বলেন, আমার ১০ কাঠা জমিতে পোকা লেগেছে। এতে ধানের শীষ ফেটে যাচ্ছে। খুবই লোকসান দিতে হবে এবার।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, যশোর জেলায় ২০২১-২২ অর্থবছরে বোরো ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে এক লাখ ৫৭ হাজার ৮৮৫ হেক্টর। আবাদ হয়েছে এক লাখ ৫৮ হাজার ৫০৫ হেক্টর। যার মধ্যে উফশী জাতের আবাদ করা হয়েছে এক লাখ ৩১ হাজার ৬২০ হেক্টর ও হাইব্রিড জাতের আবাদ হয়েছে ২৬ হাজার ৮৮০ হেক্টর। এর মধ্যে পোকার আক্রমণ হয়েছে ৩৭ হেক্টর জমিতে। কৃষক বলছেন, বাস্তবে পোকার আক্রমণ হয়েছে শতাধিক হেক্টর জমিতে।
কৃষি বিভাগ বলছে, সদর উপজেলায় বোরো আবাদ হয়েছে ২৭ হাজার ২৬০ হেক্টর জমি, পোকা লেগেছে ২ হেক্টরে, শার্শা উপজেলায় আবাদ হয়েছে ২৩ হাজার ৬৬০ হেক্টর, পোকা ধরেছে এক হেক্টরে, ঝিকরগাছায় আবাদ হয়েছে ১৮ হাজার ৮৫০ হেক্টরে, চৌগাছায় আবাদ হয়েছে ১৮ হাজার ৬৩০ হেক্টরে, এ দুই উপজেলায় পোকা লাগেনি। অভয়নগরে আবাদ করা হয়েছে ১২ হাজার ২০০ হেক্টরে, পোকা লেগেছে ৯ হেক্টর জমিতে। বাঘারপাড়ায় আবাদ হয়েছে ১৬ হাজার ৪২০ হেক্টরে, পোকার আক্রমণ হয়েছে ২ হেক্টরে। মণিরামপুরে আবাদ হয়েছে ২৬ হাজার ৯৬৫ হেক্টরে, পোকা লেগেছে ২০ হেক্টর জমিতে এবং কেশবপুর উপজেলায় বোরা ধানের আবাদ হয়েছে ১৪ হাজার ৫২০ হেক্টরে, পোকা লেগেছে ৩ হেক্টরে।
মণিরামপুর উপজেলা কৃষি অফিসার আবুল হাসান বলেন,
উপজেলার বিভিন্ন বোরো খেতে পোকার আক্রমণ বেড়েছে। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা মাঠ পরিদর্শন ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছেন। পোকার আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা চলছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোরের উপপরিচালক দিপঙ্কর দাস বলেন, ধানখেতে মাজরা পোকা দেখা দিলে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। এ পোকা ধানের ফলনে কোনো ক্ষতি করে না। পোকা দমনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যবহার করতে হবে। এরই মধ্যে আমরা আক্রান্ত ৩৩ হেক্টর দমন করে ফেলেছি। আশা করছি আর ১৫ দিনের মধ্যে কৃষক তার ফসল ঘরে তুলতে পারবেন।










