স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত ২৪ ঘণ্টায় (বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সকাল ৮টা) হামে দুই শিশু এবং হামের উপসর্গ নিয়ে আরো নয় শিশুর মৃত্যু হয়েছে। প্রতিদিনই নতুন নতুন আক্রান্ত শিশু হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে, বাড়ছে মৃতের সংখ্যাও।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেই সামনে আসছে ঈদ। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ঈদকে কেন্দ্র করে বাড়তি জনসমাগম, গণপরিবহনে ভিড়, আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে যাতায়াত এবং সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের কারণে হামের সংক্রমণ আরো দ্রুত ছড়াতে পারে। তাদের মতে, শরীরে হামের জীবাণু প্রবেশের পর উপসর্গ স্পষ্ট হওয়ার আগেই আক্রান্ত ব্যক্তি অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়াতে সক্ষম। ফলে ঈদযাত্রা, ঈদের জামাত, শপিং মল, বিনোদন কেন্দ্র ও পারিবারিক সমাবেশ সংক্রমণ বৃদ্ধির বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের নিয়ে অপ্রয়োজনীয় ভিড় এড়িয়ে চলা এবং উপসর্গ দেখা দিলে ভ্রমণ না করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে শরীরে হামের জীবাণু প্রবেশের পর শুরুতে শুধু হালকা জ্বর দেখা দেয়, কিন্তু তখনো তীব্র উপসর্গ প্রকাশ পায় না। এ সময় থেকেই আক্রান্ত ব্যক্তি অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়াতে পারে।
ফলে অজান্তেই পরিবারের সদস্য ও আশপাশের মানুষ ঝুঁকিতে পড়ে। এ কারণে ঈদযাত্রা ও বড় ধরনের জনসমাগমের কারণে এ সংক্রমণ আরো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।’ সরকারের পক্ষ থেকে আরো ব্যাপক সচেতনতামূলক প্রচার-প্রচারণা চালানো প্রয়োজন ছিল উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, ‘বিশেষ করে জ্বর, চোখ লাল হওয়া কিংবা হামের মতো উপসর্গ থাকলে ভ্রমণ এড়িয়ে চলতে মানুষকে সচেতন করা জরুরি ছিল।’
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্যমতে, বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত হামে দুই শিশু এবং হামের উপসর্গ নিয়ে আরো নয় শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে শনাক্ত হয়েছে ৫৪ শিশু এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ১০৪ জন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ১ হাজার ২৬১ শিশুর মধ্যে হামের উপসর্গ দেখা গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৪৪৯ জন ঢাকা বিভাগের। একই সময়ে চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে ১ হাজার ৭৫ শিশু।
হাম অতিসংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা মূলত আক্রান্তের হাঁচি, কাশি ও শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। হামের ভাইরাস এতটাই সংক্রামক যে একজন আক্রান্ত ব্যক্তি গড়ে ১২-১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারে। সাধারণত র্যাশ ওঠার চারদিন আগে ও পরে আক্রান্ত ব্যক্তি সংক্রমণ ছড়াতে পারে। হামের ভাইরাস বাতাসে বা কোনো কক্ষের পরিবেশে কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত সক্রিয় থাকতে পারে। ফলে আক্রান্ত ব্যক্তি কোনো ঘরে অবস্থান করার পর সেখানেও অন্যরা সংক্রমিত হতে পারে। বিশেষ করে গণপরিবহন, স্কুল, বাজার, হাসপাতাল, শপিং মল, ধর্মীয় সমাবেশ কিংবা পারিবারিক অনুষ্ঠানের মতো জনসমাগমপূর্ণ স্থানে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের সংক্রমণ রোধে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো টিকাদান। পাশাপাশি আক্রান্ত ব্যক্তিকে আলাদা রাখা, জ্বর বা র্যাশ দেখা দিলে জনসমাগম এড়িয়ে চলা, হাঁচি-কাশির সময় মুখ ঢেকে রাখা এবং দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া জরুরি। বিশেষ করে ঈদ বা বড় উৎসবের সময় সতর্কতা আরো বেশি প্রয়োজন, কারণ এ সময় মানুষের চলাচল ও ভিড় বেড়ে যায়।
হামের সংক্রমণের মধ্যে শিশুদের নিয়ে অপ্রয়োজনীয় ভিড় এড়িয়ে চলতে অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. জাহিদ রায়হান। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘স্বাভাবিকভাবেই ঈদে বড় ধরনের জনসমাগম হবে। বাস, ট্রেন, লঞ্চ এবং বিভিন্ন বিনোদন কেন্দ্রে মানুষের ভিড় বাড়বে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, পহেলা বৈশাখের পর চার-পাঁচদিনের মধ্যে হামের রোগী বেড়েছিল। কারণ মানুষ শিশুদের নিয়ে বিভিন্ন স্থানে ঘুরতে বেরিয়েছিল।’ ঈদের জামাতে শিশুদের মাস্ক পরানোর পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘সচেতন না হলে বড় সংখ্যক শিশু হামে আক্রান্ত হতে পারে।’










