লক্ষ্মীপুরে ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। নারী-পুরুষ ও শিশুসহ গত সাতদিনে জেলার পাঁচটি উপজেলায় প্রায় পাঁচ হাজার আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা করছে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে দুজন। আক্রান্তদের এক-তৃতীয়াংশই জেলার রায়পুর উপজেলার রোগী। ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের সরকারি হাসপাতালগুলোর পাশাপাশি চাঁদপুরের মতলব ও ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। এদিকে সরকারি হাসপাতালগুলোয় শয্যা, খাবার স্যালাইন ও ওষুধের সংকট দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও নার্সরা।
স্বজনরা জানান, রায়পুর পৌরশহরের দেনায়েতপুর গ্রামের ব্যবসায়ী জাফর আহাম্মদ (৬৫) সপরিবারে ডায়রিয়ায় অসুস্থ হয়ে পড়েন। গত সোমবার স্ত্রী ও সন্তানসহ ঢাকার ইবনে সিনা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরদিন সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। তবে এখনো ওই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন মৃত জাফরের স্ত্রী ও ছোট ছেলে। অন্যদিকে বৃহস্পতিবার রাতে পৌরসভার ধানহাটা এলাকার নুরজাহান বেগম (৬৪) ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হলে রাতে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ভোরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিলে চিকিৎসক তাকেও মৃত ঘোষণা করেন। তবে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ওই হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন নিহত নুরজাহানের মেয়ে কহিনুর বেগম ও নাতি জহিরুল ইসলাম।
সরেজমিনে দেখা যায়, জেলা সদর হাসপাতালের ডায়রিয়া বিভাগে কোনো বেডই খালি নেই। কোনোটিতে এক বেডে দুজন করেও থাকতে হচ্ছে। আরো ভয়াবহ পরিস্থিতি ৫০ শয্যাবিশিষ্ট রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, ৪ ঘণ্টায় ২২ জন ডায়েরিয়া আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছে। তাছাড়া ডায়রিয়া ওয়ার্ডে
উপচেপড়া রোগী ও স্বজনের ভিড়।
রায়পুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন পৌর ৬নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা সিদ্দিকুর রহমান ভূঁইয়া ও নাসিমা বেগম বলেন, একজন ১০ দিন ধরে ও অন্যজন তিনদিন ধরে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত। তাদের দুজনেরই দাবি পৌরসভার সরবরাহ করা পানি
ব্যবহার ও পান করায় তারা ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন। দূষিত পানি সরবরাহের অভিযোগ তাদের। একই অভিযোগ পৌরশহরের সোনাপুর ও কাঞ্চনপুর থেকে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও স্বজনদের।
এদিকে রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের গত কয়েক দিনের তথ্যে দেখা যায়, প্রায় ২০০ রোগী ডায়রিয়া বিভাগে ভর্তি। এছাড়াও অনেকে বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন।
উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাকির হোসেন জানান, গত কয়েকদিনে হাসপাতালে ভর্তিই হয়েছেন দুই শতাধিক রোগী। যার বেশির ভাগই পৌর এলাকার বাসিন্দা। এতে স্যালাইন সংকট দেখা দিয়েছে। তিনি আরো জানান, আশঙ্কা করা হচ্ছে, তীব্র ঠাণ্ডা ও পৌরসভার সরবরাহ করা পানি পান ও ব্যবহারের কারণে এমন প্রকোপ দেখা দিয়েছে। তবে রায়পুর পৌরসভার মেয়র গিয়াস উদ্দিন রুবেল ভাট পানি দূষণের অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, পৌরসভার পানি সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকে। সাপ্লাইয়ের পানি থেকে ডায়রিয়া আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি সত্য নয়। তার পরও পানি শাখার ইঞ্জিনিয়ারদের দিয়ে আক্রান্ত এলাকাগুলোর পানির লাইন পরীক্ষা করা হবে বলে জানান তিনি।
জেলা সিভিল সার্জন ডা. মো. আবদুল গাফফার বলেছেন আক্রান্তদের মধ্যে অধিকাংশই রায়পুর পৌরসভার বাসিন্দা। স্যালাইন সংকট দেখা দেয়ায় ১৫০০ স্যালাইন অন্য জায়গা থেকে আনা হয়েছে।
সিভিল সার্জন বলেন, আক্রান্ত সবাই সরকারি হাসপাতালে আসেন না। বেশির ভাগ রোগী বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। মতলব ডায়রিয়া হাসপাতালেও খোঁজ নিয়ে লক্ষ্মীপুরের অনেক রোগী ভর্তির খবর পেয়েছি। অনেকেই স্থানীয় পল্লী চিকিৎসকের স্মরণাপন্ন হচ্ছেন। তিনি আতঙ্কিত না হয়ে নিয়মিত ওষুধ সেবনের অনুরোধ জানিয়েছেন।










