হাসপাতালের পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডে গতকাল সকালে এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। পরিদর্শন শেষে ওই কক্ষে এসি-সংক্রান্ত জটিলতা ও বায়ু চলাচলের কোনো ব্যবস্থা না থাকার বিষয়টি জানায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটিও গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস। ৭২ ঘণ্টার মধ্যে কমিটি প্রতিবেদন দেবে বলেও তিনি জানান।
হাসপাতালের পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ড পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা জানিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, ‘কক্ষটিতে এসি-সংক্রান্ত জটিলতা অথবা অন্য যেকোনো কারণে একটি শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশের মতো পরিস্থিতি পাওয়া গেছে। আমরা দেখেছি, এসিটি এমনভাবে ছিল যে এটি বন্ধ হয়ে গেলে সেখানে আর কোনো ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে এখানে চিকিৎসাধীন ছয়টি শিশুকে আমরা হারিয়েছি।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সাংবাদিকদের আরো বলেন, ‘আমরা জানতে পেরেছি, এখানে ১১ জন মা ছিলেন। তাদের মধ্যে ছয়জন মা তাদের নবজাতক নিয়ে ছিলেন। নবজাতকদের বয়স এক থেকে তিনদিনের মধ্যে। বাকি পাঁচ নবজাতক এনআইসিইউতে (বিশেষ নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) চিকিৎসাধীন ছিল। জন্মগত জটিলতার কারণে সেখানে তাদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছিল।’
তদন্ত কমিটি গঠনের তথ্য জানিয়ে অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‘শিশুমৃত্যুর ঘটনায় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নির্দেশে উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল উইংয়ের উপপরিচালক পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আরেকজন কর্মকর্তাকে রাখা হয়েছে।’
হাসপাতালের ব্যবস্থাপনায় কোনো ত্রুটি ছিল কিনা তদন্ত কমিটি তা খতিয়ে দেখবে বলেও জানান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক। পাশাপাশি শিশুদের চিকিৎসায় কোনো ঘাটতি ছিল কিনা এবং যে কক্ষে তারা ছিল, সে পরিবেশে কোনো সমস্যা ছিল কিনা তাও খতিয়ে দেখা হবে বলে তিনি জানান। বিশেষ করে এসি-সংক্রান্ত বা অন্য কোনো কারিগরি ত্রুটি থাকলে সেগুলোও নির্ণয় করা হবে।
অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‘প্রয়োজনে কারিগরি বিশেষজ্ঞও কমিটিতে যুক্ত করা হবে। যদি কোনো প্রযুক্তিগত বিষয়ে বিশেষজ্ঞ মতামতের প্রয়োজন হয়, তাহলে তাদের কো-অপ্ট করা হবে। প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সরকার কঠোর ব্যবস্থা নেবে।’ সেবায় কোনো গাফিলতি, দায়িত্বে অবহেলা কিংবা অবকাঠামোগত বা কারিগরি ত্রুটি পাওয়া গেলে স্তরভেদে যথাযথ কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক।
মগবাজারের আদ্-দ্বীন হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডে গতকাল সকালে ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়। এসির গ্যাসলাইনে লিকেজ বা অন্য কোনো যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এ ঘটনা ঘটে থাকতে পারে বলে ধারণা করছে পুলিশ। রমনা থানার পুলিশ বলছে, তারা ঘটনাটি তদন্ত করে দেখছে।
এদিকে ঘটনার কারণ ও রহস্য উদ্ঘাটনে ঘটনাস্থল থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের বম্ব ডিসপোজাল ইউনিট। বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়ার কোনো ঘটনা ঘটেছে কিনা, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানায় সংশ্লিষ্ট সূত্র।
এদিকে নবজাতক মৃত্যুর ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এতে উল্লেখ করা হয়, প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, মঙ্গলবার রাত ২টার দিকে হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ড-২-এ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রগুলো চালু থাকলেও একাধিক নবজাতকের মায়েরা সেগুলো বন্ধ করার জন্য বলেন। একপর্যায়ে কর্তব্যরত নার্সরা সেগুলো বন্ধ করে দেন। রাত ৩টার দিকে আবার এসি চালু করা হয়। এরপর রাত ৪টার দিকে এক নবজাতক অস্বাভাবিকভাবে কান্না করতে থাকলে দ্রুত এনআইসিইউতে নিয়ে যাওয়া হয়। পর্যায়ক্রমে অন্য পাঁচ নবজাতককেও এনআইসিইউতে নিয়ে যাওয়া হয়। এর মধ্যে সকাল ৬টার দিকে প্রথম শিশুটি মারা যায় এবং সকাল ৯টার মধ্যে অন্য নবজাতকদেরও মৃত্যু হয়।
আদ্-দ্বীন কর্তৃপক্ষও অভ্যন্তরীণভাবে এ মর্মান্তিক ঘটনার তদন্ত করছে। কারো গাফিলতি কিংবা ত্রুটি চিহ্নিত হলে অবশ্যই যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।










