অর্থাৎ প্রতি ১০টি অজ্ঞাত মরদেহের মধ্যে প্রায় সাতটিই থেকে গেছে পরিচয়হীন। শতকরা হিসাবে যা ৭২ শতাংশের বেশি। ফলে পরিচয়হীনভাবেই মাটিতে মিশে যাচ্ছে অজ্ঞাত মরদেহ। পরিচয় না থাকার কারণে আবার অনেক ক্ষেত্রে ধর্মীয় আচারও পালন করা সম্ভব হচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিএনএ ডেটাবেজ, নিখোঁজ ব্যক্তি ও অজ্ঞাত মরদেহের সমন্বিত জাতীয় তথ্যভাণ্ডার এবং আন্তঃসংস্থার ডিজিটাল সমন্বয় ছাড়া এ সংকট কাটানোও সম্ভব নয়।

পিবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ ২০১৯ থেকে মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত সময়ে দেশে উদ্ধার হওয়া ৮ হাজার ৪৫৬টি অজ্ঞাত মরদেহের মধ্যে ৬ হাজার ১১৬টির পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। অর্থাৎ প্রায় ৭২ শতাংশ মরদেহ আজও রাষ্ট্রীয় নথিতে পরিচয়হীন। প্রতি ১০টি অজ্ঞাত মরদেহের মধ্যে প্রায় সাতটির নাম, ঠিকানা, পরিবার কিংবা জীবনের ইতিহাস এখনো অজানা।

পিবিআইয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আলোচিত সময়ে উদ্ধার হওয়া ৬ হাজার ১৮৪টি অজ্ঞাত পুরুষ মরদেহের মধ্যে শনাক্ত করা গেছে ১ হাজার ৭১১টি। অশনাক্ত রয়ে গেছে ৪ হাজার ৪৭৩টি। শনাক্তের হার ২৭ দশমিক ৬৭ শতাংশ। একই সময়ে উদ্ধার হওয়া ২ হাজার ২৭২টি অজ্ঞাত নারী মরদেহের মধ্যে শনাক্ত হয়েছে ৬২৯টি। অশনাক্ত রয়ে গেছে ১ হাজার ৬৪৩টি। শনাক্তের হার ২৭ দশমিক ৬৮ শতাংশ। মোট ৮ হাজার ৪৫৬টি অজ্ঞাত মরদেহের মধ্যে মাত্র ২ হাজার ৩৪০টির পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। বাকি ৬ হাজার ১১৬টি মরদেহ এখনো পরিচয়হীন। এ পরিসংখ্যানই বলে দেয়, প্রযুক্তি চালু হলেও অজ্ঞাত মরদেহ শনাক্তকরণে রাষ্ট্র এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়ে আছে।

পরিচয় মিললেই বেরিয়ে আসছে খুনের নেপথ্যের গল্প। তাই অজ্ঞাত মরদেহ শনাক্তকরণ কেবল মানবিক দায়িত্ব নয়, এটি অনেক সময় ভয়ংকর অপরাধ উদ্ঘাটনেরও প্রথম দরজা। পিবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, শনাক্ত হওয়া মরদেহগুলোর সূত্র ধরে ২২৮টি হত্যা মামলা হয়েছে। এর মধ্যে পুরুষ মরদেহ সংশ্লিষ্ট হত্যা মামলা ১৬৫টি এবং নারী মরদেহ সংশ্লিষ্ট হত্যা মামলা ৭২টি। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বহু ক্ষেত্রে একটি অজ্ঞাত মরদেহের পরিচয়ই হয়ে ওঠে পুরো তদন্তের টার্নিং পয়েন্ট। পরিচয় জানা না গেলে হত্যার উদ্দেশ্য, অপরাধী চক্র, পূর্বশত্রুতা, অর্থনৈতিক বিরোধ কিংবা সংঘবদ্ধ অপরাধের নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘পিবিআইয়ের এফআইভিইএস অজ্ঞাত মরদেহ শনাক্তকরণে নতুন দিগন্ত খুলেছে। এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। হাজারো পরিবার তাদের হারিয়ে যাওয়া স্বজনের খোঁজ পেয়েছে, বহু হত্যা মামলার রহস্য উন্মোচিত হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে আরেকটি বাস্তবতাও স্পষ্ট, প্রযুক্তি থাকা সত্ত্বেও সাত বছরে ৬ হাজার ১১৬টি মরদেহ পরিচয়হীন থেকে গেছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘এ কারণেই এখন ফিঙ্গারপ্রিন্টের পাশাপাশি ডিএনএ, সমন্বিত জাতীয় ডেটাবেজ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ম্যাচিং সিস্টেম, গণমাধ্যম ও ডিজিটাল প্লাটফর্মের সমন্বিত ব্যবহার প্রয়োজন।’

তার ভাষায়, একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের কাজ শুধু অপরাধীকে খুঁজে বের করা নয়, পরিচয়হীন হয়ে যাওয়া একজন নাগরিককে তার নাম, পরিচয় এবং মর্যাদা ফিরিয়ে দেয়াও রাষ্ট্রের সমান দায়িত্ব।