সরকারি বিনামূল্যের জলাতঙ্কের ওষুধ সরবরাহ ঘাটতিতে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে গত ১৫ দিন ধরে বন্ধ রয়েছে ভ্যাকসিন প্রদান কার্যক্রম। প্রতিদিন ভুক্তভোগী রোগীরা হাসপাতালে এলেও ভ্যাকসিন না থাকায় দোকান থেকে নিজ উদ্যোগে কিনে ব্যবহার করছেন, নয়তো বিআইটিআইডিতে গিয়ে ভ্যাকসিন নিচ্ছেন। এদিকে হঠাৎ করেই জলাতঙ্কপ্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় রোগী সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে চাহিদার তুলনায় অর্ধেকের কম ভ্যাকসিন সরবরাহ পাওয়ায় প্রতি মাসেই জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন নিয়ে সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে জেনারেল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

তথ্যমতে, চট্টগ্রামে বিনামূল্যে জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন দেয় মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠান। একটি হলো আন্দরকিল্লার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল ও ফৌজদারহাটের বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেস (বিআইটিআইডি)। চট্টগ্রামে কুকুর, বিড়ালসহ অন্যান্য পোষা প্রাণীর কামড়ের ফলে জরুরি চিকিৎসার জন্য রোগীরা চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালেই বেশি ভিড় করে। গড়ে প্রতিদিন ২৫০-৩০০ রোগী ভ্যাকসিন নেয় এ হাসপাতাল থেকে। চলতি বছরের মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কুকুরে কামড়ানো চার হাজার রোগীসহ অন্যান্য প্রাণীর কামড়ে আক্রান্ত রোগী ভ্যাকসিন নিয়েছে ১৫ হাজার ৮৮৪ জন। তবে ভ্যাকসিনের সরবরাহ অপর্যাপ্ত থাকায় হাসপাতালে আগত সবাইকে ভ্যাকসিন দিতে পারছে না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

এদিকে হাসপাতালে বিনামূল্যে জলাতঙ্কের টিকা বা ভ্যাকসিন না পেয়ে দোকান থেকে ভ্যাকসিন কিনে ব্যবহার করছে আক্রান্তরা। মূলত সামান্য ক্ষত হওয়া রোগীদের অ্যান্টি র‌্যাবিস ভ্যাকসিন (এআরভি) ও গভীর ক্ষত হওয়া রোগীদের র‌্যাবিস ইমিউনোগ্লোবুলিন (আরআইজি) ভ্যাকসিন দেয়া হয়। বাজারে জলাতঙ্কের সাধারণ ভ্যাকসিনের দাম ৫০০ টাকার কাছাকাছি। একটি ডোজ দিয়ে চারজন ব্যবহার করা যায়। অন্যদিকে গভীর ক্ষত হলে ব্যবহৃত আরআইজি ভ্যাকসিনের দাম প্রায় ১ হাজার টাকার মতো। এই ভ্যাকসিন রোগীর ২০-২৫ কেজি ওজনভেদে এক ডোজ ক্ষত স্থানের চারপাশে দেয়া হয়। কোনো রোগীর ওজন যদি ১০০ কেজি হয় তাহলে তাকে চার থেকে পাঁচটি ডোজ ব্যবহার করতে হয়। সেজন্য আরআইজি ভ্যাকসিন রোগীর জন্য ব্যয়বহুল।

অন্যদিকে সাধারণ কামড়ানো বা আঁচড়ানো রোগীদের পরীক্ষার পরে ক্যাটাগরিতে ভাগ করে দেয়া হয়। রোগীর ক্যাটাগরি দেখে ডোজ কতবার বা কতদিন পর দিতে হবে সেটি নির্ধারণ করেন কর্তৃব্যরত চিকিৎসকরা।

চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক (ভারপ্রাপ্ত) ডা. মোহাম্মদ একরাম হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকারি চাহিদা অনুযায়ী আমাদের জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন সরবরাহ করতে পারছে না। ভ্যাকসিনের চাহিদা এত পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে যে প্রতি মাসে ওষুধ আসার সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে যাচ্ছে। ওষুধ শেষ হলে আবার আনতে গেলে সময়সাপেক্ষ ব্যাপার হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এই যেমন গত মাসের ১৮ তারিখ থেকে জলাতঙ্কের সব ভ্যাকসিন শেষ হয়ে যাওয়ায় আমরা এই বিনামূল্যের ভ্যাকসিন কার্যক্রম বন্ধ রেখেছি। কয়েক দিনের মধ্যে আবারো ওষুধ চলে আসবে। তবে সেই ওষুধ কত দিন চলবে সেটা নিশ্চিত করে বলতে পারছি না।’

তিনি আরো জানান, সরকারের এ জলাতঙ্ক সংক্রমণের জন্য ওষুধ দাতা সংস্থা থেকে সরবরাহ করা হতো। তবে নানা সংকটে সেই সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হলে সরকার নিজেই এখন ওষুধ কিনে সরবরাহ করছে। তবে এখন কুকুর-বিড়াল বাসাবাড়িতে বেশি পোষার কারণে জলাতঙ্কের এ ভ্যাকসিনের চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। তবে সম্প্রতি সরকার আমাদের কাছে এক বছরে কী পরিমাণ জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন প্রয়োজন হয় জানতে চেয়েছে। আমরা আমাদের চাহিদাপত্র সেভাবে দিয়েছি। হয়তো আগামী বছর থেকে ভ্যাকসিন সরবরাহ বাড়তে পারে।’

তবে বিআইটিআইডি উপপরিচালক ডা. ইফতেখার আহম্মদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জেনারেল হাসপাতালে জলাতঙ্কের ভ্যাকসিনের মজুদ ফুরিয়ে যাওয়ায় সেখানকার রোগী আমাদের এখানে ভিড় করছেন। আগে যেখানে প্রতিদিন গড়ে ১২০-১২৫ জনকে ভ্যাকসিন দিতাম এখন সেটা আড়াইশ শতাধিক হচ্ছে। আমাদের এখানে লোকবল সংকট থাকায় আমরা এই ভ্যাকসিন দিতে হিমসিম খাচ্ছি। তবে আমাদের এখানে ভ্যাকসিন সরবরাহ আছে কিছু দিনের।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের প্রতিটি হাসপাতালে প্রায় সমান হারে বরাদ্দ দেয়া হয় জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন। এখন একেক হাসপাতালের চাহিদা একেক রকম। চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে প্রতি মাসে ৩০০ থেকে ৫০০ বক্স ভ্যাকসিন বরাদ্দ দেয়া হয়। এখন এই বক্সে গড়ে পাঁচজনকে ভ্যাকসিন দেয়া হলে তা সর্বোচ্চ ১৫ দিন চালানো সম্ভব। যার কারণে প্রতি মাসে এই ভ্যাকসিনের ঘাটতি থেকে যাচ্ছে হাসপাতালে। তাছাড়া এখন মানুষের কুকুর-বিড়াল পালনে আগ্রহ বেড়েছে। যার কারণে নগরীতে জলাতঙ্কে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। দ্রুত এ রোগে আক্রান্তকে চিকিৎসা না দেয়া হলে মৃত্যুবরণ করতে পারে আক্রান্ত রোগী। সেজন্য সরকারকে বিনামূল্যে জলাতঙ্কে আক্রান্তদের জন্য ভ্যাকসিন সরবরাহ বাড়াতে হবে বলে মনে করেন তারা।