টানা বৃষ্টির কারণে উৎসবের উচ্ছ্বাসের আড়ালে নীরবে মাথাচাড়া দিচ্ছে নতুন এক শঙ্কা—ডেঙ্গুর বিস্তার। গত ২৫ মে থেকে শুরু হওয়া ঈদের ছুটির শুরুতেই ভারি বর্ষণে বিভিন্ন এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়ে। একই সময়ে লাখো মানুষ রাজধানী ছেড়ে গ্রামের পথে রওনা দেয়। ফলে সবার দৃষ্টি ছিল যানজট, ভোগান্তি ও যাত্রাপথের দুর্ভোগের দিকে। রাষ্ট্রের প্রস্তুতি না থাকায় ফাঁকা ঢাকায় তৈরি হয়েছে এডিস মশার বিস্তারের অনুকূল পরিবেশ, এমনটাই সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের আশঙ্কা, এ পরিস্থিতির কারণে চলতি সপ্তাহেই ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে পারে।

আবহাওয়াবিদদের ভাষায়, ৪৪ থেকে ৮৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতকে ভারি বর্ষণ হিসেবে ধরা হয়। সে হিসাবে ঈদের আগের তিনদিনের বৃষ্টিতে রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক, অলিগলি ও নিম্নাঞ্চল পানিতে তলিয়ে যায়; যা ডেঙ্গুর জন্য যথেষ্ট উদ্বেগজনক।

এদিকে ঈদের আগের পাঁচদিন থেকে রাজধানীতে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় কোরবানির পশুর হাট। তাই ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মূল মনোযোগ ছিল পশুর হাট ব্যবস্থাপনা, পরিচ্ছন্নতা এবং পরবর্তী সময়ে কোরবানির পশুরবর্জ্য অপসারণে। তাতে নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম কিছুটা ধীর হয়ে পড়ে বলে অভিযোগ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৃষ্টির পানি এডিস মশার প্রজনন ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করে। বিশেষ করে সড়কে পড়ে থাকা ডাবের খোসা, প্লাস্টিকের কাপ, চিপসের প্যাকেট, পলিথিন কিংবা নির্মাণসামগ্রীর ফাঁকে জমে থাকা পানি হয়ে ওঠে মশার নিরাপদ আবাস। আবার ঈদে মানুষ যখন গ্রামের বাড়িতে, তখন রাজধানীর অসংখ্য বাসাবাড়ি দীর্ঘ সময় ফাঁকা থাকছে। অনেক বাড়ির বারান্দা, টব, বাথরুম কিংবা এসির ট্রেতে জমে থাকা পানি এডিস মশার ডিম পাড়ার জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে। কেননা এসব মশা সাধারণত পরিষ্কার ও স্থির পানিতে ডিম পাড়ে। কোনো পাত্রে তিনদিনের বেশি পানি জমে থাকলেই সেখানে মশার লার্ভা জন্ম নিতে পারে। ফলে ঈদের দীর্ঘ ছুটি শেষে রাজধানীতে ফিরে অনেকেই অজান্তে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হতে পারেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, অবশ্য বর্তমানে দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী তেমন একটা নেই। হাসপাতাল থেকে পাঠানো তথ্যের ভিত্তিতে দেখা যায়, প্রতিদিন ২০ থেকে ৫০ জনের মতো ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয় মে মাসে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এবার আবহাওয়ার ধরনও ডেঙ্গুর জন্য উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। টানা বৃষ্টি ও মাঝেমধ্যে তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে মশার বংশবিস্তার দ্রুত হয়। একই সঙ্গে নগর ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ এবং নির্মাণাধীন স্থাপনার অনিয়ম পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে।

শহরের হাসপাতালগুলোয়ও এরই মধ্যে জ্বর নিয়ে রোগীর চাপ বাড়তে শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। যদিও সব জ্বর ডেঙ্গু নয়, তবুও এ সময় জ্বর হলে দ্রুত পরীক্ষার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও আগে থেকে অসুস্থ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতার কথা বলা হচ্ছে।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, বৃষ্টির পানি জমে আছে অলিগলি, ড্রেনের মুখ, নির্মাণসামগ্রীর ফাঁকফোকর ও ছাদে রাখা টব কিংবা পরিত্যক্ত টায়ারে। অনেক বাসা ফাঁকা থাকায় এসব স্থানে পানি জমলেও তা সরানোর কেউ নেই।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ডেঙ্গু সংক্রমণ চলতি সপ্তাহের মধ্যেই ধীরে ধীরে বাড়তে থাকবে। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে সংক্রমণ দ্বিগুণ হয়ে যাবে। কারণ মশক কার্যক্রমে কিছুটা ধীরগতি। অন্যদিকে টানা বর্ষণে ডেঙ্গুর প্রজননক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। আবার স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত, বাসাবাড়ি সব এখন ফাঁকা। ফুলের টবে, ফ্রিজের ফাঁকে, রান্নাঘরে, বাথরুমে নানা জায়গায় পানি জমে থাকে। সেখান থেকে এডিস মশা জন্ম নেবে এবং দ্রুত ডেঙ্গু রোগী বাড়তে থাকবে।’

এবারের ডেঙ্গু পরিস্থিতি আগের চেয়ে খারাপ হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়ে এ কীটতত্ত্ববিদ বলেন, ‘কেবল ঢাকাতেই ডেঙ্গু বাড়বে না, সারা দেশেই বাড়বে। আমরা দেশব্যাপী সার্ভে করছি। ঢাকার বাইরেও মশার ঘনত্ব বেশি পাচ্ছি। যেখানে আগে পাঁচ পেতাম, এখন সেখানে ১৫-২০ এ রকম পাচ্ছি। ফলে ডেঙ্গু পরিস্থিতি চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

ছুটির আমেজে স্থবিরতা এসেছে দুই সিটি করপোরেশনের মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমেও। নগরবাসীর অনেকেই অভিযোগ করছেন, মশক নিধন কার্যক্রম নিয়মিত দেখা যাচ্ছে না। রাজধানীর পলাশী, লালবাগ, ধানমন্ডি, সায়েন্স ল্যাব, কারওয়ান বাজার, ওয়ারী, গেন্ডারিয়া, জুরাইন, পোস্তগোলা, শ্যামপুর, যাত্রাবাড়ী এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঈদের ছুটিতে এসব এলাকায় মশা ধ্বংস করতে ফগার মেশিন ব্যবহার হয়নি।

জুরাইনের বাসিন্দা আমীর হোসেন বলেন, ‘আমাদের এলাকায় বছরের সবসময়ই ডেঙ্গু সংক্রমণ লেগে থাকে। কিন্তু মশক নিধনকর্মীদের দেখা যায় না। ঈদের ছুটিতে আরো দেখা যায় না।’ একই অভিযোগ যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা ওয়াসিম খানেরও।

সন্ধ্যা নামলেই মশার যন্ত্রণায় ঘরে-বাইরে কোথাও স্বস্তিতে থাকা যায় না বলে জানান আজিমপুরের বাসিন্দা আরমান হোসেন। তিনি বলেন, ‘আগে বৃষ্টি হলে মশা কমে যেত। কিন্তু এখন বৃষ্টির পরও মশার যন্ত্রণা বেড়ে যায়। সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে তেমন কোনো উদ্যোগ আমাদের চোখে পড়ে না।’

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন অবশ্য দাবি করছে, তাদের স্বাস্থ্য বিভাগের নিয়মিত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। নিয়ম মেনেই লার্ভিসাইড প্রয়োগ ও ফগিং কার্যক্রম পরিচালনা করছেন কর্মীরা।

এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কোরবানির সময়কে কেন্দ্র করে মূলত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়া হলেও স্বাস্থ্য বিভাগের নিয়মিত কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে। মশক নিধন কার্যক্রমে কোনো ধরনের গাফিলতি করা হচ্ছে না।’

তিনি আরো বলেন, ‘দীর্ঘ ছুটি ও ভারি বর্ষণের কারণে ডেঙ্গুর ঝুঁকি কিছুটা বাড়তে পারে। বৃষ্টির কারণে এডিস মশার প্রজননস্থল তৈরি হয়, আর ছুটির সময়ে বাসাবাড়ি ও অফিস-আদালত অনেক সময় ফাঁকা থাকায় পানির জমাট বাঁধার সুযোগ বাড়ে। এ অবস্থায় নগরবাসীকে সচেতন করতে প্রচারণা চালানো হয়েছে এবং বিজ্ঞাপনও দেয়া হয়েছে, যাতে তারা ঘর থেকে বের হওয়ার আগে খোলা পাত্রে পানি ফেলে দেন এবং কোথাও পানি জমে না থাকে। আশা করছি, পরিস্থিতি বড় ধরনের অবনতির দিকে যাবে না।’