সাড়ে তিন দশক পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (চাকসু) এবং হল সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে আজ। সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত টানা ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এ নির্বাচনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৭ হাজার ৫১৬ শিক্ষার্থী ভোট দিয়ে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করবেন।
অন্যদিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু), হল সংসদ ও সিনেটের ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে আগামীকাল। এ নির্বাচন ঘিরে প্রচারণা শেষ হয়েছে গতকাল রাত ১২টায়।
চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, প্রচারণা শেষে চাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনের জন্য ব্যালট বাক্স গতকালই কেন্দ্রে কেন্দ্রে পৌঁছে গেছে। নিরাপত্তা রক্ষায় পুলিশ ও র্যাব সদস্যরা মোতায়েন আছেন ক্যাম্পাসে। নির্বাচন কমিশন সচিব অধ্যাপক একেএম আরিফুল হক সিদ্দিকী এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
বিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, বাণিজ্য (বিবিএ), নতুন কলাভবন, আইটি ভবনের ৬০টি কক্ষে প্রায় ৭০০ বুথে ভোটগ্রহণ অনুষ্টিত হবে। পাশাপাশি দৃষ্টিহীনদের জন্য চাকসু ভবনের দ্বিতীয় তলায় ভোট কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। এ কেন্দ্রে শুধু দৃষ্টিহীন শিক্ষার্থীরা দুই নির্বাচন কমিশনারের তত্ত্বাবধানে তাদের পছন্দের প্রতিনিধি মনোনয়নে ভোট দেবেন।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ওএমআর ব্যালট শিটে শিক্ষার্থীরা ভোট দেবেন। চাকসুতে থাকছে চার পৃষ্ঠার এবং হল ও হোস্টেল সংসদের থাকছে এক পৃষ্ঠার ব্যালট।
নির্বাচন ঘিরে গেল দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে প্রচার-প্রচারণার হাঁকডাকে ক্যাম্পাস সরগরম থাকলেও গতকাল প্রায় ফাঁকা দেখা গেছে।
ভোট ঘিরে নিরাপত্তার জন্য ক্যাম্পাসে সাদা পোশাকে এবং পোশাক পরা মিলিয়ে শতাধিক র্যাব সদস্য অবস্থান নিয়েছেন। তারা চাকসু ভবন পরিদর্শন করেছেন এবং ক্যাম্পাসে টহল দিচ্ছেন। পাশাপাশি আছেন পুলিশ সদস্যরাও। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচটি অনুষদে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে বিশেষ নিরাপত্তা টিম কাজ করবে। সেনাবাহিনী থাকবে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে।
এর আগে চাকসুর সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি। ১৯৭৩ সালের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী প্রতি বছর চাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা। যদিও ১৯৬৬ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর এখন পর্যন্ত ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়েছে মাত্র ছয়বার। আজ সপ্তমবারের মতো এ নির্বাচন হতে যাচ্ছে।
চাকসু নির্বাচনে মোট প্রার্থী হয়েছেন ৯০৮ জন। ১৩টি প্যানেল থেকে সহসভাপতি পদে ২৪ জন, সাধারণ সম্পাদক পদে ২২ জন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে ২১ জন লড়ছেন। হল সংসদ নির্বাচনে নয়টি ছাত্র হলে ৩৫০ জন বিভিন্ন পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। পাঁচটি ছাত্রী হলে বিভিন্ন পদে লড়ছেন ১২৩ জন। শিল্পী রশিদ চৌধুরী হোস্টেলে বিভিন্ন পদে লড়ছেন ২০ জন প্রার্থী।
এদিকে গতকাল দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকসু ভবনের সামনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন র্যাব-৭-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে কোনো হুমকি নেই। শুধু বাইরে থেকে ইন্ধন না এলে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করা যাবে।’
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিজেদের প্রস্তুতি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘র্যাবের কমপক্ষে আটটি টহল দল সবসময় ক্যাম্পাসে থাকবে। অতিরিক্ত রিজার্ভ ফোর্স আমরা রাখব, প্রয়োজন হলে তারাও আসবে। এছাড়া সাদা পোশাকে গোয়েন্দা সংস্থা লোকজন থাকবে।’
নির্বাচন নিয়ে কোনো ধরনের হুমকি আছে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘স্টুডেন্টরা তো আসলে নিজেদের ক্লাসমেট, ফ্রেন্ড বা বড় ভাই-ছোট ভাই। তো বাইরে থেকে কেউ যেন কোনো ইন্ধন দিতে না পারে, সে বিষয়ে আমরা বেশি সতর্ক থাকব। আশা করছি স্টুডেন্টদের পক্ষ থেকে কোনো সমস্যা নেই এবং বাইরেরটা কন্ট্রোল করতে পারলে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন সম্পন্ন করা যাবে।’
অন্যদিকে বণিক বার্তার রাবি প্রতিনিধি জানান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু), হল সংসদ ও সিনেটের ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচনের প্রচারণা শেষ হয়েছে গতকাল রাত ১২টায়। প্রায় ২০ দিনের প্রচারণা শেষে আগামীকাল অনুষ্ঠিত হবে নির্বাচন।
ভোটগ্রহণকে কেন্দ্র করে প্রস্তুতি শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন। এছাড়া নিরাপত্তায় দুই হাজার পুলিশ, ছয় প্লাটুন বিজিবি ও ১২ প্লাটুন র্যাব মোতায়েন করেছে প্রশাসন। ক্যাম্পাসের গেটগুলোয় বাড়ানো হয়েছে নিরাপত্তা। ভোটগ্রহণের দিন, তার আগের ও পরের দিন বহিরাগত প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
শেষ দিনের প্রচারণাকে ঘিরে গতকাল পুরো ক্যাম্পাসে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। প্রার্থীরা ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে জানিয়েছেন নিজেদের কর্মপরিকল্পনা ও প্রতিশ্রুতি। বিভিন্ন বিভাগের সামনে ও আবাসিক হলগুলোয় চলেছে প্রার্থীদের সরাসরি প্রচারণা, পোস্টার ও হ্যান্ডবিল বিতরণ এবং শুভেচ্ছা বিনিময়। বিশেষ করে ক্যাম্পাসের আমতলা, পরিবহন মার্কেট, বুদ্ধিজীবী চত্বর, শহীদ মিনার, চারুকলা ও কৃষি অনুষদ, পশ্চিম পাড়া এলাকা এবং বিভিন্ন একাডেমিক ভবনের সামনে প্রার্থীদের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ করা যায় এদিন।
এবার রাকসুতে ছাত্রদল ও শিবির সমর্থিতসহ মোট ১১টি প্যানেল ঘোষণা করা হয়েছে। নির্বাচনে ২৩টি পদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ২৪৭ জন প্রার্থী। এর মধ্যে ভিপি পদে ১৮, জিএস পদে ১৩ এবং এজিএস পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ১৬ জন। এছাড়া বাকি ২০টি পদে ২০০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এছাড়া সিনেট ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচনের পাঁচটি পদে ৫৮ জন প্রার্থী এবং হল সংসদ নির্বাচনের ১৫টি পদের বিপরীতে ১৭টি হলে মোট ৫৯৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
রাকসু ও সিনেট নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ২৮ হাজার ৯০১ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ১১ হাজার ৩০৫ এবং পুরুষ ভোটার ১৭ হাজার ৫৯৬ জন। পুনর্বিন্যস্ত তফসিল অনুযায়ী আগামীকাল সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। গণনা শেষে সেদিনই ফল ঘোষণা করা হবে।










