লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) সংকট নিয়ে অপারেশনাল সংকটে রয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। ট্রেন চলাচলের উপযুক্ত ইঞ্জিন নিয়েও জটিলতায় রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে প্রতিদিন ইঞ্জিনের চাহিদা রয়েছে ১১৬টি। তবে তীব্র সংকটের কারণে এখন মাত্র ৭৫-৮০টি ট্রেনের ইঞ্জিন সরবরাহ পাওয়া যায়। যার এক-তৃতীয়াংশই চলছে স্বাভাবিকের তুলনায় কম মোটর নিয়ে। এসব ইঞ্জিন দিয়ে উভয় মুখে ট্রেন চালানোর মাধ্যমে (কানেক্টিং বা একটি ইঞ্জিন আসার পর পরই অন্য ট্রেনে যুক্ত করা) কোনো রকমে ট্রেন সার্ভিস চালু রেখেছে রেলওয়ে। এতে ইঞ্জিনের অশ্বশক্তি অনুযায়ী গতি না পাওয়া, পথিমধ্যে বিকল হয়ে যাওয়া এমনকি দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে। দ্রুত পর্যাপ্ত যন্ত্রাংশ আমদানি ও সংযোজন করা না গেলে রেলের যাত্রী ও পণ্যসেবা বিঘ্নিত হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
রেলওয়ের নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ৭৫-৮০টি ইঞ্জিন সরবরাহ পাওয়া গেলেও কিছু ব্যবহার হয় দুর্ঘটনাকবলিত ট্রেন উদ্ধারসহ অন্যান্য কাজে। ৫৪টি ইঞ্জিন ব্যবহার হয় পণ্য ও যাত্রীবাহী ট্রেন পরিচালনায়। অবশ্য সচল এসব ইঞ্জিনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি যন্ত্রাংশ সংকট দেখা দিয়েছে ট্রাকশন মোটরের। ৫৪টি ইঞ্জিনের মধ্যে ২৭টিই ডিজাইনের কম মোটর দিয়ে চলাচল করছে। সর্বশেষ দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাই রোটেম থেকে আমদানি করা ৩০টি ইঞ্জিনের মধ্যে অর্ধেকই দুর্ঘটনা কিংবা বিভিন্ন যন্ত্রাংশ সংকটে বিকল অবস্থায় ওয়ার্কশপে রয়েছে। বাকি চলমান ১৫টি ইঞ্জিনের মধ্যে পাঁচটি চলছে দুটি মোটর দিয়ে। স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী চারটি মোটরে চলাচলের কথা থাকলেও সংকটের কারণে সক্ষমতার অর্ধেক দিয়ে পূর্বাঞ্চল রেলের সবচেয়ে নতুন ইঞ্জিন যাত্রী ও পণ্যবাহী ট্রেন পরিবহন করছে। এতে ভারী ও গুরুত্বপুর্ণ ট্রেনগুলোর গতি অর্ধেকে নেমে আসার পাশাপাশি পথিমধ্যে বিকলের ঘটনাও ঘটছে। একইভাবে ২৯০০ সিরিজের বিদ্যমান ২৫টি ইঞ্জিনের মধ্যে ১০টি চলছে তিন মোটরে, চারটি চলছে দুটি মোটর দিয়ে। ২৭০০ সিরিজের চলমান একটি ইঞ্জিনও সবগুলো মোটর দিয়ে চলাচল করছে না। এ সিরিজের তিনটি ইঞ্জিন তিনটি মোটরে ও একটি চলাচল করছে দুটি মোটর দিয়ে। এছাড়া ২৬০০ সিরিজের নয়টি ইঞ্জিনের মধ্যে দুটি করে ইঞ্জিন তিন ও দুই মোটরে চলাচল করছে। অর্থাৎ কম মোটরে চলাচল করা ২৭টি ইঞ্জিনের মধ্যে ১৫টি তিন মোটরে এবং ১২টি ইঞ্জিন চলছে অর্ধেক মোটর দিয়ে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এমনিতেই রেলের ইঞ্জিন সংকট রয়েছে। এর মধ্যে আগেই উদ্যোগ না নেয়ায় যন্ত্রাংশ সংকটও প্রকট আকার ধারণ করেছে। দুটি অঞ্চলের মধ্যে পূর্বাঞ্চল রেলওয়ে মিটার গেজের হওয়ায় বিশ্ববাজারেও যন্ত্রাংশ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ট্রাকশন মোটরসহ প্রযোজনীয় অনেক যন্ত্রাংশ পূর্বপ্রস্তুতি নিয়ে অনেক আগেই আমদানি করতে হয়। এখন আমরা বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে যন্ত্রাংশ আমদানির গতি বাড়ানোর চেষ্টা করছি। এর পরও প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ আমদানি করতে অন্তত ছয় মাস সময় লাগবে। কিছু কিছু যন্ত্রাংশ ক্রয়ের পর সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো তৈরি করতে এক বছরও সময় নিতে পারে। সে পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই।’
রেলের ওয়ার্কিং টাইম টেবিল-৫৩ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, পূর্বাঞ্চলে ইঞ্জিন রয়েছে ১৫৩টি। ২০২৩ সালে তিনটি চলাচলের অনুপযুক্ত করায় ইঞ্জিনের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫০-এ। প্রতিদিন ১১৬টি ইঞ্জিনের চাহিদার মধ্যে যাত্রীবাহী ট্রেনের জন্য ৭২টি, পণ্যবাহী ট্রেনের জন্য ১৩টি, সান্টিংয়ের জন্য ১৬টি, শাটল দুটি, বিটি বা প্রকল্পে দুটি, রিলিফ ট্রেন ও অন্যান্য ১১টি। কাগজ-কলমে সরবরাহ ১০০টি দেখানো হলেও পাওয়া যায় ৭৫ থেকে সর্বোচ্চ ৮০টি।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যাত্রীবাহী ১৬০টি ও আটটি কনটেইনার ট্রেনের জন্য ৭২টি ইঞ্জিন বরাদ্দ দেয়া হলে প্রতিটি ইঞ্জিন প্রতিদিন ২ দশমিক ৬৫টি ট্রেনে যুক্ত হয়। বরাদ্দের শতভাগ সরবরাহ না হওয়ায় পূর্বাঞ্চলে একটি ইঞ্জিন প্রতি ২৪ ঘণ্টায় গড়ে তিনটি ট্রেন পরিচালনা করে। যা দীর্ঘদিনের পুরনো ইঞ্জিন ও চলাচলরত ট্রেনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এতে ট্রেনের গতি কমে যাওয়া, বিকল হওয়ার ঘটনায় ট্রেন সার্ভিসের মান পর্যায়ক্রমে কমছে।
একই চিত্র দেখা গেছে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়েতেও। বেশির ভাগ ব্রড গেজ লোকোমোটিভ দিয়ে ট্রেন পরিচালনাকারী এ অঞ্চলে দেড় শতাধিক ইঞ্জিনের মধ্যে প্রতিদিনের চাহিদা ১০০টিরও বেশি। এর মধ্যে যাত্রীবাহী ট্রেনের জন্য চাহিদা ৬২টি, পণ্যবাহী ট্রেনের জন্য ১৯টি, সান্টিংয়ের জন্য পাঁচটি, প্রকল্পে চারটি, বিটি দুটি, রিলিফ ট্রেন তিনটি, সপ পাইলটের জন্য দুটি ইঞ্জিন পাওয়া যায়। বাকি ২৮টি ইঞ্জিন মেইনটেন্যান্স স্পেয়ার হিসেবে থাকে। ফলে অধিকাংশ ইঞ্জিনকেই একাধিক ট্রেনে সংযুক্ত করে সার্ভিস পরিচালনা করা হয়।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের ২৭ অক্টোবর রেলের সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে কেন্দ্রীয় লোকোমোটিভ কারখানা (কেলোকা) থেকে ১৫টি ইঞ্জিন মেরামতে ৯১ ধরনের ২ হাজার ৬১৬টি যন্ত্রাংশ দ্রুত ক্রয় করে সরবরাহের অনুরোধ জানানো হয়। এক বছর পেরিয়ে গেলেও বেশির ভাগ যন্ত্রাংশ আমদানি করতে পারেনি রেলওয়ে। এতে ট্রেন বিকল কিংবা দুর্ঘটনাকবলিত হলে ওয়ার্কশপে পুরনো যন্ত্রাংশ দিয়ে মেরামত করা ইঞ্জিন সংযুক্ত করা হচ্ছে। এ কারণে কিছুদিন, এমনকি একটি ট্রিপ পরিচালনার পরপরই একই ইঞ্জিন ফের বিকল হওয়ার ঘটনা ঘটছে।
অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববাজার থেকে ইঞ্জিনের প্রকৃত যন্ত্রাংশ ক্রয় না হওয়ায় ১৫টিসহ সব পুরনো ইঞ্জিনের ওভারহোলিং কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। যার কারণে রেলওয়ের ওয়ার্কশপগুলো বর্তমানে স্থানীয় উৎস থেকে তৈরি করা যন্ত্রাংশ ক্রয়ের মাধ্যমে কোনো রকমে পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছে। সর্বশেষ আমদানি হওয়া ৩০০০ সিরিজের ইঞ্জিনগুলোর অর্ধেকই বিকল থাকায় দ্রুত যন্ত্রাংশ আমদানি ও মেরামত না হলে পূর্বাঞ্চলের রেলসেবার মান কমে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। তাছাড়া ২৭টি ইঞ্জিন কম মোটর দিয়ে পরিচালনার কারণে ট্রেনের গতি কমে শিডিউল বিপর্যয় এখন নিয়মিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে অভিযোগ রেলের অপারেশন ও বাণিজ্যিক বিভাগের।
নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে রেলওয়ের পরিবহন বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যান্ত্রিক প্রকৌশল বিভাগকে কয়েক বছর ধরে পর্যাপ্ত ইঞ্জিন সরবরাহের জন্য বারবার তাগাদা দিলেও পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না। একই ইঞ্জিন ওয়ার্কশপ থেকে মেরামত হয়ে আসার কিছুদিনের মধ্যে বিকল হচ্ছে। এমনকি দীর্ঘদিন কেন্দ্রীয় লোকোমোটিভ কারখানায় ওভারহোলিং হওয়া ইঞ্জিনও রানিং ট্রেনে যুক্ত করার এক মাসের মধ্যে বিকলের ঘটনা ঘটেছে।’ যান্ত্রিক প্রকৌশল বিভাগের এ ব্যর্থতার কারণে যাত্রী ও পণ্যবাহী ট্রেনের বিপুল চাহিদা সত্ত্বেও ট্রেন অপারেশন বাড়িয়েও রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং রেলকে লাভজনক করা সম্ভব হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন তারা।










