আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী। ১৯৯১ সালে প্রথম এমপি নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনেও এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দলটির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন চট্টগ্রাম-১১ আসন থেকে। দেশের রাজনীতি, গণতান্ত্রিক উত্তরণ, চট্টগ্রাম ও বন্দরভিত্তিক লজিস্টিক হাবসহ নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সুজিত সাহা

এবারের নির্বাচনকে আপনি কীভাবে দেখছেন? জনগণের কেমন প্রতিক্রিয়া দেখছেন?

দেশের মানুষের সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা হচ্ছে ভোটাধিকার প্রয়োগ করা, নিজের প্রতিনিধি নির্বাচন করা। সংসদ ও সরকার নির্বাচন করা এবং নির্বাচিত সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে রাখা। বহু বছর মানুষ ভোট দিতে পারেনি। আমাদের জনসংখ্যার বৃহৎ একটি অংশ তরুণ। তাদের অনেকেই জীবনে প্রথমবারের মতো ভোট দেয়ার সুযোগ পাচ্ছে। এ কারণে মানুষের মধ্যে যে আগ্রহ ও উচ্ছ্বাস তৈরি হয়েছে, আমি দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে এমনটা দেখিনি। সব শ্রেণী ও পেশার মানুষ নির্বাচন সামনে রেখে প্রার্থীদের নানাভাবে বরণ করে নিচ্ছে। এ আকাঙ্ক্ষা পূরণ করা রাজনীতিবিদদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ প্রত্যাশা অনেক বড়। আর স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মধ্যে ধৈর্য কম। কিন্তু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ফিরিয়ে আনতে নির্বাচনের বিকল্প কোনো প্রক্রিয়া নেই।

কভিড ও কভিড-পরবর্তী অর্থনৈতিক মন্দা এবং সাম্প্রতিক গণ-আন্দোলনের সময় অনেক মানুষ কর্মসংস্থান হারিয়েছেন। বিদেশী বিনিয়োগও বাধাগ্রস্ত। আপনারা ক্ষমতায় গেলে এ পরিস্থিতিকে কীভাবে বদলাবেন?

একটি দেশ দীর্ঘদিন অনির্বাচিত বা অস্থিতিশীল অবস্থায় থাকলে বিনিয়োগ কমে যায়। দেশী-বিদেশী উভয় ধরনের বিনিয়োগকারীই আস্থা হারান। বিনিয়োগ বাড়াতে হলে নীতি-স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন এবং ব্যবসা করার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের অগ্রাধিকার হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। কর্মসংস্থান মানে শুধু চাকরি নয়, আত্মকর্মসংস্থানও। দক্ষতা তৈরির সঙ্গে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত হলে শিল্পায়ন ও সেবা খাতে কর্মসংস্থান বাড়বে।

ক্ষমতায় গেলে আপনারা শিক্ষা ব্যবস্থা ও শিক্ষার মান উন্নয়নে কী করবেন?

শুরুতেই শিক্ষাকে রাজনৈতিকীকরণের বাইরে আনতে হবে। এরপর মানুষের জীবনের চাহিদার ভিত্তিতে শিক্ষা ব্যবস্থাকে সাজাতে হবে। দক্ষ জনশক্তি তৈরি না হলে কর্মসংস্থান হবে না। কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষায় গুরুত্ব দিতে হবে। অনেক দেশ স্কুলের পর বড় একটি অংশকে ভোকেশনাল ট্র্যাকে নিয়ে যায়। এতে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি হয়। আর দেশে-বিদেশে দক্ষ মানুষের চাহিদা বাড়ে। ফলে মানুষের আয়ও বাড়ে। এতে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি বড় হয়, জিডিপি বাড়ে। একজন যথাযথভাবে প্রশিক্ষিত ইলেকট্রিশিয়ান, টেকনিশিয়ান বা দক্ষ কারিগরের আয় ও জীবনযাত্রার মান অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ ডিগ্রিধারীর চেয়েও ভালো হয়। আমরা কারিগরি শিক্ষাকে স্কুল পর্যায় থেকে দিতে চাই। পাশাপাশি বাংলা-ইংরেজির বাইরেও প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য একটি অতিরিক্ত ভাষা শেখার সুযোগ বা চর্চাকে বাধ্যতামূলক করার চিন্তা আছে। সেটি জাপানি, চীনা বা ফরাসি—যেকোনোটি হতে পারে। এতে দেশে-বিদেশে কাজের সুযোগ বাড়বে।

দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও সামাজিক সুরক্ষায় আপনারা কেমন পদক্ষেপ গ্রহণের কথা ভাবছেন?

বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গরিব মানুষের জন্য কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা দরকার। পাশাপাশি নারীর ক্ষমতায়ন শুধু বক্তব্যে নয়, বাস্তবে অর্থনৈতিক শক্তি তৈরির মাধ্যমেও হতে হবে। কর্মজীবী নারীরা আয়ের কারণে পরিবারে সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখতে পারছেন, এটা ইতিবাচক। কিন্তু গৃহিণীর শ্রমও অর্থনীতির বড় অংশ। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পরিবারকে তারাই চালান। কিন্তু তার কোনো স্বীকৃতি নেই। আমাদের পোশাক খাত বা যেকোনো কাজে যুক্ত নারীরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ায় একভাবে নারীর ক্ষমতায়ন হয়েছে। তবে গৃহিণীদের মধ্যে অনেকেই শিক্ষা ও কর্মে দক্ষ হলেও তাদের ক্ষমতায়ন হয়নি। আমাদের নির্বাচনী ইশতাহারে গৃহিণীদের জন্য নির্দিষ্ট মাসিক সহায়তার ধারণা এসেছে, যাতে তিনি নিজের প্রয়োজনমতো ব্যয় করতে পারেন। পরিবারকে কোথায় কীভাবে সহায়তা দিতে হবে, সেটি তো তিনিই সবচেয়ে ভালো বোঝেন।

আপনি চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ ও সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল) প্রতিষ্ঠায় যুক্ত ছিলেন। দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের শেয়ারবাজার সংকটে নিমজ্জিত। এ বিষয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?

আমরা একসময় বাজার অটোমেশন, অনলাইন রিয়েল-টাইম ট্রেডিং, সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি—এসব ভিত্তি তৈরি করেছিলাম। পরে দুর্নীতি ও লুটপাটের কারণে বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য হবে বড় ধরনের রিফর্ম ও ডিরেগুলেশন করে বাজারকে শক্তিশালী করা। বাজার যদি ফ্রন্টিয়ার অবস্থায় থাকে, বিদেশী তহবিল আসে সীমিত পরিমাণে। কিন্তু সংস্কার করে উন্নয়নশীল বাজারে যেতে পারলে বড় পুঁজির প্রবাহ সম্ভব। শুধু ইকুইটি নয়; বন্ডসহ বিভিন্ন নতুন প্রডাক্ট আনতে হবে। সিটি করপোরেশনের মতো প্রতিষ্ঠানও মিউনিসিপ্যাল বন্ড ইস্যু করে উন্নয়ন করতে পারে। এ ধরনের উদ্ভাবন দরকার। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য ক্যাপিটাল মার্কেট দরকার। শুধু ব্যাংকনির্ভর হলে স্বল্পমেয়াদি আমানতের ওপর ভিত্তি করে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দিতে গিয়ে ব্যাংক খাতও চাপে পড়ে যায়। তাই পুঁজিবাজার শক্তিশালী করা অত্যন্ত জরুরি।

বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে কোন বিষয়কে প্রাধান্য দেবেন?

বিনিয়োগের কিছু মৌলিক শর্ত আছে। প্রথমত, ভ্যালু ফর মানি। অর্থাৎ যে টাকা খরচ হচ্ছে তার বাস্তব মূল্য আছে কিনা। দ্বিতীয়ত, রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট। বিনিয়োগের রিটার্ন আসছে কিনা। তৃতীয়ত, এটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে কিনা। কর্মহীন প্রবৃদ্ধির কোনো দাম নেই। চতুর্থত, উন্নয়নটা পরিবেশের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ কিনা। আমাদের জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে হবে। ‘নো নিট লস’ নীতির মতো করে পরিবেশগত ক্ষতি কমাতে হবে। বড় বড় মেগা প্রকল্পের নামে দুর্নীতি করে টাকা পাচার, এটা উন্নয়ন নয়। আমরা এই চার শর্তের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেব। সেটি চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে হোক বা সারা দেশের ক্ষেত্রে হোক।

চট্টগ্রামকে ‘বাণিজ্যিক রাজধানী, বলা হয়; কিন্তু তা এখনো এদিক থেকে পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি। চট্টগ্রাম নিয়ে আপনার অগ্রাধিকার কী?

চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হলো বন্দর। এ বন্দরকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামকে আঞ্চলিক লজিস্টিক হাব করে তোলা যায়। এটি শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, গোটা অঞ্চলের জন্য। আশপাশে ভূবেষ্টিত দেশও আছে। নৈকট্যের কারণে চট্টগ্রাম তাদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। লজিস্টিক হাব হলে বন্দরের কর্মকাণ্ড বাড়বে। আয় বাড়বে, কর্মসংস্থান হবে। উপকূলীয় বেল্টকে ট্রেডিং হাব হিসেবে গড়ে তোলা যাবে। বড় আকারের ওয়্যারহাউজিং, কার্গো হ্যান্ডলিং, পুনঃরফতানি—এসব এখন বিশ্বে বড় ব্যবসা। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরকে এ অঞ্চলের হাব হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ আছে। এসব হলে হোটেল, রেস্টুরেন্ট, সার্ভিস সেক্টর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—সবই বিকশিত হবে। পর্যটন খাতেও বিশাল সম্ভাবনা আছে। চট্টগ্রাম থেকে অনেক পর্যটন গন্তব্য কাছাকাছি। চট্টগ্রামকে ঘিরে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু হলে স্বাভাবিকভাবেই কর্মসংস্থান তৈরি হবে, অর্থনীতি গতিশীল হবে।

বন্দর ইস্যুতে অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে নানা আলোচনা রয়েছে। এ বিষয়ে আপনার বা আপনার দলের অবস্থান কী?

যেকোনো বিনিয়োগ বা চুক্তির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা জরুরি। তবে মূল কথা হলো বন্দরকে লজিস্টিক হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে দক্ষতা বাড়াতে হবে। গ্লোবাল বেস্ট প্র্যাকটিসে যেতে হবে। শুধু বক্তব্য দিলে হবে না। বিনিয়োগ দরকার। পরিচালন দক্ষতা দরকার। শুধু বন্দর নয়, বিমানবন্দরসহ বড় বড় প্রতিষ্ঠানকে বৈশ্বিক মানে আনতে হবে। অটোমেশন ও এআই ব্যবহারের মাধ্যমে দুর্নীতি হ্রাস ও দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব।

বিভিন্ন সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীর ভোট আকর্ষণে আপনাদের কৌশল কী?

আলাদা করে কোটার মতো করে ভাবলে সমস্যাই বাড়ে। আমাদের দায়িত্ব হলো দেশের প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করা। সাংবিধানিকভাবে সবাই সমান। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকলে সংখ্যালঘু, নারী, প্রতিবন্ধী, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী—সবাই সমানভাবে অধিকার প্রয়োগ করবে। আমরা ‘ইউনিটি ইন ডাইভার্সিটি’ (বৈচিত্র্যপূর্ণ ঐক্য) ধারণায় বিশ্বাস করি—রেইনবো নেশনের (বিভিন্ন গোষ্ঠী, সংস্কৃতি ও সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্যের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা জাতিরাষ্ট্র) মতো। একটি দেশে নানা বৈচিত্র্য থাকবে, কিন্তু জাতি হিসেবে ঐক্য থাকবে। কারো ধর্ম বিশ্বাস বা সংস্কৃতি ব্যক্তিগত। কিন্তু নাগরিক অধিকার সমান করাটাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এবারের নির্বাচন সামনে রেখে আমরা ভোটারদের এ বার্তাই দিতে চাইছি।

নির্বাচন সামনে রেখে আপনার সংসদীয় এলাকার ভোটারদের আপনি কী বার্তা দিতে চান?

মানুষ ভোট দিতে প্রস্তুত। তাদের ভোটের মাধ্যমে প্রতিনিধি নির্বাচন করাই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভিত্তি। নির্বাচিত সরকারই জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকবে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনর্গঠন করবে এবং অর্থনীতিকে অংশগ্রহণমূলক করবে। এ নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনার কথা বলছি। কারণ মানুষের জন্য কিছু করতে হলে তার আকাঙ্ক্ষা থাকতে হয়। আমাদের সাহস করেই সামনে এগোতে হবে। এছাড়া বাংলাদেশের সামনে আর কোনো উপায় নেই।